পরিকল্পনাহীন লক্ষ্য একটি ইচ্ছা মাত্র

সাজ্জাক হোসেন শিহাব

মানবকণ্ঠ
সাজ্জাক হোসেন শিহাব - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ৩০ জুন ২০২০, ১১:৩৬,  আপডেট: ৩০ জুন ২০২০, ১১:৪২

আমরা কী চাই, আর আমরা আসলে সেটির জন্য যোগ্য হয়ে উঠেছি কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আমরা প্রায় সেটাকে একপাশে ফেলে রেখে সামনে এগোতে চাই। আর এ কারণেই বারবার আমরা হোঁচট খাই। কিন্তু আমদের এই কথাটা মেনে নিতেই হবে। আপনি যেটা করেন সেটাকে ভালোবাসেন, যেটা ভালোবাসেন সেটাই করেন। তাহলে দেখবেন জীবনের লক্ষ্যের সাথে আপনার পেশার লক্ষ্য মিলে যাবে। আর তখনই জীবনে সুখ আসবে। আপনার নিজের সাথে দ্ব›দ্ব মিটে যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হলো নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। আপনার মস্তিষ্কের সাথে আপনার মনের যুদ্ধের অবসান করুন। তাহলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে

আপনার মনে আছে নিশ্চয়, ছোটবেলায় একটা সাধারণ প্রশ্ন ছিল যা প্রায় আমাদেরকে বড়রা জিজ্ঞেস করতেন। তোমার জীবনের লক্ষ্য কী? আমরা কেউ কেউ বলতাম, সরকারি আমলা হব, কেউ কেউ বলতাম প্রকৌশলী, ডাক্তার, পুলিশ হব। একেকজনের উত্তর ছিল একেক রকম। আবার আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই উত্তরটা সময়ের ব্যবধানে বদলে ফেলতাম। কারণ, আমাদের আসলে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বড়রা কখনো প্রশ্ন করতেন না, কিভাবে তুমি প্রকৌশলী হবে। তোমার পরিকল্পনা কী? সব সময় আমরা বড় একটা কিছুর কথা বলতাম। একটা স্বপ্নের কথা বলতাম। বড়রা সেটা শুনে বেজায় খুশি হতো। কিন্তু স্বপ্ন নিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। আর এ কারণেই হয়তো ফ্রান্সের লেখক এন্টোইন ডি সেন্ট-এক্সপেরি বলেছেন-পরিকল্পনাহীন লক্ষ্য একটি ইচ্ছা মাত্র। আমরা ছোটবেলায় শুধু একটা ইচ্ছার কথা বলতাম। আমাদের অনেকেরই কোনো পরিকল্পনা ছিল না।

আবার যাদের পরিকল্পনা ছিল, তাদের সেই স্বপ্নপথে হুট করে বাস্তবতার থাবা এসে হানা দিত। স্বপ্নকে বদলে ফেলতে চাইত। আমাদের রঙিন স্বপ্নকে ফ্যাকাশে করে দিত। কেউ কেউ স্বপ্ন দেখা ভুলে যেত। এখনো যায়। এতকিছুর পরও কিন্তু নিজের স্বপ্ন বলার সময় আমরা সবাই বড় বড় কথা বলি। কারণ, স্বপ্ন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। আমাদের এমন সব স্বপ্নের কথা শুনে সবাই মুগ্ধ হতো। সাহস দিত। কিন্তু খেয়াল করে দেখছেন কী, ঐটা আপনার জীবনের লক্ষ্য ছিল না। ঐটা ছিল মূলত আপনার ক্যারিয়ার ভাবনা। আপনার জীবনের লক্ষ্য হলো আরো ভিন্ন কিছু, যা আপনাকে মানসিক শান্তি দেয়। আপনাকে মানুষ হিসেবে বাঁচিয়ে রাখে। ক্যারিয়ারের মধ্য দিয়েও মানুষ সমাজে বেঁচে থাকে। কিন্তু আমরা অনেকেই সেভাবে ভাবি না। মূলত আমরা আমাদের ক্যারিয়ারের লক্ষ্যকে একভাবে দেখি। আর জীবনের লক্ষ্যকে দেখি অন্যভাবে। মাঝেমাঝে দুটোকে এক করে ফেলি।

আমাদের অনেকেই পেশাগত জীবনকে, একসময় সবকিছু মনে করে। আমরা কী চাই, আর আমরা আসলে সেটির জন্য যোগ্য হয়ে উঠেছি কিনা, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আমরা প্রায় সেটাকে একপাশে ফেলে রেখে সামনে এগোতে চাই। আর এ কারণেই বারবার আমরা হোঁচট খাই। কিন্তু আমদের এই কথাটা মেনে নিতেই হবে। আপনি যেটা করেন সেটাকে ভালোবাসেন, যেটা ভালোবাসেন সেটাই করেন। তাহলে দেখবেন জীবনের লক্ষ্যের সাথে আপনার পেশার লক্ষ্য মিলে যাবে। আর তখনই জীবনে সুখ আসবে। আপনার নিজের সাথে দ্ব›দ্ব মিটে যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হলো নিজের সাথে নিজের যুদ্ধ। আপনার মস্তিষ্কের সাথে আপনার মনের যুদ্ধের অবসান করুন। তাহলে অনেক কিছু সহজ হয়ে যাবে। যদিও আপনি সুখী হবেন কিনা তা নির্ভর করবে অনেক বিষয়ের ওপর। সুখী হবার জন্য এটি একটি কারণ হতে পারে।

আমরা একেকজন একেক রকম। একই জিনিস একেকজন একেকভাবে দেখি। ভাবি। কী আজব ব্যাপার, তাই না! আপনি ভাবছেন, আপনার চিন্তাই ঠিক। আদোতে সেটা ঠিক নয়। কিন্তু আপনি সেটা মানতে নারাজ। এটাকে মাইন্ডসেট বলে। নিজের বৃত্ত থেকে বাইরে আসুন। এরপর ভাবতে থাকুন। পরিকল্পনা করুন। পৃথিবীতে সবার জীবনের পরিকল্পনা এক রকম হবে না। যে রকম আমরা একইভাবে বেড়ে উঠি না। আমরা একেক ভাবনার, একেক পরিবেশের মাঝে বড় হই। এ কারণে আমাদের একেকজন একেক রকম। যেমনটি একেক কাজের ক্ষেত্রে আমরা একেক ধরনের ভাবনা ভাবি। এমনকি বিষয়টা একই হলেও স্থান, কাল, পাত্রভেদে পরিকল্পনা ভিন্ন হতে পারে। ধরুন, আমেরিকার একজনের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হলো। আপনি যে বিষয়ে পড়েন, উনিও সেই বিষয়েই পড়েন। ভাবুন, এবার কথার ছলে নিজেকে তার সাথে তুলনা করছেন। আপনি দেখছেন, ও অবারিত সম্পদের ভেতর দিয়ে বড় হচ্ছে। তার পরিকল্পনা ভিন্ন। আপনি যদি ভাবেন, আপনার পরিকল্পনা তার সঙ্গে মিলিয়ে করতে হবে তাহলে ভুল হবে। তার এবং আপনার লক্ষ্য এক হতে পারে। কিন্তু সবসময় যে পরিকল্পনা একই হতে হবে, একইভাবে সাফল্য আনতে হবে, তার কোনো মানে নেই। কিন্তু আপনাকে সফল হতে আপনি ভালো জানেন আপনার বাধা কী, শক্তি কী। আপনার সামনে কী ধরনের সুবিধা আছে। আর কী ধরনের হুমকি আছে। সবকিছু মাথায় নিয়ে একটা দারুণ পরিকল্পনা করে ফেলুন। নিজের ইচ্ছাকে লক্ষ্যে পরিণত করতে হলে আপনার প্রথম প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা।

কী ভাবছেন? পরিকল্পনা তো হলো, কিভাবে এই চ্যালেঞ্জগুলো জয় করবেন, তাই তো? আপনাকে জয়ী হতে হলে প্রথমে ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। গাছের শিকড় গভীরে না থাকলে, সে গাছ ঝড়ে পড়ে যায়। গাছের শিকড় এমনি এমনি গভীরে যায় না। চারা কোথায় লাগানো হলো, তার নিয়মিত পরিচর্যা হচ্ছে কিনা, এসবে খেয়াল রাখতে হবে। সবকিছু কী আজব, তাই না! সামনে না তাকিয়ে বর্তমান আর পেছনকে ফিরে দেখছি আমরা। হ্যাঁ, আগামীর জন্য আপনাকে এসব নিয়েই কাজ করতে হবে। আমাদের লক্ষ্যটা এবার শিকড়ের দিকে দিতে হবে।

আলবার্ট আইনস্টাইন হয়তো এ কারণেই বলে গেছেন- ট্রাই নট টু বিকাম আ ম্যান অফ সাকসেস বাট রাদার টু বিকাম আ ম্যান অফ ভ্যালু। আপনি যদি আপনার নিজেকে অনন্য করে তোলেন, তাহলে সাফল্য আসবেই। সাফল্যের গল্প আসে দারুণ সব কাজ থাকে। দারুণ কাজ আসে অনুশীলন, পরিকল্পনা আর সঠিক সময়ে সঠিকভাবে কাজ সম্পাদন থেকে। অনুশীলন ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় একশ পঞ্চাশ কিলোমিটার বেগের বলকে যদি মোকাবিলা করার জন্য আপনাকে ক্রিকেট মাঠে নামানো হয়, আপনি আহত হবেন। ভয় পাবেন। বারবার পরাস্ত হবেন, এটা নিশ্চিত।

তাই বলে কি আপনি ভাগ্যকে দুষবেন? নিশ্চয় না। আপনি সরাসরি যুদ্ধে যেতে পারেন না। তাই আপনার নিজের দিকে নজর দিতে হবে। নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। আপনার উসাইন বোল্টের কথা মনে আছে। জ্যামাইকান অ্যাথলেট উসাইন বোল্টের কথা বলছি। বছরের পর বছর তিনি অনুশীলন করে গেছেন মাত্র কয়েক সেকেন্ডের একটা রেকর্ডের জন্য। কারণ, তিনি জানতেন, তার একেক সেকেন্ডের দাম কোটি কোটি টাকা। কয়েক সেকেন্ডের জন্য প্রায় দেড় যুগ অনুশীলন করেছেন উসাইন বোল্ট। উসাইন বোল্টের মতে- স্বপ্ন দেখতে টাকা লাগে না। কিন্তু লক্ষ্য অর্জনের জন্য মূল্য দিতে হয়। আপনি বিনামূল্যে দিবাস্বপ্ন দেখতে পারেন, কিন্তু ত্যাগ ছাড়া লক্ষ্য অর্জিত হবে না। সময়, প্রচেষ্টা, ত্যাগ এবং ঘাম। আপনি কিভাবে আপনার লক্ষ্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করবেন?

লেখক-সাজ্জাক হোসেন শিহাব : কবি ও লেখক, প্রতিষ্ঠাতা ও কো-অরডিনেটর, সাসটেইনেবল ফিউচার লিডারস

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...