চলমান অভিযানের গন্তব্য কোথায়?

আব্দুল্লাহ তাহের

মানবকণ্ঠ
আব্দুল্লাহ তাহের - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৪৭

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার অনামিকা কবিতায় জানতে চেয়েছিলেন, ‘কি নামে ডাকবো তোমায়’? নজরুলের মতো আমাদের মনেও চলমান অভিযানকে কি নামে ডাকা যায় তা নিয়ে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। এটা কি ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান? দুর্নীতিবিরোধী অভিযান? নাকি শুদ্ধি অভিযান? সরকারের তরফ থেকেও একেকবার একেক নামে ডাকা হচ্ছে। তবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষায় যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো হঠাৎ সম্পদে ফুলে ফেঁপে উঠে ‘মোর কি হনুরে’ মনোভাব দেখাচ্ছেন তাদেরকে একটা ধাক্কা দেয়ার প্রয়োজনেই এই অভিযান।

আপাতত ক্লাবভিত্তিক ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে মূল অভিযান চললেও এটা বলা যায় যে ‘মোর কি হনুরে’ ভাবখানা শুধু ক্যাসিনো কারবারিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সরকারি আমলা, কামলা থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের একটি অংশের মধ্যেই তা ডেঙ্গুর মতোই ছড়িয়ে গেছে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কথা অনুযায়ী ধাক্কা কোন কোন দিকে লাগে তা না দেখে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে না। বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়। নাম যেটাই হোক। চলমান অভিযানে জনগণ খুশি। এতদিন বালিশ, পর্দা, আর টিন কাণ্ডের মাধ্যমে শুধুমাত্র সরকারি আমলা আর কামলাদের মহাসাগর চুরির কথাই মিডিয়ার কল্যাণে সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরছিল।

কিন্তু মুদ্রার অপর পিঠে ক্ষমতার আশীর্বাদ নিয়ে কিছু রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত কিভাবে মহাডাকাতি করছে তা এই অভিযানে কিছুটা প্রকাশ পেল। এটাকে অনেকটা ছবির ট্রেলার শো-ও বলা যেতে পারে। নিশ্চিতভাবেই ছবির ট্রেলার জনমনে পূর্ণদৈর্ঘ্য ছবিখানা দেখার আগ্রহ তৈরি করেছে। তাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন হলো- সেই ছবি দেখার সুযোগ জনগণ কি শেষ পর্যন্ত পাবে?

শুরুটা হয়েছিল ছাত্রলীগের দুই শীর্ষ নেতার পদত্যাগ দিয়ে। যদিও পদত্যাগের কারণটি ছিল ফৌজদারি অপরাধ কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তারপরও অনেকে খুশি হয়েছে এই ভেবে যে, ছাত্রলীগের নেতাদের মাঝে একটি সতর্কবার্তা অন্তত দেওয়া গেছে যা ভবিষ্যতে তাদেরকে একই অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে নিবৃত্ত করবে। তাৎক্ষণিক ফল হিসাবে আমরা কিছুদিন ধরে ছাত্রলীগকে সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় দেখছি যা ছাত্র রাজনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে শোভন রাব্বানীর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেরকম অভিযোগ আরো অনেক ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধেও আছে। কিন্তু আমরা সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখছি না।

এমনকি যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় মূলত দুই নেতা পদত্যাগে বাধ্য হলেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ভিসির বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেওয়ার যে অভিযোগ তারও কোনো প্রতিকার করা হয়নি। ছাত্রলীগ তথা এর নেতাকর্মীদের যদি প্রকৃতই চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজ থেকে বিরত রাখতে হয় তবে সকল পর্যায়ে ব্যবস্থা নিতে হবে। ধারাবাহিকভাবে অছাত্র, কুছাত্রদের সংগঠন থেকে বিতারিত করতে হবে। তবেই শোভন রাব্বানীর পদত্যাগ ছাত্রলীগকে বিশুদ্ধকরণে কাজে লাগবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ছাত্রলীগের পরে ধরা হলো যুবলীগকে। যুবলীগের বেপরোয়া নেতাদের ১/২ জনকে ধরতে গিয়ে বের হয়ে এলো ক্যাসিনো নামক জুয়ার এক আধুনিক সংস্করণের নাম। যুবলীগ নেতা খালিদকে ধরার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ঢাকা শহরে প্রায় ৬০টির মতো ক্যাসিনো আবিষ্কার করল। আরো জানা গেল যে, প্রায় সবাই ক্ষমতাসীন দলের কোনো না কোনো নেতার ছত্রছায়ায় পরিচালিত হচ্ছে। খুব সহজ একটি প্রশ্ন এখানে অবধারিতভাবেই আসে এবং অনেকের মতো যুবলীগের চেয়ারম্যান নিজেও তুলেছিলেন। এত অনুমোদনহীন ক্যাসিনো শহরে নিশ্চিতভাবেই একদিনে গড়ে ওঠেনি। পুলিশ তাহলে এতদিন কি করল? বিশেষ করে মতিঝিলের ক্লাবগুলোর খুব কাছেই থানার অবস্থান। সেখানে পুলিশ কেন আগে ব্যবস্থা নেয়নি? আর যেসব ক্লাবগুলোতে ক্যাসিনো চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে সেগুলোতে জুয়ার আসর বসানোর অভিযোগ অনেক পুরনো। তাই এটা মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে যে, থানা পুলিশের যোগসাজশেই ক্লাবগুলোতে মদ ও জুয়ার অনৈতিক বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ঘটেছে।

কিন্তু আজ শুধু নাটকের পরিচালকদেরই ধরা হচ্ছে। পৃষ্ঠপোষকগণ ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এখানে পুলিশ ও প্রশাসনের যেসব লোকজন সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়াটা প্রত্যাশিত। অভিযানে জনগণ খুশি হলেও এটার ধারাবাহিকতা তথা চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে তারা কিছুটা সন্দিহান। কিছু প্রশ্ন সেই সন্দেহের বীজে পানি ছিটাচ্ছে।

ছাত্রলীগ কিংবা যুবলীগের অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার কেন দরকার হলো? দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার দায়িত্ব যাদের সেই পুলিশ কিংবা র‌্যাব কি তবে নিজেদের সিদ্ধান্তে কিছু করবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে? রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই দিকনির্দেশনা দিতে পারেন বা দিবেন। কিন্তু একজন অপরাধী শুধুমাত্র দলীয় পরিচয়ের কারণে কেন দিনের পর দিন আইনের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে?

সাম্প্রতিককালে আমরা ভয়াবহতার সাথে লক্ষ করছি যে, লোকজন তাদের ব্যক্তিগত কিংবা পারিবারিক সমস্যা সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এর মূল কারণ হচ্ছে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন দেশে আইনের শাসন কিংবা সামাজিক ন্যায়বিচার বলে কিছু থাকবে না। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগকে ভুলে গেলে চলবে না সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছিল মুক্তিযুদ্ধের একটি অন্যতম লক্ষ।

গ্রেফতারকৃত নেতা কর্মীদের পাহাড় সমান দুর্নীতি আর অনৈতিক কাজের কথাফাঁস হওয়ার পর তাদেরকে অনুপ্রবেশকারী আখ্যা দিয়ে ক্ষমতাসীন দল দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু এই দায় দল হিসাবে আওয়ামী লীগ কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। কারণ একজন জি কে শামিম একদিনেই গড়ে ওঠেনি। কয়েক হাজার কোটি টাকার সরকারি প্রকল্পের কাজ দলবদলের পুরস্কার হিসেবে সাইনিং মানি হিসাবে সে পায়নি। বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করে সে প্রকল্পগুলো বাগিয়ে নিয়েছিল। সরকারি প্রকল্প অনুমোদনের ন্যূনতম ধারণা যাদের আছে তারা জানেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ক্ষেত্রবিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া কোনো প্রকল্প পাস হওয়ার সুযোগ নেই।

তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সরকারি আমলা থেকে শুরু করে দলীয় নেতা কিংবা মন্ত্রীদের ম্যানেজ না করে কোনোভাবেই জি কে শামিম কাজ আদায় করতে পারেনি। সে নিজেও সরকারি কর্মকর্তাদের উৎকোচ দেওয়ার কথা স্বীকার করেছে। এখন আওয়ামী লীগের করণীয় হচ্ছে-এ রকম আরো জি কে শামিম বা খালেদ যারা আছে তাদের খুঁজে বের করে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া। আওয়ামী লীগ দেশের প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। কয়েক শত জি কে শামিমকে দল থেকে বের করে দিলেও দলে কোন নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হবে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বরাতে আমরা জেনেছি যে, গ্রেফতারকৃতরা রিমান্ডে তাদের সহযোগী ও পৃষ্ঠপোষক হিসাবে অনেক রাঘব বোয়ালের নাম বলেছে। এখন তাদেরকেও তদন্তের আওতায় এনে সত্যতার প্রমাণ পেলে গ্রেফতার করতে হবে। সরকারি কর্মচারী কিংবা রাজনৈতিক কর্মী যার নামই আসবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে হবে। একজন রাজনৈতিক কর্মী কখনোই প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া দুর্নীতি করতে পারবে না। এটি একটি চক্র যেখানে পুলিশ, প্রশাসন, রাজনৈতিক কর্মী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণির লোক জড়িত। তাই চক্রের সবাইকে ধরা না গেলে একজন নতুন সম্রাট তৈরি হতে বেশি সময় লাগবে না।

আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিতে চাই এই জন্য যে, দেরিতে হলেও তিনি দুর্বৃত্তদের ধরা শুরু করেছেন। কিন্তু তাকে থামা যাবে না। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে তার কাছে জাতির প্রত্যাশা অনেক। যে প্রশ্নগুলো জনমনে সন্দেহের ডাল ছড়াচ্ছে তিনি কাজের মাধ্যমে তা দ্রুত ছেঁটে ফেলবেন সেই প্রত্যাশা আমরা করি। আমরা আমাদের মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করতে চাই দুর্বৃত্ত আর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে।

লেখক- আব্দুল্লাহ তাহের: চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ গণশক্তি আন্দোলন, বিপিএম।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads




Loading...