ওয়ান স্টপ মোহাম্মদপুর!


poisha bazar

  • মাসুদ কামাল হিন্দোল
  • ১৫ মে ২০১৯, ১৬:০১

ঢাকা শহরের এমন একটি এলাকায় আমি বেড়ে উঠেছি যেখানে একজন মানুষের জীবন ধারণের জন্য যা কিছু প্রয়োজন তার প্রায় সবই আছে। অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত। কোনো নবদম্পতি যদি মনে করেন তাদের সন্তান জন্ম দানের জন্য হাসপাতালে যেতে হবে। তাদের জন্য রয়েছে আওরঙ্গজেব রোডে মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সার্ভিসেস সেন্টার। শিশুটি যখন বড় হবে তাকে স্কুলে ভর্তি করতে হবে। সেটা নিয়ে মাথাব্যথার কোনো কারণ নেই। সেন্ট জোসেফ, রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের মতো ভালো মানের বাংলা মিডিয়াম যেমন আছে তেমনি আছে গ্রীন হেরাল্ডের পাশাপাশি একাধিক ইংলিশ মিডিয়াম ও ইংলিশ ভার্সন।

আছে ইংলিশ মিডিয়াম সাধারণ ও কওমি মাদ্রাসাও। মহিলা কলেজসহ একাধিক কলেজ। কয়েকটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল কলেজ। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাইভেট হোস্টেল। একাধিক ইংরেজি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ধর্মীয় শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা, মক্তব। এতিমখানা মাজার। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য ৩টি মন্দির ও অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য উপাসনালয়।

সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য রয়েছে একাধিক খেলার মাঠ। মাঠের অভাবে গৃহবন্দি থাকতে হয় না শিশু-কিশোরদের। মোহাম্মদপুরে এখনো আছে সবুজের ছোঁয়া। মিনি স্টেডিয়াম (শহীদ পার্ক মাঠ)। আছে ৩টি পার্ক ও সরকারি-বেসরকারি জিমনেসিয়াম। শারীরিক শিক্ষা কলেজ। জ্ঞান বিকাশের জন্য পাঠাগার। ৩টি আর্ট গ্যালারি। একাধিক কমিউনিটি সেন্টার বিনোদনের জন্য সিনেপ্লেক্স ও সিনেমা হল। সাপ্তাহিক, দৈনিক সংবাদপত্রও প্রকাশিত হয়।

জরুরি প্রয়োজনে ওয়াসার পানির সুবিধা। ফায়ার সার্ভিস স্টেশন। আছে মোহাম্মদপুর থানা ও র‌্যাবের কার্যালয়। আসাদ গেটে হার্টিকালচার সেন্টার। যেখান থেকে এলাকাবাসী সহজেই গাছের চারা সংগ্রহ করতে পারেন। মূল পোস্টঅফিসের পাশাপাশি সাব পোস্টঅফিস। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পুনর্বাসন কেন্দ্র । বিআরটিসি বাস ডিপো ছাড়াও বেশ কয়েকটি প্রাইভেট বাস সার্ভিস। রাস্তাগুলো বেশ চওড়া। অলিগলিতেও আছে বাঁধানো ফুটপাত। নিরাপত্তা গেট ও প্রহরী। সব ধরনের চিকিৎসা সেবাও নাগালের ভেতরে। রয়েছে কবরস্থানও।

আবাসিক এলাকা হিসেবে অনেকে এখনো মোহাম্মদপুরকে আদর্শ মনে করেন। এখানে তিন শ্রেণির অপূর্ব সহাবস্থানের পাশাপাশি রয়েছে উর্দুভাষী বিহারীরা। বিহারিদের ৪টি ক্যাম্প। মোহাম্মদপুরের কৃষি মার্কেটকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক শ্রেণি বৈষম্য ও মতভেদ থাকলেও মানুষের উৎফুল্লতা সত্যিই দেখার মতো। মোহাম্মদপুরের তারুণ্য বেড়ে উঠছে উৎসবমুখর সৃষ্টিশীল পরিবেশে। একবার যারা মোহাম্মদপুরে থেকে গেছেন বার বার ফিরে আসেন তারা।

জেনেভা ক্যাম্প খুবই ঘিঞ্জি ও ঘনবসতিপূর্ণ। আধিকাংশ ঘরই ১২ ফুট বাই ১৪ ফুট। অনেক আবার দোতলা-তিন তলা। ক্ষুদ্র শিল্পের কাজে বিহারিদের দক্ষতা ঢাকা শহরে সুপরিচিত। বাঙালিদের সঙ্গে কেউ কেউ আত্মীয়তার বন্ধনে জড়িয়েছে। উর্দুভাষীদের সস্তা শ্রম মোহাম্মদপুরের ব্যবসা বাণিজ্য ও জীবনযাত্রাকে সহজ করেছে অনেকাংশে। বাঙালি অনেকের কাছেই উর্দু ভাষা সহজবোধ্য। ১৯৮৬ সালে জার্মান নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক গুন্টারগ্রাস বাংলাদেশ সফর করেন। সে সময় তিনি জেনেভা ক্যাম্প পরিদর্শনে এসেছিলেন এবং বলেছিলেন, জেনেভা ক্যাম্পের জীবনগাথা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের নোবেল জয়ী সাহিত্য রচনা করা সম্ভব।

জেনেভা ক্যাম্পের মোস্তাকিমের কাবাবের পাশাপাশি আছে একাধিক কাবাব ঘর। সলিমুল্লাহ রোডের সেলিম কাবাব ঘর, জাকির হোসেন রোডের মানজারের কাবাব। কাবারের পাশাপাশি গড়ে উঠেছে আধুনিক সব রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁগুলো মুখোরোচক খাবার ও অঙ্গসজ্জায় বৈচিত্র্যপূর্ণ। হাল আমলের বিখ্যাত কেক-পেস্ট্রি ফাস্টফুড, ব্র্যান্ড ফাস্টফুড চেইন ফাস্টফুডের শাখা আছে। ঐতিহ্যবাহী হাজীর বিরিয়ানি চাইনিজ রেস্টুরেন্টও । গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আছে ‘হক ব্রেড অ্যান্ড ফুড প্লাজার’ দোকান। ছোট বড় ফ্যাশন হাউজসহ নানা ধরনের ক্ষুদ্র -মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। এছাড়াও রয়েছে একাধিক গার্মেন্টস ও এনজিওসহ নানা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

আশির দশকে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগসহ বিভিন্ন লীগে মোহাম্মদপুরের খেলোয়াড়দের আধিপত্য ছিল। সাব্বির, আয়াজ, জিয়া বাবু, ফয়েজ বাবুদের নাম ছিল সবার মুখে মুখে। একইভাবে ক্রিকেটের কথাও বলা যেতে পারে। তামিম, লিপু প্রিন্সরা উঠে এসেছেন মোহাম্মদপুর থেকে। বাংলাদেশে ব্যান্ডসংগীতের উত্থান কমলাপুর-মালিবাগ-গোপীবাগে হলেও এর বিকাশ ঘটেছে মোহাম্মদপুরে। আশি-নব্বই দশকে মোহাম্মদপুরের অধিকাংশ পরিবারের একজন না একজন সদস্য ব্যান্ডসংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাজমহল রোডের রাস্তায় অসংখ্যা কনসার্ট হয়েছে।

বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা সাংবাদিক এখানে ছিলেন এবং এখনো আছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের মিডিয়াতে কর্মরত (প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, রেডিও ও অনলাইন) ও মিডিয়া সংশ্লিষ্ট যত ব্যক্তি মোহাম্মদপুরে থাকেন অন্য কোনো এলাকাতে এত সংবাদকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায় না। শিল্প-সাহিত্য-সংগীতসহ ভিন্ন ভিন্ন ধারার নান্দনিক সৃজনশীল মানুষের অভাব নেই। অলিতে গলিতে ছড়িয়ে রয়েছে প্রতিভা। এতসব প্রতিভার ঐক্যতানে মোহাম্মদপুর হয়ে উঠেছে অনন্য।

মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন এলাকা ও রাস্তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সব ঐতিহাসিক নাম। বাবর রোড. হুমায়ুন রোড, শাহজাহান রোড, তাজমহল রোড, নূরজাহান রোড, আওরঙ্গজেব রোড, শেরশাহসূরী রোড, খিলজি রোড, রাজিয়া সুলতানা রোড ইত্যাদি। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের স্মরণে মোগাম্মদপুরের আইয়ুব গেটের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় আসাদগেট। প্রাচীন ঐতিহ্যেও পিছিয়ে নেই মোহাম্মদপুর। প্রায় ৪০০ বছরের পুরনো সাত গুম্বুজ মসজিদ মোহাম্মপুর এলাকাতেই। ১৬৮০ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। নবাব শায়েস্তা খাঁর পুত্র উমিদ খাঁ এর নির্মাতা। এই মসজিদে ৩টি বড় গম্বুজ এবং প্রতিটি কোণায় একটি করে ছোট গম্বুজ রয়েছে। আর এই গম্বুজের জন্যই এর নাম সাত গম্বুজ মসজিদ।

এক সময় সাত মসজিদের পাশেই ছিল নৌঘাট। পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছিল বুড়িগঙ্গা নদী। এখানে পালতোলা বড় বড় নৌকা-লঞ্চ ভিড়ত। সাত মসজিদ থেকে কিছুদূর এগিয়ে গেলে বাঁশবাড়ি, কাটাসুর, জাফরাবাদ, রায়ের বাজার সুলতানগঞ্জ। ঢাকের বাদ্যি শঙ্খের আওয়াজ শোনা যেত এসব এলাকায়। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক মানুষ এখানে থাকেন। প্রায় ৩০০ পাল পরিবার ছিল। এখন পালদের ৩০ টির মতো পরিবার আছে। হাতে গোনা কয়েকজন এখনো মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। বেড়িবাঁধের (ঢাকা শহর রক্ষা বাঁধ) পাশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সহযোগী আলশামস বুদ্ধিজীবীসহ বহু মানুষকে রায়েরবাজারে হত্যা করে।

রূপ বদলালেও মোহাম্মদপুরের জৌলুস কমেনি। শুরুতে মোহাম্মদপুর একটি আদর্শ আবাসিক এলাকা হিসেবে গড়ে উঠলেও এর বাণিজ্যিক সামাজিক ও রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। নানা ধরনের আধুনিক নাগরিক সুযোগ সুবিধা নাগালের মধ্যে থাকায় মোহাম্মদপুরের জনসংখ্যাও বাড়ছে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে মোহাম্মদপুর যেন ঢাকা শহরের একটি ছোট সংস্করণে পরিণত হতে চলেছে। সামরিক বাহিনী টাকশাল ছাড়া প্রায় সবই রয়েছে এই এলাকার ভেতরে। অনেকটা করপোরেট যুগের ওয়ান স্টপ মলের সঙ্গে তুলনা করা যায়। নিজেদের প্রয়োজন আমরা নিজেরাই মেটাতে পারি। একজীবনে মোহাম্মদপুরের বাইরে না গেলেও আমাদের চলবে।
- লেখক: সাংবাদিক ও রম্যলেখক

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads




Loading...