তাদের মূল শক্তি ক্ষমতা : সরব অভিযান নীরব ধর্ষণ

রিন্টু আনোয়ার

মানবকণ্ঠ
রিন্টু আনোয়ার - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১১:২৯,  আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৩১

ক্যাসিনোবিরোধী নামে শুরু হয়ে চলমান অভিযান এখন চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজরাও টার্গেট। খালেদ, শামীম, লোকমান হয়ে সম্রাট পর্যন্ত। দুর্নীতিবাজ আমলা, ব্যবসায়ী, অর্থ পাচারকারীদেরও ছাড় নেই বলে হুঁশিয়ারি আসছে সরকারি মহল থেকে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারীদেরও এ অভিযানের আওতায় আনা হবে জানিয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক। আর এই অভিযানের আলোচনা-সমালোচনা তথা ডামাডোলে ধর্ষণের খবরটা অনেকটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।

গণমাধ্যমে যেন ধর্ষণের নিউজভ্যালু কমে গেছে। এই সুযোগে ধর্ষকরা অনেকটা আনডিস্টার্বে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ক্রিয়াকর্ম। তবে, ধর্ষক সোসাইটিতে একটা ভিন্নতা লক্ষণীয়। শিক্ষক (স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ, কোচিং সেন্টার এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত), পুলিশ কর্মকর্তা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীসহ সমাজের এলিটদের এ কাজে নাম আসছে অহরহ। তবে ধর্ষণে কিছুটা রকমফেরও রয়েছে। পাটক্ষেত, বস্তি, তিনতারা, পাঁচতারা পেরিয়ে ডিজিটাল জন্মদিনের প্রেক্ষাগৃহে এবার ধর্ষণের ঘটনার খবর পুরনো। কিন্তু ক্ষমতার সুবাদে অধীনস্থ কিংবা পরিচিতদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে দিনের পর দিন সম্ভোগের কিছু ঘটনা প্রকাশ পাচ্ছে সম্প্রতি।

এগুলোকে ধর্ষণ বলা যাবে কিনা, এ প্রশ্ন কিন্তু রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে বা বাইরে, প্রশাসন থেকে শুরু করে সরকারি বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তির অনৈতিক সম্পর্ক বা নানা অপকর্ম প্রকাশ পেতে শুরু করেছে বেশকিছু দিন ধরে। যা দেশজুড়ে বেশ আলোচনা ও সমালোচনার জš§ দিচ্ছে। এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে অনেকে চাকরিও হারাচ্ছেন। কেউ সাময়িক বরখাস্ত, প্রত্যাহার বা শাস্তিজনিত বদলিও হচ্ছেন আবার কারো ঠাঁই মিলছে কারাগারে। এ অবস্থার মধ্যেও টনক নড়ছে না কারোরই। দিনের পর দিন ঘটে চলেছে নানা আপত্তিকর অপকর্ম অথচ এসব অপকর্মের নেতিবাচক প্রভাব যেমন তার ব্যক্তিজীবনে চরম আঘাত হানছে, তেমনি সংসার বা পরিবারও তছনছ হয়ে যাচ্ছে। এসব অনৈতিক বা লজ্জাজনক কর্মকাণ্ডের শিকাররা ব্যক্তিগতভাবে হচ্ছেন অপমানিত। তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনরাও সমাজে কম হেয় হচ্ছেন না। এই প্রভাবে সুখের সাজানো বহু সংসার তছনছ হচ্ছে। অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য জীবনে। সম্প্রতি জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবীর থেকে শুরু করে সব শেষে পল্টন থানার ওসি (সদ্য সাময়িক বরখাস্তকৃত) মাহমুদুল হকের ক্ষেত্রে ঘটেছে এমন ধরনের ঘটনা।

জামালপুরের সাবেক ডিসি আহমেদ কবির আর অফিস সহকারীর অন্তরঙ্গ ভিডিও দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরপর বিষয়টি ধামাচাপা দিতে আহমেদ কবির নানা চেষ্টা চালান কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিয়ে তাকে সাময়িক বহিষ্কার করেন। এর আগে পুলিশের ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে ঘুষবাণিজ্য ও এক সংবাদ পাঠিকাকে তুলে এনে বিয়ে করা ও তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নির্যাতনের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। সেই প্রভাবশালী ডিআইজির এখন ঠিকানা হয়েছে কারাগার। তারপরও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা দিন দিন যার যেখানে ক্ষমতা ও সুবিধা সেখানেই লিপ্ত হচ্ছেন কাম লিপ্সায়।

পল্টন থানার ওসি মাহমুদুল হকের বিরুদ্ধে এক তরুণীকে চাকরি দেয়ার কথা বলে ও বিয়ের আশ্বাসে দিনের পর দিন ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার পর ওসি মাহমুদুল হককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে পুলিশ সদর দফতর অথচ এই ওসির ফেসবুক ঘেঁটে দেখা গেছে, তিনি তার ফেসবুকে স্ত্রী, সন্তানদের নানা ছবি শেয়ার করেছেন। বিভিন্ন সময়ে কক্সবাজার ও বিদেশে বেড়াতে যাওয়ার ছবিও পোস্ট করেছেন। দেখলেই মনে হবে কত সুন্দর ও সুখী পরিবার অথচ মুহূর্তেই তাদের সুখের সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলে উঠল মাহমুদুলের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। এ ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই হয়তো ওসি মাহমুদুলের সঙ্গে তার স্ত্রীর সম্পর্কটাও তেমন ভালো যাচ্ছে না। শুধু কি স্ত্রী, তার পরিবার, শ্বশুরবাড়ির লোক, কাছের বন্ধু ও আত্মীয়স্বজনরাও তার ব্যাপারে নানা কিছু ভাবছেন। এতদিন যারা মাহমুদুল হককে ভালো মানুষ হিসেবে জানতেন ও চিনতেন, তারাও হয়তো বিষয়টি জানার পর থেকে লজ্জা বা ঘৃণা নিয়ে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেছেন।

কিছুদিন আগেও বিভিন্ন জায়গায় ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানিতে ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন লীগের নাম আসছিল বিরতিহীনভাবে। অল্প সময়ের মধ্যে সেখানে বিশেষ জায়গা করে নেন শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আলেম, আমলা, পুলিশের নাম। সম্প্রতি হাইকোর্টের এক পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কিছু ডিসি-ওসি নিজেদের জমিদার মনে করেন। ডিসি-এসপিসহ আমলা বা প্রশাসনিক কর্তাদের বিভিন্ন খবরদারি ও ক্ষমতাচর্চার কারণেই এসেছিল মন্তব্যটি। সেখানে ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা আমোদ-ফুর্তির কোনো বিষয় ছিল না কিন্তু এ রকম সময়ে ডিআইজি মিজান, ওসি গনি পাঠান, মাহমুদুল, ডিসি কবীর, উপসচিব রেজাউল করিম রতন কেমন যেন প্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে এক নারীর সঙ্গে জামালপুরের ডিসি আহমেদ কবীরের ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি বিভিন্ন মহলে তোলপাড় ও ধিক্কারের ঝড় তুলেছে। এ ধরনের ঘটনায় হোতারা যা করেন, তিনিও তা-ই করেছেন।

বলেছেন, ভিডিওটি বানানো। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। একটি চক্র তাকে নানাভাবে ব্ল্যাককমেইল করার চেষ্টা করেছে অথচ সাংবাদিকরা ভিডিওটিতে দেখানো কক্ষটি তার অফিসের বিশ্রাম নেয়ার কক্ষ এবং ওই নারী তারই অধীন কর্মী জানালে জবাব এড়িয়ে সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান ডিসি অথচ তিনি জামালপুরে যোগদান করার পর থেকেই সেখানে একাধিক নারীর যাতায়াতকে কেন্দ্র করে গোটা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে নানা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল।শেষ পর্যন্ত সেটা সাবজেক্ট হয়ে গেল ভিডিও ফাঁসের মধ্য দিয়ে। প্রশাসনের আরেক কর্মকর্তা তথা শিক্ষক এ কে এম রেজাউল করিম রতনের কেসটা কিঞ্চিৎ ভিন্ন। মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজে প্রিন্সিপাল থাকাবস্থায় নিজ রুমে ডেকে নিয়ে কৌশলে কোমল পানীয় খাইয়ে অচেতন করে ধর্ষণের ভিডিও ধারণ করেছিলেন তিনি নিজেই। পরে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে টানা এক বছর ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করেন এই রতন। ২০১৮ সালে পদোন্নতি পেয়ে সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হন তিনি। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর করা মামলায় তদন্ত প্রতিবেদনে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে জনপ্রসাশন মন্ত্রণালয়। তবে চার্জশিট প্রকাশের পর জামিন অযোগ্য মামলায় তার জামিন হয়ে যায়। অভিযোগ উঠেছে, জামিন পাওয়ার পর ধর্ষিতার ওপর হামলাও করেন তিনি। এই হামলার একটি মামলাও হয়েছে।

এক সংবাদ পাঠিকাকে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে বিয়ে করাসহ নানা অপকর্মের জন্য প্রত্যাহার হওয়া ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিচার চলছে। খুলনার জিআরপি থানার ওসি ওসমান গনি পাঠানসহ ৫ পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এক নারীকে গণধর্ষণের পর ইয়াবা কেসে ফাঁসিয়ে দেয়ার ঘটনা কিছুটা আড়ালে চলে গেছে। ফেনীর কলেজ অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুলের শিক্ষক পরিমল, মোহাম্মদপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রতনরা প্রায় কাছাকাছি প্রজাতির। কবীর, মিজান, মোয়াজ্জেম, গনি পাঠান, মাহমুদুলরাও একই গোত্রের। তাদের মূল শক্তি ক্ষমতা। কোনো না কোনোভাবে তারা প্রত্যেকেই ক্ষমতাশালী। খাট শুধু জামালপুরে ডিসি সাহেবের ওখানেই পাওয়া যায় না। খোঁজ নিলে এমন খাটকাহিনী পাওয়া যাবে বহু জায়গায়। উনি ধরা পড়ে গেছেন এই যা। প্রশাসনের এই জমিদার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা সহজ ব্যাপার নয়। এর পরও ঘটনাচক্রে কিছু কিছু ফাঁস হয়ে যায়। সবগুলোর শাস্তি হয় না। এক হিসাবে জানা গেছে, গত ১০ বছরে প্রশাসনের ২৭৪৮ কর্মকর্তার নারীঘটিতসহ বিভিন্ন দুষ্কর্মের অভিযোগ থাকলেও বিচার হয়েছে একেবারে সামান্য কয়েকজনের। যেন এমন মোজফুর্তি, বালাখানা, খাট, মোটেই বড় ঘটনা নয়। ধরা না পড়লে এটাও ঘটনা হতো না। চলত অবিরত। তাই কোথাও কোথাও আনডিস্টার্বে চলছে এই অপকর্ম।


লেখক-রিন্টু আনোয়ার: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 




Loading...
ads




Loading...