ইংরেজিতে অদক্ষতা ও কর্মসংস্থান


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১১ জুলাই ২০১৯, ১৩:২৮,  আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৯, ১৩:৩২

বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি না জানলে পদে পদে বিপদ। এ বিপদের কোনো জাতভেদ নেই শ্রেণিবৈষম্যও নেই। নেই স্থান-কাল-পাত্র বিবেচনাবোধ। যে কোনো মানুষ যে কোনো সময়ে এমন ধরনের বিপদে পড়তে পারেন গ্লোবালাইজেশনের যুগে। যেমন পড়েছিলেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী। এ ধরনের বিপদের অনেক কল্প-গল্প বাজারে প্রচলিত আছে। আমরা জানি জাপানিরা ভালো ইংরেজি বলতে পারে না। তারা তাদের মাতৃভাষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইউশিরো মোরি রাষ্ট্রীয় সফরে আমেরিকায় গিয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল আপনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে বলবেন How are you ? ইত্যাদি ইত্যাদি। যখন দুই নেতা মুখোমুখি হলেন তখন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ভুল করে বললেন Who are you? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন রসিকতা করে জবাব দিলেন I am the husband of Hillary জাপানের প্রধানমন্ত্রী উত্তরে বললেন I am also অর্থাৎ আমিও তাই।

আমাদের চেয়ে ভালো ইংরেজি জানে ভারতীয়রা। কিন্তু বিপদ সে দেশেও হয়। শুধু ইংরেজি না বোঝায় এক রাত জেল খাটতে হয়েছে এমন উদাহরণ সম্ভবত পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। কিন্তু সেই নজির গড়েছে ভারতের বিহারের পুলিশ। ইংরেজিতে লেখা আদালতের নির্দেশের ব্যাখ্যা ভুল বুঝে ব্যবসায়ীকে হাজতে পুরে দিয়েছে। ডিসট্রেস ওয়ারেন্টকে পুলিশ ভেবেছে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট (সম্পত্তির হিসাব করার নির্দেশকে ডিসট্রেস ওয়ারেন্ট বলা হয়)। ভারতের লালু প্রসাদ যাদবের ঘটনাটি বেশ ইন্টারেস্টিং। লালু প্রসাদ যাদব বিহারের এক সময়কার মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আকাশপথে কোথাও যাচ্ছিলেন। বিমানবালা খাবারের সময় তার কাছে এসে স্মিত হেসে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসা করলেন, স্যার আপনি কি ভেজিটেরিয়ান? জবাবে লালু বললেন, না না আমি পার্লামেন্টারিয়ান। লালু সাহেবের ইংরেজি জ্ঞান কতটুকু বিমানবালার বুঝতে বাকি রইল না। তাই এবার বাংলায় জানতে চাইলেন, আসলে আমি জানতে চাচ্ছি স্যার, আপনি মাংসাহারি নাকি শাকাহারি? এবার লালুপ্রসাদ বিরক্তির সুরে জবাব দিলেন, আরে ভাই আমি বিহারী।’

আমাদের দেশের নাগরিকরা ভালো ইংরেজি বলতে পারেন না। এ বিষয়টি নিয়ে অনেকেরই দুঃখ ছিল। হয়তো এখনো আছে। ঢাকার মিরপুরে আশির দশকের একজন আলোচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। বিদেশ সফর করে দেশে ফিরলেন। ফেরার পর সাংবাদিকরা সেই এমপিকে জিজ্ঞাসা করলেন, বিদেশের কোন বিষয়টি আপনার দৃষ্টি কেড়েছে। জবাবে তিনি বলেছিলেন, আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা বিএ, এমএ পাস করেও ইংরেজি বলতে পারে না অথচ দেখুন বিদেশের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও কত সুন্দর ইংরেজিতে কথা বলতে পারে।

ঢাকার কাওরান বাজার থেকে সম্প্রচারিত একটি জনপ্রিয় প্রাইভেট স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে দীর্ঘদিন ধরে ‘ফ্রাংকলি স্পিকিং’ নামে একটি টকশো প্রচার হয়। এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার কর্তা-ব্যক্তিদের অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আলাপচারিতা হয় ইংরেজি ভাষাতে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকা লিখেছে, ‘ফ্রাংকলি স্পিকিং’ স্পোকেন ইংরেজি শেখার অনুষ্ঠান। ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র ভুল ইংরেজিতে এসএমএস পাঠিয়েছে তার শিক্ষককে। শিক্ষক ভুল ইংরেজির এসএমএস দেখে শুদ্ধ করে ছাত্রকে সেই এসএমএসটা আবার পাঠিয়েছেন। ছাত্র ফোন করে শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করেছে, স্যার আমার এসএমএসটা আবার আমাকেই পাঠালেন কেন? ২০১৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় ৪০ হাজার ৫৬৫ পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র দু’জন ইংরেজি বিভাগে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করে। ২০১৬ সালে গ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় ৯০ ভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করেছে ইংরেজিতে।

এসব ঘটনা থেকেই আমাদের ইংরেজির করুণ অবস্থা বোঝা যায়। সে অবস্থার যে খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে তা বলা যাবে না। অবস্থার সুযোগ নিতেই রাস্তায় নেমে পড়েছেন অনেকে ইংরেজির পসরা নিয়ে। অলিতে-গলিতে গড়ে উঠেছে ইংরেজি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। তারা চ্যালেঞ্জ দিয়ে ইংরেজি শেখাচ্ছে। তাদের আছে অভিনব সব জাদুকরী পদ্ধতি। ইংরেজির ব্যবসায়ীরা ভেজা পটোলের মতো ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এদের কাছে ইংরেজি শিখে বা না শিখে আমরা অনেকেই ভুলভাল ইংরেজিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদেশিদের সঙ্গে হরহামেশাই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ করছি। গুগল ট্রান্সলেশনের সাহায্য নিয়ে বাংলা থেকে কিম্ভূতকিমাকার মার্কা ইংরেজি করছি। বিদেশি ভাষা ইংরেজি ভুল লিখলাম নাকি সঠিক লিখলাম তা যাচাই করে দেখাটাও জরুরি মনে করছি না।

ইংরেজরা সভ্য জাতি হিসেবেই পরিচিত। আমাদের ভুলভাল ইংরেজি নিয়ে তারা কখনো মুখের ওপরে কোনো কট‚ কথা বলেনি বরং আমাদের ইংরেজি শিখতে উৎসাহিত করেছে। ব্রিটিশ কাউন্সিলসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের শাখা খুলেছে কিন্তু ইদানীং বিদেশিদের কেউ কেউ আমাদের দেশের ভুল ইংরেজি নিয়ে কথা বলছেন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায়। অতি সাধারণ ভুল দেখে তারা বিস্ময় প্রকাশ করছেন। প্রযুক্তির কল্যাণে ইংরেজি শেখা আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। তবুও আমরা যেন সেই একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি।

দেশে শতাধিক প্রাইভেট ও অর্ধশতাধিক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ আছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একাধিক কলেজ আছে। সাতশর অধিক কলেজে ইংরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স পড়া যায়। এ সব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী ইরেজিতে অনার্স ও মাস্টার্স পাস করে বের হচ্ছেন। তারা কেমন মানের ইংরেজি শিখে পাস করে বের হলেন। আমরা কি কখনো তা পরখ করে দেখেছি? নাকি দেখার প্রয়োজনবোধ করেছি। এ দায়িত্ব কার? বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের? বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নাকি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের- তা আমরা কেউ জানি না। ইংরেজির অবস্থা যে এলেবেলে তা দেখারও কেউ নেই। সেটা বোঝার ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছি। ফলে বাড়ছে সর্বত্র ইংরেজির সঙ্কট।

বৃহৎ পরিসরে ইংরেজিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে না ওঠায় সংকুচিত হচ্ছে কর্মক্ষেত্র। বাড়ছে কম ইংরেজি জানা শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। চাকরির ইন্টারভিউতে সাধারণ মানের ইংরেজি প্রশ্নের উত্তর দিতে পারছে না অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি, ফ্রিল্যান্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, কোনো ক্ষেত্রেই আসছে না কাক্সিক্ষত সাফল্য। আন্তর্জাতিক চাকরির বাজারেও সুযোগ পাচ্ছেন না তারা। বছরে ৫ লাখ তরুণ-তরুণী উচ্চশিক্ষা শেষ করলেও ইংরেজি দক্ষতার অভাবে কর্মক্ষেত্রে প্রতিক‚লতার মুখোমুখি হচ্ছেন। ইংরেজি দক্ষতার অভাবে আমরা আন্তর্জাতিক দেন-দরবারেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এত প্রতিক‚লতার পরও ইংরেজি ভাষাকে আমরা এখনো ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ হিসেবেই শিখছি। ‘সেকেন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ’ ঘোষণা করতে পারলাম না আজও। - লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

মানবকাণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...