এ সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

মানবকণ্ঠ
অজয় দাশগুপ্ত - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • অজয় দাশগুপ্ত
  • ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৩০,  আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫৭

আবরারকে নিয়ে কী লিখব? এটা কোনো ঘটনা না, এটি এক ধরনের বর্বরতা? মতের অমিল হলে খুন করে এমন অভিযোগ ছিল ঘাতক খুনি মৌলবাদীদের জন্য নির্দিষ্ট। এখন সেটাও বদলে দিল ছাত্রলীগ। অথবা দলে ঢুকে থাকা ঘাতকেরা। কিন্তু এর দায় ছাত্রলীগকে নিতেই হবে। সাথে জুটেছে ভিসি নামের এক আপদ। উপাচার্য নামের যে সম্মান বা মর্যাদা তার কিছুই অবশিষ্ট নাই। এরা এত বেপরোয়া যে ছাত্রের জানাজায় যাবার সৌজন্য মানবতা কিছুই কিছু না এখন। যে কারণে আবরার খুন হলো তার পেছনে যে রাজনীতি তার অবসান জরুরি। দেশের পক্ষে বলতে গিয়ে একটি ছাত্র খুন হবে আর সবাই কুলুপ আঁটবে এটা কেমন সমাজ? আবার এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে যারা নিতে চাইছে তাদের বেলায় সাবধানতা প্রয়োজন। কারণ এদের মতলব ভালো না।

রাজনীতি এতই মুখ্য, এত বেশি প্রকট, আর সব চাপা পড়ে গেছে তার তলায়। তাও যদি মানুষের রাজনীতি হতো, মানুষের কথা বলত সমস্যা ছিল না। সে কবে রাজনীতি তার পথ হারিয়েছে। আজকাল দু’ধরনের রাজনীতি চলে দেশে। একটি গদিতে থাকার আরেকটি গদি পাবার। যে থাকে সে রাবণ আর যে পেতে চায় সে মায়া কান্নার বাহন। খেয়াল করবেন আওয়ামী লীগের নেতারা বলেন কোথাও কোনো সমস্যা নাই। সব আন্ডার কন্ট্রোল। আর বড় দল বিএনপি না আছে সংসদে না রাজপথে। তারা মিডিয়ায় সরব। তাদের এক কথা আর যাই হোক শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন হবে না। একদলের কাছে সমস্যা সমস্যাই না। আরেক দল মনে করে জনগণের যা হবে হোক আমরা গদি পেলেই হলো।
এর ফাঁকে সামাজিক সমস্যাগুলো এখন ধারণ করেছে বিশাল আকার। দেখে শুনে মনে হবে বাঙালির জীবনে যৌনতা ছাড়া আর কোনো আনন্দ অবশিষ্ট নাই। তাও বিকৃত যৌন আনন্দ। কিভাবে তা এমন মহামারী আকার ধারণ করল?

আমরা সবাই বাংলাদেশের মানুষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বড় হয়েছে এই সমাজে। সব আমলে নারী ছিল, যৌনতা ছিল, আকর্ষণ ছিল। মেয়েদের বিষয়ে আমাদের কৌতূহল বা আকাংখা কম কিছু ছিল না। রাতের পর রাত নির্ঘুম থেকে চিঠি লেখা, ভোরে গিয়ে স্কুলের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা ছুটি হলে একনজর দেখার জন্য উদগ্রীব আমাদের কখনো মনে হয়নি কোনো তরুণীকে জোর করে বিছানায় নিয়ে গেলেই সব পাওয়া হয়ে যায়। এই যে বিকৃতি এর পেছনে আছে সমাজ ও খুলে যাওয়া মুক্ত দুনিয়ার ইন্ধন নাকি আমাদের সমাজ বদলে গেছে? মুক্ত দুনিয়া তো সবার জন্য মুক্ত। সে এদেশে হোক আর অন্য দেশে হোক সবাই তার সুফল কুফল দুই-ই ভোগ করছে। আমাদের পাশের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ। তারাও বাঙালি। সেখানে বরং মদ ও পরকীয়ার ছড়াছড়ি। তারপরও তাদের রাজ্যে কি এত ধর্ষণ হয়?

ইদানীং আমাদের কথিত ধনী তথা লুটেরা শ্রেণির মানুষের ভেতর এই প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়েছে। ঢাকায় মানুষে মানুষে ঠাসাঠাসি। জীবন চলমান বলে চলছে। রাস্তাঘাট পার্ক সব এখন বদ লোকের আখড়া। সামাজিক সম্পর্কগুলো ঠেকেছে তলানিতে। কোনো বিশেষ কারণ ছাড়া বাড়ি যাওয়া বন্ধ। হয় কোনো কমিউনিটি হলে নয়তো ক্লাবে দেখা হয় একে অপরের। সে সম্পর্ক সুতোয় ঝোলা, যেকোনো সময় ছিঁড়ে যেতে পারে। এত কম সময়ের জন্য মানুষের দেখায় আন্তরিকতা থাকে না। থাকে সৌজন্য। মোবাইল আর সামাজিক মিডিয়া নির্ভর সম্পর্কের এই যুগে মানুষ মূলত একা। তার এই নিঃসঙ্গতা দূর করার উপায় কী তবে?

আগে যুবক-যুবতীদের জন্য ছিল নানা ধরনের সামাজিক আয়োজন। ছিল অনুষ্ঠান আর আড্ডার ছড়াছড়ি। তখন যেসব সাংস্কৃতিক সংগঠন আমাদের মনোজগত নিয়ন্ত্রণ করত তাদের আদর্শবোধ ছিল অণুকরণীয়। এখন কি সেসব আছে? কতগুলো চ্যানেলে প্রতিযোগিতার নামে বাণিজ্য আর সামাজিকভাবে একে অপরকে টেক্কা দেয়ার ভেতর বেড়ে উঠেছে লোভ লালসা। সে লালসা এখন নারীদেহ ছাড়া কিছুই বোঝে না।

খুব ভালোভাবে খেয়াল করবেন সমাজে যা কিছু এখন স্বীকৃত, যা কিছু ধর্ম অধর্মের নামে চলছে তার সাথে সংস্কৃতি আচার আচরণ সভ্যতার বিরোধ থাকলেও যৌনতার নেই। তাই হয়তো আজকের তারুণ্য এ কাজকে পাপ বলে মনে করে না। তারা ভোগ ও উপভোগের তফাৎও ভুলে গেছে। ভোগ মানে যে জোর জবরদস্তি না সেটা তারা ভুলে গিয়ে এমন কাজ করে যাতে তাদের বাকি জীবনও নষ্ট হয়ে যায়।

আর যে নারী বা মেয়েটি এসবের শিকার হয় আমি তাদের হয়ে কথা বললেও প্রশ্ন করতে চাই, আমরা তো জানি নারীই পারে চোখের ভাষা পড়তে। তারা কাঁধে হাত পড়লেই বুঝে যায় কোনটা কামনার আর কোনটা ভালোবাসার। সে নারী কেন এত সহজে আজ ধর্ষণের শিকার? তাদেরও কি কোথাও ইন্ধন আছে? কাজ করছে উগ্র লোভ বা লালসার মোহ? বারবার একেকজন একেকভাবে ফাঁদে পা দিচ্ছে কেন? জোরটা হচ্ছে কিন্তু কোনো এক নিরিবিলি জায়গায় যাবার পর। সেটা কি অভিভাবকেরা জানেন না? এই জানা না জানার মূল কারণ কিন্তু সংসারে সামাজিক মিডিয়ার তৈরি করা ফাঁদ। সে এমনভাবে পৃথক করে রেখেছে আজ মা বাবা ভাই বোন কেউ কারো খবর রাখে না। রাখার সময় পায় না। ফলে এমন সব অঘটন ঘটতে পারে। যখন ঘটে যায় তখন হা হুতাশ আর কান্না ছাড়া কিছুই বাকি থাকে না।

সমাজের কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও সঙ্গতি থাকলেও আমাদের দেশ জলবায়ু আর মানসিকতা নরম স্বভাবের। আমরা পাকিস্তানিদের যুদ্ধ করে হটালেও মূলত ভীতু জাতি। সে ভয় সমাজ ঈশ্বর পরিবেশ সবকিছু মিলিয়ে এক মায়াবী ভয়। এখন দেখছি তাও কেটে যাচ্ছে। ঈশ্বরে বিশ্বাসী মানুষ পরকালের জন্য ইহকালের অনেক কিছুতে ছাড় দেন। যার মধ্যে স্বর্গ-নরক অন্যতম। আজকাল দেখছি তা মুখে বললেও কাজে তরল হয়ে আসছে। যে কারণে মানুষ বেপরোয়া। সামাজিক মাধ্যমে ইনবক্স বলে যে বিষয় তার ভেতরে বাস করে শয়তান। তাকে আপাত দেখা যায় না বটে তবে সে ওঁৎ পেতে আছে।

আমাদের সমাজের এক বিরাট অংশে যে পচন তার পেছনে আছে রাজনীতি ও সামাজিক দস্যুদের ইন্ধন। তারা চায় না তারুণ্য ভালো থাকুক। তারুণ্য ভালো থাকলে স্বাভাবিক থাকলে কখন দ্রোহে মেতে ওঠে কখন রাজপথে নামে এক ভয়, আরেক ভয় কারা তাদের দিক ভুলিবে মতলব হাসিল করে। ফলে দু’একটা ধরা পড়ে খবর হলে হোক বাকিগুলো মজে থাক পাপে। কবিতা-গান লেখা, নাটক-সিনেমা পারত এককালে উদ্ধার করতে। এখন আর পারে না। পারে না অভিভাবকদের জাদুমাখানো কথা। কারণ তারা নিজেরাও আজ দিশেহারা। কেবল তারুণ্য ষোলো থেকে সত্তর সব মানুষের মন ও শরীরের ভাষা আজ ভিন্ন। সবাই জানে কিন্তু মানে না।

সমাজের এসব সমস্যা আর অসঙ্গতি দেখার কেউ নাই। রাজনীতি দেখবে না। সংগঠনগুলোও মৃতপ্রায়। তাই এর দায়িত্ব মানুষের। তারা যদি তা নিতে না পারে ভেঙ্গে যাওয়া সমাজে আর যাই হোক শিরদাঁড়া আছে এমন মানব মানবী থাকবে না আর। এমন লিঙ্গপ্রধান সমাজ এমন যৌনতানির্ভর পরিবেশ আগে দেখিনি। এ রাজনীতি তুমি কাকে নিবে গর্ব করবে কারা হবে তোমার পথের দিশারী?


লেখক- অজয় দাশগুপ্ত: সিডনি প্রবাসী।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads




Loading...