বন্যা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের দিকে দৃষ্টি দিন


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৪:২৬,  আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০১৯, ১৪:৪২

দেশের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করার আগেই পানি নামতে শুরু করেছে। এটা সবার জন্যই স্বস্তির খবর। এমন স্বস্তির খবরের আড়ালে রয়েছে, কিছু অস্বস্তিকর খবরও। যা বন্যার পরে সবসময়ই স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়। দুঃখের বিষয়, স্বল্পস্থায়ী আবার কোথাও দীর্ঘস্থায়ী এ বন্যায়ও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম।

তলিয়ে গিয়েছিল স্বল্প আয়ের মানুষের বসতভিটা। এছাড়া পানিতে তলিয়ে হাজার হাজার একর ফসলেরও ক্ষতি হয়েছে। তবে এত সব ক্ষতির মাঝে আরো একটি ক্ষতি অনেকের চোখের আড়ালে রয়ে যায়। বন্যায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, যা অনেকটা নীরবে। দুঃখের বিষয় যা সবসময় আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়।

দেশের যেসব এলাকা বন্যাকবলিত হয়েছিল, সেসব এলাকায় বাধ্য হয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বন্ধ রাখতে হয়। এতে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে অনুপস্থিত থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ব্যাহত হয় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম। বন্যার কারণে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠিত পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। বাস্তবতা হলো, প্রাকৃতিক বিপর্যয় হলে আমাদের নীরবে মেনে নেয়া ছাড়া কিছুই করার থাকে না।

আরো বাস্তবতা হলো, যেসব অঞ্চলে বন্যার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, সেসব এলাকায় শিক্ষা বিভাগে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে নিঃসন্দেহে। তবে প্রভাবটা যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়, এর উদ্যোগও নিতে হবে এখনই। বন্যার সময় দেশের অধিকাংশ জায়গায় স্কুল-কলেজগুলোকে আশ্রয় কেন্দ্র বানানো হয়। এক সঙ্গে অনেক মানুষ গাদাগাদি করে থাকার কারণে ব্যাপক ক্ষতিও হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর।

এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। চলমান বন্যায় বিভিন্ন জেলায় প্রায় দুই হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা আক্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন তথ্য অবশ্য আমাদের দেশে নতুন নয়। বন্যার সময় এমন ক্ষতি স্বাভাবিক। অর্থের অঙ্কে এবারের ক্ষতির পরিমাণটাও অবশ্য অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি। বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমন তথ্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) মাঠপর্যায়ের শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী। এখনো যেহেতু বন্যা পরিস্থিতির পুরোপরি উন্নতি হয়নি তাই বন্যায় ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

মূলত বন্যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমি, অবকাঠামো, আসবাবপত্র ও অন্য শিক্ষা উপকরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এসবই হিসেবের খাতায় নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করা হয়। স্বাভাবিকভাবে এবারের বন্যায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্রও খোলা হয়েছিল। এক সঙ্গে অনেক মানুষ বসবাস করায় আশ্রয় কেন্দ্রগুলোরও ক্ষতি হয় এ সময়। বন্যার পানি যেহেতু পুরোপুরি এখনো নেমে যায়নি তাই বন্যা-পরবর্তীতে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা এখনো সেই অর্থে সম্ভব হয়নি। তবে বন্যা-পরবর্তী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ করা। অবশ্য সবার আগে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে কাজ করতে হবে।

তবে আশার কথা হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে বন্যায় শিক্ষার ক্ষতি পোষাতে করণীয় ঠিক করতে কী করা যায় তা নিয়ে আলোচনা করেছে। এখন বন্যার পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে দ্রুত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি পোষানো যায় সেসব বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়। তবে মন্ত্রণালয়ে বসে শুধু বৈঠক করে নিজেদের কাজ শেষ ভাবলে হবে না। যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে সেসব বিষয় যেন সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয় সে দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। এর জন্য আলাদা মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। যাদের কাজ হবে এসব বিষয় তদারকি করা। এর জন্য জেলা প্রশাসন ও জেলা শিক্ষা অফিসকে বিশেষ দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। অবশ্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা কাজ করছেন।

এখন বন্যা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত মেরামতের ব্যবস্থা করা প্রধান কাজ। এর জন্য সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে সরকারকে। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও বাড়িয়ে দিতে হবে সাহায্যের হাত। এছাড়া, এখনই যেসব বিষয়ের দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনোযোগ বাড়াতে হবে সেসব বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা যাক। বন্যা-পরবর্তীতে প্রথম বা প্রধান কাজ হলো ক্লাস পরীক্ষার ক্ষতি পোষাতে সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করে ক্লাস-পরীক্ষা নেয়া। এতে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের উপর যাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে এর জন্য তাদের বিশেষভাবে বোঝাতে হবে।

শিক্ষার্থীদের হোমওয়ার্ক বাড়িয়ে দেয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের সঙ্গেও অতিরিক্ত মতবিনিয়ম করা প্রয়োজন। অভিভাবকরা যেন বাড়িতে নিজ সন্তানদের প্রতি আরো মনোযোগী হন এবং তারা যেন এসব বিষয়ে সচেষ্ট থাকেন। ক্লাস রুমে শিক্ষার্থীদের নিজ উদ্যোগে ওয়ার্কশিট ও হ্যান্ড আউট সংগ্রহ করতে শিক্ষকদের উৎসাহিত করতে হবে। বন্যায় অনেক শিক্ষার্থীর বই পানিতে নষ্ট হয়েছে। তাদের হাতে সময়মতো বই তুলে দিতে হবে। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে শিক্ষকদের আন্তরিকতা সবচেয়ে বেশি জরুরি।

কারণ, শ্রেণিকক্ষে থাকবেন তারা আর কয়েকদিন পর পবিত্র ঈদুল আজহার ছুটিতে বেশ কয়েকদিন স্কুল, কলেজ বন্ধ থাকবে। অনাকাক্সিক্ষত বন্যার বন্ধের সঙ্গে ঈদের বন্ধ মিলিয়ে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনুপস্থিত শিক্ষার্থীরা। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি বিষয়ে তাই অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ভাবতে হবে। সিলেবাস যাতে সম্পন্ন করা যায় সেই বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।

এখন সমাজের বিত্তশালী থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্তরের মানুষ বানভাসিদের সাহায্য করছেন। এই সাহায্যের তালিকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ বিতরণ যুক্ত করা যেতে পারে। কেননা, বন্যার পর বানভাসিরা তাদের সন্তানদের লেখাপড়ায় খুব একটা মনোযোগী হবেন না। তাদের মূল ভাবনা থাকবে, সন্তানদের বিভিন্ন কাজে লাগানো। অনেকে তাদের পড়ালেখা চালানোর জন্য নতুন করে শিক্ষাসামগ্রী কিনে দেয়ার ক্ষেত্রেও আগ্রহী হবে না। এক্ষেত্রে, খাদ্য-বস্ত্রের পাশাপাশি বানভাসি হতদরিদ্র মানুষের সন্তানদের শিক্ষাসামগ্রী তুলে দেয়া যেতে পারে। এটা অবশ্য সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে বিত্তশালীরা যদি শিক্ষাসামগ্রী বিতরণের উদ্যোগ নেন সেটা হবে শিক্ষার্থীদের জন্য মঙ্গলজনক। - লেখক: সাংবাদিক

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads





Loading...