ক্যাসিনো প্রসঙ্গে আর্থ-সামাজিক বিশ্লেষণ

আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব

মানবকণ্ঠ
আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ১০:২৮,  আপডেট: ০৯ অক্টোবর ২০১৯, ১২:১৬

ছোটবেলায় ষাট দশকের দিকে প্রায় বছরে চৈত্র সংক্রান্তিতে পাবনা জেলাধীন কাজীরহাটের কাছে অনুষ্ঠিত ‘খাঁপুরা মেলায়’ যেতাম। তখন থেকেই খেয়াল করতাম সেখানের জুয়া খেলা। দেখতাম, পরিচিত ও অপরিচিত লোকসহ বন্ধু-বান্ধব জুয়ার কোর্টের ঘরে ঘরে দু’আনা বা চার আনা ধরছে। আর মাঝখানে একটি ছোট ঢেঁকি ঘুরিয়ে দেয়া হতো এবং যার ঘরে ঢেঁকির মাথা থামত, সেই হতো ভাগ্যবান। কেননা খেলার রীতি মোতাবেক সেই ওখানের সর্ব টাকা-পয়সার অধিকারী হতো। আর ঐ ব্যক্তি বাদে হতাশায় সবারই মুখ কৃষ্ণকালো দেখতাম।

আবার এও দেখেছি, প্রথমবার জিতেও লোভের বশবর্তী হয়ে পরবর্তীতে খেলে আম-ছালা সব হারিয়ে ফতুর হয়ে সীমাহীন মন খারাপ করে বাড়ি ফিরেছে। তাই তখন থেকে এ বিষয়টি খুব ভালোভাবে নেইনি। আর তখন না বুঝলেও বড় হয়ে বুঝেছি যে, এর পেছনে যে দর্শনটি কাজ করে তাহলো- স্বল্প মূলধনে অধিক অর্থ অর্জনপূর্বক দ্রুত ধনী হওয়ার প্রবণতা। তবে বাস্তবে দেখেছি যে, কম জুয়াড়িই বড় লোক হতে পেরেছে; বরং ফকির তো হয়েছেই এবং অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যাও করেছে।

তাই ইসলাম ধর্মসহ প্রায় সব ধর্মেই এটাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি এবং আমাদের সংবিধানেও নিষিদ্ধ। তাছাড়া জুয়াকে ঘিরে একটি বচন প্রচলিত আছে যে, ‘জুয়ার টাকা কখনো ঘরে ফিরে আসে না’। এদিকে এটাকে কেন্দ করে নানা অনৈতিক, অসামাজিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হয় বিধায় ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘ঈৎরসব নবমবঃং ঈৎরসব’ আর এই জুয়া কেবল জুয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর নেতিবাচক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী। কারণ এটাকে কেন্দ করে সমাজে নানা অপরাধের সৃষ্টি হয়ে থাকে।

এদিকে অর্থনীতিও এ কর্মকাণ্ডকে ভাল চোখে দেখেনি। কারণ এতে কল্যাণ বয়ে আনে না। আর বর্তমানে নেতিবাচক আর্থসামাজিক প্যারামিটারের চাপে অর্থনীতির জনক এ্যাডাম স্মিথের সেই ‘কল্যাণ কথাটি’ কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আর একটি কথা, মৌলিক চাহিদা মেটাতে যে অর্থ মানুষ আয় করে থাকে। সাধারণত সেই অর্থ নিয়ে জুয়া খেলতে যায় না। এক্ষেত্রে বাড়তি টাকা হিসেবে কালো টাকা (Black Money) নিয়ে দৌড়ে দৌড়ে ঐদিকে ধাবিত হয়ে থাকে। যা হোক, এখন সেই জুয়া কথাটি নেই।

অনেক আগে থেকেই ভদ্র নাম ধারণ করে ক্যাসিনো (Casino) হিসেবে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। বস্তুত ঈধংরহড় এর আভিধানিক অর্থ হলো- ‘সর্ব সাধারণের জন্য নৃত্যশালা’। আর এ শব্দটি এসেছে ল্যাটিন 'Casa' শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো- কটেজ (Cottage)| এতে প্রতীয়মান হয় যে, ক্যাসিনো শব্দটি জুয়া খেলার ধারের কাছেও নেই। তথাপিও সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করলে মনে হয়, নৃত্য চলাকালে সম্পূরক বিনোদনের জন্য অনৈতিক হলেও হয়তো জুয়া কথাটি উঠে এসেছে। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, জুয়া এবং ক্যাসিনো পুরোপুরি এক কথা নয়। এদিকে জুয়া খেলা আমাদের দেশে নতুন কিছু নয়। পূর্বেই বলেছি ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন প্রদর্শনী ও মেলায় জুয়ার আসর দেখেছি।

তাছাড়া সামাজিক আড্ডায় তিন তাসের বাজির কার্যকলাপও প্রত্যক্ষ করেছি এবং হাউজি খেলাও কম দেখিনি। কিন্তু এতে দেউলিয়া হওয়া কিংবা এর নেতিবাচক প্রভাব ততটা ক্ষতিকর নয়। যদিও এটি সমাজ কোনো দিন ভালোভাবে নেয়নি। এদিকে অনেক ক্ষেত্রে জুয়াকে আমরা ক্যাসিনোর সাথে গুলিয়ে-ফাঁপিয়ে শোরগোল শুরু করে থাকি। আসলে সর্বপ্রকার সুবিধাসহ একটি আধুনিক ক্যাসিনো অতটা সহজ নয়। এক্ষেত্রে স্ট্র্যাটেজিক অবস্থানসহ অনেক প্রকার উপাদান ও সুযোগ সুবিধা আবশ্যক। এ সূত্র ধরে প্রয়োজনীয় সার্ভিসসহ সট মেশিন, পোকার সেট, বাক্কারাট, রুলেট, পল্টুন, ফ্লাশ, রিট, ব্লাকজ্যাক, বিশেষ টেবিল, চিপ, ইত্যাদি আবশ্যক। তাছাড়া স্থানীয় সকল প্রকার পরিবেশ অনুকূল হতে হবে।

দুই.
তবে নাম যাই হোক না কেন, এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে আদি ভিত্তি জুয়া খেলাকে (Gambling) কেন্দ্র করে ক্যাসিনোর উদ্ভব হয়েছে। আর জুয়াখেলা কবে থেকে শুরু হয়েছে এবং কতকাল ব্যাপী মানুষের মধ্যে ক্রিয়াশীল, তা বলা সম্ভব নয়। তবে জানা যায়, এখন থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ভারতবর্ষের মৌর্যবংশীয় সম্রাট চন্দ গুপ্তের ব্রাহ্মণমন্ত্রী কৌটিল্য জুয়াখেলাকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আনার তাগিদ অনুভব করেছিলেন। সেহেতু অনেক পূর্ব থেকেই এটা শুরু হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। এদিকে ১৬৩৮ ইং সালে ইতালির ভেনিসে আনুষ্ঠানিকভাবে জুয়াখেলার আয়োজন করা হয়। তৎপর কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, চীন, আয়ারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, হংকং, ফিনল্যান্ড, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি ইত্যাদি দেশে এর রমরমা ব্যবসা। এশিয়া এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও কম নয়। আর আমাদের দেশের চারদিকে পার্শ^বর্তী দেশ ভারত, নেপাল, মিয়ানমার এবং শ্রীলঙ্কাও পিছিয়ে নেই। এদিকে বিশ্বের কতিপয় মুসলিম দেশেও (মিসর, তুরস্ক, মরক্কো, আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, আরব আমিরাত, ইত্যাদি) ক্যাসিনো ব্যবসা বহাল তবিয়তে চলমান। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, ১৯৩১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেভাদায় ক্যাসিনোর প্রথম আইনগতভাবে পদচারণা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে বৈধ ক্যাসিনোর সংখ্যা সহস্রাধিক।

এদেশের মধ্যে লাস ভেগাসের অবস্থান সবার উপরে। ক্যাসিনোর সারথি ধরে এখানে ঊষর মরুভূমিতে লাখ লাখ ধনাঢ্য ব্যক্তির আনাগোনা। আর এই ক্যাসিনোকে সামনে রেখে সারা বিশ্বের মানুষকে আকৃষ্টকল্পে তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম প্রকৃতি, বিশ্বখ্যাত জাদু, সাকার্স ও জীবন্ত হাঙ্গরের বিশাল এ্যাকুরিয়ামসহ অনেক কিছু। আর এই লাস ভেগাসের আলো এতটাই ঝলমলে যে মহাকাশ থেকে নাকি দেখা যায়। তবে সংশয় জাগে যে এই আলো বিক্রিয়া করে শেষ পর্যন্ত এ বিশ্বকে কোন অবস্থায় নিয়ে যাবে; সেই বিষয়টি চিন্তা করতে না হয় সম্মানিত পাঠকদের ওপর ছেড়ে দিলাম।

যাহোক, এর বছরে আয় প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার। আর জুয়াখেলার এমনই শিকড় গেড়ে বসেছে যে, লাস ভেগাসের ক্যাসিনো মালিকদের নিজস্ব নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে। সত্যি কথা বলতে কি, বিশ্বজুড়ে ক্যাসিনোর পরিধি জ্যামিতিক গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে এই ক্যাসিনো ব্যবসা প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল শিল্প বললে বোধ হয় বেশি বলা হবে না। অবশ্য এটিকে শিল্প বললাম এই কারণে যে টাকার অঙ্কে এর আর্থিক সংশ্লেষ ৪২ লাখ কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ২০১৯-২০ অর্থবছরের সমপরিমাণ বাজেটের আদলে অনায়াসে আটটি বাজেট করা যাবে। তবে এর গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া জ্ঞানী-গুণীদের ভাবিয়ে তুলেছে। আর যতই অনৈতিক ও ধর্মীয় বেড়াজালে এই ক্যাসিনোকে আটকাতে চাই না কেন, তা বোধ হয় সম্ভব নয়। কেননা এখন আকাশ সংস্কৃতির আওতায় ফেসবুকের ন্যায় অনলাইনে দেদার হচ্ছে।

গত বছর (২০১৮ইং) এর পরিমাণ ছিল পাঁচ শত কোটি ডলার। তাছাড়া টুরিস্টদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রায় পাঁচ তারকা হোটেলে স্বল্প পরিসরে ক্যাসিনোর ব্যবস্থা আছে। এটা নাকি পর্যটন শিল্পের বড় একটি নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত। এদিকে এ বিশ্বের অভিভাবক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি বড় ক্যাসিনো ব্যবসার মালিক।
তিন.

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখ হতে ঢাকা রাজধানীসহ সারা বাংলাদেশে র‌্যাব অভিযান শুরু করে। আর অভিযানের স্থানগুলো ক্যাসিনো সম্বলিত ক্লাব [যেমন- ফকিরাপুলের ইয়াং মেনস ও ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, বনানীর গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ, ধানমণ্ডি ক্লাব, কলাবাগানের ক্রীড়াচক্রের ক্লাব, মতিঝিল ক্লাব, মোহামেডান ক্লাব, তেজগাঁওয়ের ফু-ওয়াং ক্লাব এবং গুলশানের নাভানা টাওয়ারস্থ স্পা]। তাছাড়া ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের কাজির দেউড়ি এলাকার হ্যাংআউট নামক বারেও অভিযান চলে। এ অভিযানে প্রতীয়মান হয় রাজধানীতে প্রায় একশত ক্যাসিনো রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৬০টিরও বেশি রাজনৈতিক বিভিন্ন স্তরের নেতাদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত। অভিযানের প্রাক্কালে এই সকল ক্যাসিনোতে নানা জুয়া সামগ্রী, কোটি কোটি ক্যাশ টাকা ও ডলার, ভরি ভরি স্বর্ণ, মদ, মাদকদ্রব্য, অস্ত্র ইত্যাদি পাওয়া যায়।

এতদ্ব্যতীত জানা যায় যে, এখানে নাকি অনেক মডেল নায়িকার আনাগোনাও ছিল। এর মধ্যে অনেক ক্যাসিনো সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। আর কতিপয় ক্যাসিনোর মালিক গ্রেফতার হলেও অনেকেই দেশে গা ঢাকা দিয়েছে বা বিদেশে পালিয়ে গেছে। এ প্রেক্ষাপটে বাজারে ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন যে, হয়তো তারা অনেক ক্যাশ ডলার কিনে গোপনে বিদেশে যাওয়ার জন্য সচেষ্ট হয়েছে বিধায় ডলারের দাম চড়া হয়েছে। এদিকে যতদূর জানা যায় এদের শিকড় নাকি অনেক গভীরে। বেশিদূর আগালে নাকি অনেক স্বনামধন্য রুই-কাতলা বের হয়ে পড়বে। মজার ব্যাপার হলো যে, এই জুয়া তথা ক্যাসিনো কর্মকাণ্ড গর্হিত অপরাধ হলেও এর শাস্তি বা দণ্ড হাস্যকর।

কেননা সেই ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় গভর্নর জেনারেল জন লরেন্সের শাসন আমলে এ ব্যাপারে যে আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল [প্রকাশ্য জুয়া আইন, ১৮৬৭/The Public Gambling Act 1867 ] সেটাই ১৫২ বছর ধরে চলে আসছে। এই আইনে দণ্ডের ব্যাপারে ৩ ধারা অনুযায়ী উল্লেখ আছে যে, অনূর্ধ্ব দুইশত টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং পেনাল কোডের সংজ্ঞানুসারে অনূর্ধ্ব তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড দণ্ডনীয় হবে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, এই দণ্ড অপরাধের তুলনায় অতি তুচ্ছ বলে পরিগণিত।

চার.
মূলত ক্যাসিনো হলো পুঁজিবাদ অর্থনীতির দুষ্ট ছেলে। একে নিয়ন্ত্রণ করা মুষ্কিল। কেননা এর বিচরণ শ্যাডো অর্থনীতিতে। আর এর ধারক ও বাহক হলো রুই-কাতলা। এরা এতটাই গভীর পানি দিয়ে চলে যে এদের গায়ে শ্যাওলার আস্তরণ পড়ে গিয়েছে বিধায় আইনগতভাবে ধরলেও হাত পিছলে বের হয়ে যায়। পূর্বেই বলেছি, অর্থনীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আলটিমেট উদ্দেশ্য হলো কল্যাণ (Welfare) কিন্তু আমাদের দেশেই বলেন, আর সারা বিশ্বের দেশের কথা বলেন, সেই উদ্দেশ্য করে কি সামনে আগাতে পারছে? নিশ্চয় না। বর্তমান বিশ্বে বড় ব্যবসা হলো অস্ত্র ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, স্বর্ণ পাচার ইত্যাদি। আর এগুলো যে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না, তা সহজেই অনুমেয়। তাহলে ক্যাসিনোকে কোন পাল্লায় মাপবেন? যদি এতটাই খারাপ হয়, তাহলে দিনে দিনে বিস্তৃতি লাভ করছে কেন? পাশ্চাত্য দেশের কথা বাদ দিলাম।

ইসলাম ধর্মের কোরান ও হাদিসে এই ক্যাসিনো ব্যবসা বড় অপরাধ এবং মহাপাপ বলে উল্লেখ করলেও কেন বেশ কতগুলো মুসলিম রাষ্ট্রে এই ব্যবসা গায়ে বাতাস লাগিয়ে এগিয়ে চলেছে? এদিকে অর্থনীতির নীতি তথা নৈতিকতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তাই উৎপাদনের চারটি ফ্যাক্টরের (ভূমি, শ্রম, মূলধন ও সংগঠন) আওতায় ভিক্ষা, চুরি, ডাকাতি ও ঘুষের টাকা বিবেচনায় আনে না। এদিকে বাস্তবে দেখেছি অধিকাংশ ব্যবসায়ী নীতির ধার ধারে না। যেখানে বেশি লাভ, সেই দিকে ছুটে থাকে। তাছাড়া এটাও জানি, রিস্ক (জরংশ) বেশি থাকলে লাভ বেশি। তাই বোধ হয় দিনে দিনে ক্যাসিনো ব্যবসা ডালপালা বিস্তার করে চলেছে। বিগত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখে অভিযানের ফলে পত্রিকায় দেখলাম ক্যাসিনো ঘিরে যে মানুষগুলো সংশ্লিষ্ট ছিল, তাদের মধ্যে অনেকে নাকি শেয়ার বাজারে মার খেয়ে এই ব্যবসায় এসেছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশে এখন জনসংখ্যার সুবর্ণ ধাপে (Demographic Dividend) চলমান। তাই কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা বেশি। কিন্তু এটা সত্য যে, বর্তমানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা তুলনামূলক অধিক বিধায় তারাও এই পথে চলে আসার বিষয়টি অস্বীকার করা যায় না। তাছাড়া শ্যাডো অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ঋণখেলাপির সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষগুলোর ভিড় (আর্থ-সামাজিক প্যারামিটার বিবেচনায় এনে) প্রণিধানযোগ্য।

এ সূত্র ধরে উল্লেখ্য যে, একই সরকার যদি বছরের পর বছর ক্ষমতায় থাকে। আর যদি আন্তরিক হয়। তাহলে দেশ উন্নতির দিকে যায়। এতে দেশের জিডিপি বেড়ে যায় এবং মানুষের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায়, যা সঞ্চয় বাড়ার পথ সুগম করে এবং ছোট ও বড় পরিসরে বিনিয়োগ হয়ে একটি ইতিবাচক ঘূর্ণায়মান সার্কেলে সৃষ্টিপূর্বক অর্থনৈতিক বুনিয়াদ দৃঢ় করে থাকে। আর এটা সত্য যে বর্তমান সরকারের আমলে প্রভূত মূলধনীয় তথা উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। আর এর ভালো দিক থাকলেও একটি নেতিবাচক দিক হলো, এই সময়ে একদল খল জাত মানুষের উন্মেষ হয়, যারা দেশপ্রেমিক নয়।

তারা নানা ছলাকলা কৌশলে বিভিন্ন উৎস থেকে উদ্ভূত কালো টাকার মালিক হয়ে পড়ে এবং এরা দেশের মঙ্গল চিন্তা না করে কেবল নিজেদের চিন্তা করে ক্ষতিকর ও অনৈতিক কোনো কাজ করতে দ্বিধা বোধ করে না। এদের নেশার কভারে চাহিদা এত বেড়ে যায় যে, প্রভাবশালীদের ছত্র ছায়ায় ‘অর্থলোভী প্রতিবন্ধী’ হয়ে দেশ ও সমাজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মাদক, অস্ত্র পাচার, স্বর্ণ পাচার, ক্যাসিনো এবং অর্থ পাচারের মতো ঘৃণিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। তাই এদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। যাহোক আমাদের প্রতিপাদ্য বিষয় ক্যাসিনো বিধায় এর ওপর কিছু সূত্রকথা বলতে হচ্ছে। মজার ব্যাপার হলো যে স্মরণকাল থেকে সব সময়েই জুয়া তথা ক্যাসিনোকে সবাই আড় চোখে দেখছে। আর ধর্ম, অর্থনীতি ও সমাজবিজ্ঞানসহ কোনো বিজ্ঞানই এটিকে সমর্থন করেনি। তাহলে কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বে ক্যাসিনোর এত জয়গান কেন?

পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, আমাদের দেশে কোনো মেলা বা প্রদর্শনী হলে বিধিনিষেধ সত্তেও বাড়তি বিনোদনের জন্য সেখানে জুয়ার আসর বসে যায়। এটা কি রকম বিনোদন এবং কতখানি সমাজের উপকারী, তার সংজ্ঞা আমার জানা নেই। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে, অনেক মনীষী বলে থাকেন যে, স্বর্গীয় দূত এনে যদিও দেশ চালানো হয়, তাহলে কিছু না কিছু দুর্নীতি থেকেই যাবে। সেই সূত্র ধরে এমন কোনো দেশ নেই যে, যেখানে কালো টাকা নেই। তবে আমাদের দেশে তুলনামূলক বেশি। বস্তুত ক্যাসিনো এবং কালো টাকা একই খল পরিবারের সন্তান। বলতে গেলে নেতিবাচক সর্বকাজে কালো টাকাই ছড়ি ঘুরায়। এ প্রেক্ষাপটে সম্যক ধারণার জন্য একটি রূপক কথা বলতে হচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে উল্লেখ্য যে, টাকা তো টাকাই। এখানে কালো টাকা বা সাদা টাকা বলতে কিছু নেই। তবে একটি কথা থেকে যায়, তাহলো কালো টাকা উশৃঙ্খল এবং হিসাবের মধ্যে থাকে না।

আমরা এখানে টাকাকে নদীর প্রবাহের সাথে তুলনা করতে পারি। নদী যেখান দিয়ে বয়ে যায়, সেখানের দু’পাশে তরুরাজিসহ জনপদ গড়ে ওঠে। ঠিক টাকার প্রবাহ যখন চলতে থাকে তখন অর্থনৈতিক কার্যাবলি সৃষ্টি হয়। কিন্তু গোল বাঁধে কালো টাকা নিয়ে। এর এলোমেলো ধার এবং বেগ অত্যধিক। তাই এটি নিয়ন্ত্রণ করা না হলে খরস্রোতা নদী যেমন- দু’কূল ভেঙে নিয়ে যায়। সে রকম কালো টাকাও সমাজ তথা দেশে দুর্নীতি ও অবক্ষয় সৃষ্টি করে থাকে। এদিকে সমাজতান্ত্রিক তত্তের পুরোধা হিসেবে খ্যাত লেনিন বলেছিলেন যে, কালো টাকা ছাড়া মূলধনীয় কর্মকাণ্ড তথা উন্নয়নমূলক কাজ তেমন হয় না। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে, অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে কালো টাকার বিনিয়োগের তেমন স্কোপ নেই।

বাস্তবে দেখেছি সরকার সুযোগ দিলেও প্রশ্নবিদ্ধর ভয়ে কালো টাকার মালিকরা এগিয়ে আসে না। তারা বিদেশে কালো টাকার পাচার করে সেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করে কিম্বা সেকেন্ড হোম গড়ে তোলে। আর পাচার তো দেশি টাকা নয়, এটা পুরোপুরি স্বর্ণ বা ফরেন এক্সচেঞ্জ। এর ফেস ভ্যালু যেটাই হোক না কেন, ইকোনোমিক এ্যানালাইসিসে এর সাথে আরো ২৫% যোগ করতে হয়। তাহলে দেখুন, কত বড় ক্ষতি হয়? সহজ কথায় যদি বলি, তাহলে বলতে হয় ‘পুরোপুরি মূল্যবান মূলধন চুরি’। এদিকে এমনও শুনেছি, কিছু কিছু কালো টাকাওয়ালা প্রায়ই বিদেশের ক্যাসিনোতে জুয়া খেলতে যায়। তারা নাকি তুলনামূলকভাবে সেখানে অধিক সমাদৃত। এক্ষেত্রে এখন প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে যে, ঢাকা রাজধানীসহ বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শতাধিক ক্যাসিনো ঘিরে হাজার হাজার কোটি টাকাসহ ঐ মানুষগুলো কি করবে?

বর্ণনাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে, হয়তো বা তারা উক্ত টাকাসহ দেশ থেকে পালাবে এবং এর ফলশ্রুতিতে শ্যাডো অর্থনীতির একটি বিরাট অংশ মূলধন হারাবে। আর যদি ক্যাসিনোর থেকে বিধি নিষেধ উঠিয়ে ফেলা হয়, তাহলে বাংলাদেশের ধর্মভীরু মানুষরা ছাড় দিবে না। আসলেই এই বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিষয়টি জটিল। এদিকে দেশটি গ্লোবাল ভিলেজের সদস্য হিসেবে অনেক নেতিবাচক প্যারামিটার অন্যদেশ থেকে সক্রিয়ভাবে প্রবেশ করে থাকে। তখন কিভাবে বাধা দেবেন।

অন্যদিকে সমাজের অবক্ষয়ের বিষয়টি বিবেচনায় করলে ক্যাসিনো ব্যবসা সমীচীন নয়। পরিশেষে এই কথা বলে শেষ করছি যে, ক্যাসিনোতে দেশ ও সমাজ যতখানি উপকৃত হয়, তার চেয়ে অনেক গুণ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিদ্যমান। আর অভিযানের সরণি ধরে ক্যাসিনো যদি বন্ধ করে দেয়া হয়। তাহলে কি বন্ধ হবে? সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা কলাকৌশলে চোরা বা গোপনে চলতেই থাকবে। যত কথাই বলি না কেন, বাস্তবতা তো মেনে নিতেই হবে। তাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে খণ্ড খণ্ড ক্যাসিনো বন্ধ করে আইনের আওতায় আনা বাঞ্ছনীয়। তবে এখানে বাহ্যিকভাবে বন্ধ করতে পারলেও অনলাইনে বন্ধ ঠেকানো সম্ভব নয়।

আর এ ব্যাপারে একটি টাস্কফোর্স গঠনপূর্বক প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করে বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে একটি রূপক (Allegorical) কথা এসে যায়, তাহলো বাতির যতই আলো থাকুক না কেন, তার নিচে অন্ধকার থাকেই। আর সেই অন্ধকার কতটা পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, সে ব্যাপারেই সচেষ্ট হওয়া বিধেয়। তাছাড়া বাস্তবতার গভীরে না যেয়ে সবকিছুতে অতি আবেগ ও উচ্ছ্বাস ভালো নয়।


লেখক- আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব: গবেষক ও অর্থনীতিবিদ




Loading...
ads




Loading...