ঈদ অর্থনীতি ও বাংলাদেশ


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১০ আগস্ট ২০১৯, ১৩:৪১,  আপডেট: ১০ আগস্ট ২০১৯, ১৩:৪৫

বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে ঈদ অর্থনীতির আকার প্রতি বছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঈদ অর্থনীতির আকার বৃদ্ধির মূল কারণ বাংলাদেশের জিডিপির হার বৃদ্ধি। এছাড়া মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষার হার বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নেও ঈদ অর্থনীতির আকার বাড়ছে। মূলত ধনী ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা ঈদ উৎসব অর্থনীতিতে এক বিশাল মাত্রা যোগ করে।

পাশাপাশি দরিদ্রশ্রেণিরাও এসময় তাদের স্বল্প সামর্থ্য থেকেই ঈদ অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখে। তাই এ দেশের অর্থনীতিতে একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে ঈদ উৎসব। মূলত রমজান ও কোরবানির ঈদই এ দেশের অর্থনীতিতে এক ভিন্ন মাত্রা এনে দেয়।

ঈদের আগেই রমজান ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পরে সর্বত্র, রমজানে পুরো মাসজুড়েই ইফতার-সেহরির বাজার, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজার ব্যস্ত সময় পার করে। এক্ষেত্রে বাড়তি চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীরা রোজা শুরুর তিন চার মাস আগে থেকেই পণ্য আমদানি শুরু করে দেয়। রমজান শুরু হওয়ার আগে থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যায়। দ্রব্যের বাজার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এ সময় ব্যবসায়ীরা দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি করার

পাশাপাশি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার টিসিবি থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য সরবরাহ করে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের আন্তঃমন্ত্রণালয় তথ্য অনুযায়ী, এ সময় যেসব পণ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ করে সেগুলো হলো- তেল, পেঁয়াজ, রসুন, মসুর ডাল, চিনি, আদা, কাঁচামরিচ, বেগুন, দেশি ফল, আলু, ডিম, আটা, ময়দা, ছোলা, মাছ ও মাংস।

প্রতিবছর দেশের সবচেয়ে বড় ইফতারির বাজার বসে ঢাকার চকবাজার ও বেইলি রোডে। এছাড়া দেশের আনাচে-কানাচে সর্বত্রই ছোট পরিসরে দোকানিরা ইফতারের পসরা সাজিয়ে বসে। দুপুর থেকেই এ আয়োজন শুরু হয়, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। তবে খাবারের দোকানগুলো দিনের বেলায় ব্যবসা কম করলেও সন্ধ্যার পর ভিড়ে সরগরম হয়ে ওঠে। এ সময় আশপাশের ছোট দোকানগুলো থেকে শুরু করে নামিদামি রেস্টুরেন্টগুলোতে ইফতারি ও সেহরির আয়োজন করা হয়।

ঈদের কেনাকাটা ঈদের খুশিকে দ্বিগুণ করে তোলে। সাত রোজার পর থেকেই জুতা আর পোশাকের দোকানিরা ব্যস্ত সময় পার করে, যা চলে চাঁদরাত পর্যন্ত। এ সময় বড়দের পোশাকের দাম হাতের নাগালে থাকলেও ছোটদের পোশাকের দাম থাকে আকাশছোঁয়া। পঁচিশ রোজার পর কসমেটিকস দোকানগুলোতে থাকে উপচেপড়া ভিড়।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের (২০১৮) সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, গত রোজার ঈদকে কেন্দ্র করে এ দেশের অর্থনীতিতে বাড়তি যুক্ত হয়েছিল দেড় লাখ কোটি টাকা।

রমজানের ঈদের দুই মাস যেতে না যেতেই ঘরে ঘরে কোরবানির ঈদের আমেজ শুরু হয়ে যায়। পশু কোরবানির মাধ্যমে লোভ, লালসা আর মনের পশুকে দূর করে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয় এ ঈদে। তাই কোরবানিকে ঘিরে চাঙ্গা হয়ে ওঠে এ দেশের অর্থনীতি। প্রতিবছরই আসন্ন কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে বছরের শুরুতেই গরুর খামারিরা গবাদি পশু মোটাতাজাকরণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। কোরবানির ঈদকে ঘিরে এ সময় গরু খামারগুলো ব্যস্ত সময় পার করে। গরু বিক্রির জন্য খামারিরা কোরবানি ঈদের ২০ দিন আগে থেকেই ছোট, বড় ও মাঝারি সাইজের গরুগুলো ভিন্ন ভিন্ন স্থানে রাখতে শুরু করে। কেননা, গরুর হাটের ঝক্কিঝামেলা এড়াতে আর ভালো মানের গরু পেতে অনেকেই খামারে এসে পছন্দমতো গরু বায়না করে রেখে যান।

এক্ষেত্রে, অবিক্রীত গরুগুলো খামারিরা গরুর হাটে তোলেন। গত বছর কোরবানির ঈদে কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি ছিল। সারা দেশে কোরবানিতে সাধারণত ১ কোটি ১০ লাখ পশুর চাহিদা থাকলেও ২০১৭ সালের কোরবানিতে জবাই হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ ২২ হাজার পশু। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে পবিত্র কোরবানির ঈদে কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ১৬ লাখ ২৭ হাজার পশু।

গত বছর কোরবানির ঈদে ১ কোটি ১৬ লাখ ২৭ হাজার দেশীয় পশুর পাশাপাশি ভারত ও মিয়ানমার থেকেও কোরবানির পশু আমদানি হওয়ায় পশুর দাম তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তাছাড়া বৃষ্টির কারণে দাম পড়ে যাওয়ায় খামারিরা চাঁদরাতের জন্য অপেক্ষা করেও কাক্সিক্ষত দামে গরু বিক্রি করতে না পারায় অনেক খামারিরই গরু অবিক্রীত ছিল।

প্রতি বছর ঈদুল আজহায় পশুর চামড়া কেনাবেচায় প্রচুর অর্থ লেনদেন হয়। বাংলাদেশে চামড়া শিল্পের বড় তিনটি সংগঠন হলো- ‘বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (বিএফএলএফইএ), ‘বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (বিটিএ) এবং ‘বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন’ (বিএইচএসএমএ)। এরাই মূলত চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও চামড়াজাত পণ্য উৎপাদন ও রফতানি করে আসছে। পাশাপাশি লাখ লাখ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এ সময় জড়িয়ে পড়েন চামড়া কেনায়।

এছাড়া ট্যানারি শিল্পের মালিক, মাদ্রাসা ও পাইকারী ব্যবসায়ীরা এই ঈদে পশুর চামড়া ক্রয় করেন। ফলে অভ্যন্তরীণ এই বাজার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে সংগৃহীত ৩১ কোটি ৫০ লাখ বর্গফুট পশুর চামড়ার মধ্যে ১৯ কোটি বর্গফুট চামড়াই পাওয়া গেছে কোরবানির মৌসুমে। গত বছর কোরবানির মৌসুমে প্রায় ২০ কোটি বর্গফুট চামড়া সংগ্রহ করা হয় যার ৩০ শতাংশ চামড়াই সংগ্রহ করে রাজধানীর লালবাগ পোস্তার চামড়া আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা। ২০১৮ সালে ট্যানারি মালিকরা অর্থ সংকটে থাকলেও পাচাররোধে বেঁধে দেয়া মূল্যেই চামড়া বেচাকেনা করেন। তবে কোথাও কোথাও নির্ধারিত দামের চেয়েও কম দামে চামড়া বেচাকেনা হয়েছে। চামড়ার এ ধরনের দরপতনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দাবি করেন ট্যানারি মালিকরা।

এবারের কোরবানির ঈদকে ঘিরেও প্রচুর গরু বেচাকেনা হবে। তাই চামড়াও প্রচুর সংগ্রহ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে কোরবানির সময় অসতর্কতা ও না জানার কারণে প্রায় ৩৩০ কোটি টাকার চামড়া নষ্ট হয়। তাই সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সঠিক পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২১ সাল নাগাদ চামড়া ও চামড়াজাতপণ্য রফতানি ৫ বিলিয়ন ডলার উন্নীত করা সম্ভব বলে মনে করেন চামড়া রফতানিকারক ও ট্যানারি মালিকরা।

কোরবানির ঈদ কাঁচা চামড়া সরবরাহের বড় উৎস। তাই চামড়া ব্যবসায়ীদের বিশেষ ঋণ দেয়ার উদ্যোগ থাকে সরকারি ব্যাংকগুলোর। তবে চামড়া খাতে দেয়া ঋণ সহজে আদায় হয় না বলে বেসরকারি ব্যাংকগুলো এই ঋণ প্রদানে তেমন আগ্রহী হয় না। সর্বশেষ ২০১৮ সালে চামড়াখাতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। তাই গত বছর নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেছে এমন প্রতিষ্ঠানকেই ঋণ প্রদান করা হয়েছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলো তাই গত ঈদে ঋণ দেয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল ৬৯১ কোটি টাকা।

দুই ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্নভাবে দেশে টাকার প্রবাহ বাড়ে। ঈদ অর্থনীতিতে যেসব খাত থেকে অর্থের জোগান হয় সেগুলো হলো-সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস, প্রবাসী বাংলাদেশীদের পাঠানো রেমিট্যান্স, মানুষের জমানো আয় বা সঞ্চয়, রাজনৈতিক নেতাদের দান অনুদান, ঈদ বখশিশ, সরকারি দান অনুদান, জাকাত-ফিতরা, ব্যাংক ঋণ, পণ্যের বিক্রীত অর্থ ইত্যাদি। ফলে এ সময় ঈদ উপলক্ষে বাড়তি টাকার কারণে দেখা দেয় মূল্যস্ফীতি।

আমাদের দেশে ট্রেন, বাস, লঞ্চ সর্বোপরি যাত্রাপথে দুর্ঘটনার হার অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। মানুষের জীবন ও চলাচল নিরাপদ করতে তাই সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও নীতিমালার পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ প্রয়োজন। উন্নয়নশীল দেশে ‘জনসম্পদই’ দেশের উন্নয়নের চাবিকাঠি। তাই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে আরও ত্বরান্বিত করতে যাত্রীবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে এদেশের ঈদ অর্থনীতির আকার আরও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি এদেশকে মধ্যম আয়ের একটি দেশে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। লেখক: অর্থনীতি বিষয়ক লেখক

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads





Loading...