সুখ-শান্তি আর সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক ঈদুল আজহা


poisha bazar

  • ১১ আগস্ট ২০১৯, ১১:১৩

পৃথিবীর সমস্ত মুসলমানদের প্রধান দুটি উৎসবের মধ্যে একটি হচ্ছে ঈদুল আজহা। ঈদ ঘরে ঘরে আনন্দ আর খুশির শিহরণ জাগায় ছোট, বড়, ধনী, গরিব সকলের মাঝে কন্দরে। এদিন হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে যাওয়ায় কোনো মানুষের ভেতর আমিত্ব থাকে না। শুধুমাত্র মুসলিম সমাজেই তার আনন্দ বার্তা ছড়ায় না। সর্বত্রই বিঘোষিত হয়ে ওঠে ঈদের জাগরণী উচ্ছ্বাস। মহামিলনের ঐক্যবন্ধনে দৃঢ় সূত্র গেঁথে যায় তেপান্তরে সীমানা দিগন্ত ছাড়িয়ে। পবিত্র ঈদুল আজহার আনন্দ ও মহান আল্লাহকে খুশি করতে পশু কোরবানির মধ্য দিয়ে আত্মত্যাগের শান্তির বাণী ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি ঘরে ঘরে।

ধর্মীয় মূল্যবোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় চেতনার ছোঁয়া দিয়ে এই ঈদে মানবিকতা জাগ্রত হয়ে ওঠুক। ঈদ শুধু নিছক আনন্দ আর ফুর্তির নাম নয়; এ থেকে আমাদের জীবনের জন্য শিক্ষণীয় আছে অনেক কিছু। বিশেষ করে সুখ, সৌহার্দ্য আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসা এই পবিত্র উৎসবে ধনী-দরিদ্র, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সব মুসলমান মিলেমিশে ঈদের আনন্দ সমভাগ করে নেন, পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ, অহংকার ভুলে খুশিমনে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করেন।

কোরবানির আদর্শ হয়তো এসব অনুভূতিতেই লুকিয়ে আছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে ঈদ ভাবনায় এসেছে পরিবর্তন। এ পরিবর্তনে প্রকট হয়ে উঠেছে আর্থ-সামাজিক বৈষম্য আর প্রতিযোগী মন। বিশেষ করে এখন ঈদের আনন্দ নিয়ন্ত্রণ করছে আর্থিক সামর্থ্যের উপরে। তাই তো ঈদ মানে খুশি হলেও ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদের খুশি, উৎসর্গ করতে পারার খুশি। যাকে বলা হয় ত্যাগের মহিমা।

কোরবানি শব্দটি আরবি। এর শাব্দিক অর্থ হলো নৈকট্য, সান্নিধ্য, আত্মত্যাগ, জবেহ, রক্তপাত ইত্যাদি। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় কোরবানি বলা হয়, মহান রাব্বুল আলামিনের নৈকট্য ও সন্তুষ্ট লাভের আশায় নির্ধারিত তারিখের মধ্যে হালাল কোনো পশু আল্লাহর নামে জবেহ করা। কোরবানি নতুন কোনো প্রথা নয়, বরং এটা আদিকাল থেকে চলে আসছে।

কোরবানি শুধু ভোগ বিলাস আর পেট পুরে গোশত খাওয়ার জন্য নয়, বিশাল পশু ক্রয় করে ফেসবুকে ছবি দেয়ার জন্য নয়, নিজেকে সমাজের বড় কোরবানিদাতা হিসাবে পরিচিত করার জন্য নয়, এলাকায় সুনাম সুখ্যাতি অর্জনের হাতিয়ার হিসাবে বিবেচনায় নেয়ার জন্য নয় বরং মহান রবের হুকুমের কাছে নিজের আমিত্ব কর্তৃত্ব গর্ব অহংকার ভুলে গিয়ে জীবনের সকল কিছু তাঁর রাহে ব্যয় করার মাধ্যমে মনিবের সাথে গোলামের নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলার অতি উত্তম উপকরণ মাত্র।

কোরবানির মাধ্যমে প্রতিটি মু’মিন মুসলমান নতুন করে উজ্জীবিত হয়ে এই শপথ নিবে যে, সকল প্রকার অন্যায় অত্যাচার জুলুম নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিজের জান মাল আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেবে এতেই মু’মিনের সফলতা! কোরবানিতে ব্যক্তি পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের অনেক কল্যাণ ও উপকার নিহীত রয়েছে। ব্যক্তি পর্যায়ে যখন কোনো সফলতা আসে তখন একজন মুসলমানের করণীয় হচ্ছে যার অসীম করুণায় সফলতা পেল তাঁকে ধন্যবাদ দেয়া কৃতজ্ঞতা আদায় করা, শুকরিয়া জ্ঞাপন করা, মহান মালিকের কুদরতী পা’য়ে সিজদা দেয়া এবং তাঁর নামে পরিবার পরিজনের জন্য কিছু ব্যয় করা, পাড়া প্রতিবেশীদের জন্য সমাজ ও দেশের জন্য কিছু উৎসর্গ করা কোরবানির উত্তম নমুনা। মহাগ্রন্থ আল-কোরানে বর্ণিত হচ্ছে-‘হে নবী আমি অবশ্যই আপনাকে (নিয়ামতে পরিপূর্ণ) কাওসার দান করেছি। অতএব তোমার মালিককে স্মরণ করার লক্ষ্যে তুমি নামাজ পড়ো এবং তাঁরই উদ্দেশ্যে তুমি কোরবানি করো।

বিশ্বের মুসলমান পশু কোরবানির মাধ্যমে উৎসর্গের মানসিকতা তৈরি হওয়াটাই হচ্ছে কোরবানি ঈদের বড় শিক্ষা। পশু কোরবানি করা হয় প্রতীকী অর্থে। এই ঈদে নগরীর রাস্তায় রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়ার পাশাপাশি দেখা যায় গরু আর খাসি। আবার ঠাসাঠাসি করে ট্রাকে ট্রাকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসছে গরু। ক’দিন আগেও যা ছিল খেলার মাঠ, এখন তা গরু-ছাগলের হাট। রাস্তাঘাটে গরুর দড়ি-ছড়ি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা যায় অনেককেই। কোথাও ছুটন্ত গরুর টানে দাঁড়ানো দায়। আবার কোথাও দাঁড়ানো গরুকে নাড়ানো দায়। কোনো গরু সুবোধ, কোনো গরু অবোধ আবার কোনো গরু অবাধ্য। গরুর হাটেও রয়েছে প্রতিযোগিতা।

কেউ দামি গরু কিনে নামি হতে চান। কেউ বা ক্রেতা বুঝে বাড়তি দাম হাঁকান। তারপরও লাখ লাখ গরু কেনাবেচা হচ্ছে। আর আনন্দের সঙ্গে তাই নিয়ে বাড়ির দিকে ছুটছেন ক্রেতা। এ এক অন্যরকম আনন্দ। প্রতি ঈদেই শোনা যায় এবার ঘরমুখো মানুষ যেন নিরাপদে এবং সহজে বাড়ি যেতে পারেন তার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের অব্যবস্থা এতটাই তীব্র যে ব্যবস্থাগুলোর অবস্থা অত্যন্ত করুণ। কালোবাজারে টিকিট এখনো পাওয়া যায়। খানা-খন্দে ভরা রাস্তার দুরবস্থা এখনো দেখতে হয়। গাড়িগুলো এসব রাস্তায় পড়ে মাঝে মাঝেই গাড়িনৃত্যে মেতে ওঠে। সড়ক-মহাসড়কে মহাযানজট। ভোগান্তিতে ঘরমুখো মানুষ। কি অদ্ভুত আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা। যে দেশ যত উন্নত তার যোগাযোগ ব্যবস্থাও তত উন্নত। প্রতিটি সরকার এলেই বলে, দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে। অথচ প্রতি ঈদেই মানুষের বাড়ি যাওয়া এবং বাড়ি ফেরার সময় অজানা আতংকে থাকতে হয়।

আমাদের দেশে তো আবার ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সবাই মোটামুটি বেশ ত্বরিতগতিতে বক্তৃতা, বিবৃতি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কেন হলো? কিভাবে হলো? কে করল? ওকে বাঁধো, একে ধরো, তদন্ত কমিটি করো। কিছুদিন পর সব শেষ। যেভাবে শেষ হয়েছে রানা প্লাজা কিংবা গত ঈদে পদ্মায় ডুবে যাওয়া লঞ্চের মতো অনেক দুর্ঘটনার বেলায়। কিন্তু শেষ হয়নি সেসব পরিবারের অবস্থা, যারা দুর্ঘটনায় স্বজন হারিয়েছেন, যারা পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত দু-একটি পরিবারের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ রয়েছে।

তাদের জীবন যে কি দুঃসহ দুঃখ-কষ্টের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে তা না দেখলে কেউ কল্পনাও করতে পারবেন না। ঈদের আনন্দ তাদের স্পর্শ করে না। তারপরও এতসব কষ্ট সহ্য করেও যানজটে অপেক্ষমাণ যাত্রীদের চোখে-মুখে জ্বলজ্বল করে ঈদের আনন্দ। কখন দেখা হবে স্বজনদের সঙ্গে। একেই বলে নাড়ির টান। ঈদে যখন আমাদের বাড়ি যেতেই হবে- তাই আমাদেরই স্বার্থে সবাইকে ঘটনা ঘটার আগেই সচেতন হতে হবে, ঘটার পরে নয়। দায়িত্ববান ব্যক্তিরা যখন দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হন, আইন করেও আইন প্রয়োগে ব্যর্থ হন, তখন আমাদেরই দায়িত্ববান এবং সচেতন হতে হবে।

বিশেষ করে যাতায়াতের সময় আমাদের আর একটু সাবধানি হতে হবে। কারণ ‘সাবধানের যেমন মার নেই, সাবধানির তেমন হার নেই।’ বাস-ট্রেনের ছাদে যেমন ওঠা যাবে না, তেমনি অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই লঞ্চে ওঠা থেকেও আমাদের বিরত থাকতে হবে, অন্যদেরও বিরত রাখতে হবে। কারণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে মানুষের জীবন। আর একটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক জীবন।

তাই কোনো কোনো মহলের অতি লাভ, অতি লোভ এবং সংশ্লিষ্ট মহলের উদাসীনতায় কোনো দুর্ঘটনা যেন কোনো ঈদেই বিষাদের ছায়া ফেলতে না পারে সেজন্য আমাদের সবাইকে আরো সচেতন হতে হবে। ঘরমুখো মানুষেরা নিরাপদে পৌঁছে যাক তাদের আপন আপন ঠিকানায়, আপনজনের কাছে। আবার ঈদ শেষে নিরাপদে ফিরে আসুক যার যার কর্মস্থলে। ঈদ হোক ভেদাভেদ ভোলা মিলনের আনন্দে মুখর। সবাইকে ঈদ মোবারক। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যেখানে সেখানে পশু কোরবানি না দেয়া, কোরবানির পর পশুর রক্ত, মলমূত্র পরিষ্কার করে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা যেন সে দায়িত্বটুকু নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করি। আমাদের একটু সুদৃষ্টি অসংখ্য অসহায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারে। তাই মুসলমানদের জীবনের ঈদের তাৎপর্য অনেক।

ঈদুল ফিতরের দিনে দান-খয়রাতের মাধ্যমে পবিত্র ঈদের উৎসবকে আনন্দে উদ্ভাসিত করে তোলা। কোরবানির মাধ্যমে ধনী ও গরিবের মধ্যকার ভেদাভেদ দূরীভ‚ত হয়। আর এতেই হয় মুসলিম হৃদয় উদ্বেলিত। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো নির্বিশেষে একই কাতারে মিলিত হওয়া মানবসম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন পবিত্র ঈদ। ঈদ আমাদের জন্য এক বিরাট নিয়ামত। কিন্তু আমরা এ দিনকে নিয়ামত হিসাবে গ্রহণ করি না। এ দিনে অনেক কাজ আছে যার মাধ্যমে আমরা আল্লাহতায়ালার নিকটবর্তী হতে পারি এবং ঈদ উদযাপনও একটি ইবাদতে পরিণত হতে পারে। ধনসম্পদের প্রাচুর্যে অপচয়ে মত্ত হয় এক স্তরের মানুষ এই ঈদকে কেন্দ্র করে। আর পাশের বাড়ির মানুষটি না খেয়ে থাকলেও খবর রাখে না কেউ। তাই বিভেদ ভুলে ঈদ হোক সমতার। পরিশেষে বলব, ঈদ হোক সম্প্রীতির এবং ভ্রাতৃত্বের।
- লেখক: কলামিস্ট

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...