মামা-ভাগনের হাতে হেফাজত


poisha bazar

  • শাহীন করিম ও ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১১:০০,  আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২১, ১১:১৪

প্রতিষ্ঠাতা আমির মাওলানা আহমেদ শফীর মৃত্যুর পর গেল বছরের মধ্য নভেম্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নতুন কমিটির কর্তৃত্ব নেন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও মামুনুল হকরা। নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন দাবি করলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও ধর্মের নামে নানা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়েন সংগঠনটির কট্টরপন্থি নেতা-কর্মীরা। তাদের অপকর্মে প্রশ্নবিদ্ধ ও কোণঠাসা হয়ে পড়ে সংগঠনটির নেতৃত্ব।

নাশকতায় জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেফতারের পর রিমান্ডে রয়েছেন কেন্দ্রীয় অনেক নেতা। অন্যদের মধ্যে পড়েছে পদত্যাগের হিড়িক। এমন পরিস্থিতিতে মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় গত রবিবার রাতে ঘোষণা আসে হেফাজতের কমিটি বিলুপ্তির। পূর্ণাঙ্গ কমিটি বিলুপ্তের তিন ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যরাতে আহ্বায়ক কমিটি গঠনের ঘোষণা আসে। এভাবে হেফাজতে ইসলামের কমিটি গঠন নিয়ে শেষ হচ্ছে না নাটকীয়তা। দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

৫ সদস্যের এই আহ্বায়ক কমিটির চারজনই আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। আহ্বায়ক জুনায়েদ বাবুনগরী ও প্রধান উপদেষ্টা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী সম্পর্কে মামা-ভাগনে ও ‘কট্টরপন্থি’ হিসেবে পরিচিত। অনেকের মন্তব্য, সরকারের কঠোর অবস্থানে পিঠ বাঁচাতে এটি হেফাজতের নতুন নাটক। বাবুনগরী ও মামুনুল হকদের ‘নতুন লেবাসেই’ তা প্রকাশ পেয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সহিংসতার পর মামলার জালে আটকা পড়া হেফাজতের নেতারা গ্রেফতার এড়াতে ও গণপদত্যাগ থেকে সংগঠনকে রক্ষা করতে কৌশলগত কারণে কমিটির বিলুপ্তির নাটক সাজানো হয়েছে। কমিটির বিলুপ্ত হলেও রাজনীতি ও ধর্মের নামে তাদের তাণ্ডব বন্ধ হবে কিনা সেটিও প্রশ্ন। কারণ ২০১৩ সালে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নানা ইতিবাচক মুচলেখা দিলেও পরবর্তীতে সুযোগ বুঝে ভিন্ন রূপ প্রকাশ করে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের সঙ্গে সমঝোতা চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে নতুন নাটক সাজিয়েছে কট্টরপন্থি হেফাজত নেতারা। এই কট্টরপন্থিরাই চলমান সাঁড়াশি অভিযানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। যদিও রবিবার রাতে হেফাজতে ইসলামের আমির মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ভিডিও বার্তায় বলেন, ‘দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অরাজনৈতিক সংগঠন এবং দ্বীনি সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটিকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সদস্যের পরামর্শক্রমে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলো’।

অপর একটি সূত্র মতে, নতুন এই নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে রোজার পর নতুন কমিটি গঠন করতে যাচ্ছেন আল্লামা শফির অনুসারীরা। প্রয়াত আমির আহমেদ শফীর ছেলে ও তার অনুসারীদের নিয়ে নতুন পাল্টা কমিটি গঠন হতে পারে। এরা আগ থেকেই বর্তমান নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে আসছিল।

ওদিকে হেফাজতের এই কমিটি বিলুপ্ত করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের চাপ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর আল্লামা আহমদ শফীকে সংগঠনের পদ ছাড়ার পাশাপাশি চরম অপমানের মধ্য দিয়ে হাটহাজারী মাদ্রাসা ছাড়তে বাধ্য করেন জুনায়েদ বাবুনগরীর অনুসারীরা। এরপর তড়িঘড়ি করে বিশেষ সম্মেলনের মাধ্যমে হেফাজতের কর্তৃত্ব নেন জুনায়েদ বাবুনগরী ও মামুনুল হক।

রবিবার রাতজুড়েই ছিল বহুল আলোচিত হেফাজতে ইসলামের কমিটি গঠন নিয়ে চরম নাটকীয়তা। দিনভর পুলিশ কর্ডনে থাকার পর রাত সোয়া ১১টায় হঠাৎ করে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বর্তমান কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণা দেন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী। সাম্প্রতিক কয়েকটি ইস্যুতে ব্যাপক সহিংসতার প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পর এমন ঘোষণা আসে। কিন্তু তার দুই ঘণ্টা পর আবারো তিন সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। ভোর ৩টার দিকে আহ্বায়ক কমিটিতে আরো দুজন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, ৫ সদস্যের এই আহ্বায়ক কমিটির চারজনই আমির জুনায়েদ বাবুনগরীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়।

অভিযোগ উঠেছে, সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা আহমদ শফীর হত্যা ও সাম্প্রতিক সময়ে নাশকতার মামলায় গ্রেফতার এড়াতেই জুনায়েদ বাবুনগরী কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। এ নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চাপ ছিল বলে অভিযোগ উঠে। তবে তা অস্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজি আনোয়ার হোসেন।

অন্যদিকে সম্প্রতি হেফাজতের নেতাদের গ্রেফতার অভিযানের মুখে সংগঠনটির পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা চালানোর চেষ্টা হচ্ছিল। সংগঠনটির অনেক নেতাই এই সমঝোতার চেষ্টার কথা গত কয়েকদিন নানাভাবে তুলে ধরেছেন। এখন অনেকটা আকস্মিকভাবেই সংগঠনের আমির কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়, গত ২৬ মার্চ থেকে তিন দিন ধরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রামের হাটহাজারী ও ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংস বিক্ষোভ হয়- যাতে অন্তত ১৭ জন মারা যায়। এই সহিংসতার ঘটনাগুলো নিয়ে প্রায় একশটির বেশি মামলা হয়েছে, যাতে হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতাসহ অনেক নেতা-কর্মীকে অভিযুক্ত করে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

‘কট্টরপন্থি’ মামা-ভাগনের হাতেই নেতৃত্ব: শেষপর্যন্ত সেই বাবুনগরী মামা-ভাগনে জুটির হাতেই রয়ে গেছে সংগঠনটির নেতৃত্ব। বিলুপ্ত কমিটির আমির জুনায়েদ বাবুনগরীই আবার আহ্বায়ক। আবার সদ্য সাবেক সিনিয়র নায়েবে আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীই প্রধান উপদেষ্টা। দুজনের বাড়িই ফটিকছড়ির বাবুনগর গ্রামে। দুজনের পদবিই বাবুনগরী। সম্পর্কেও তারা মামা-ভাগনে।

জুনায়েদ বাবুনগরী ও মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী ‘চরম কট্টরপন্থি’ হিসেবে পরিচিত। রবিবার দিবাগত গভীর রাতে তড়িঘড়ি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে এবং তাতে ঘুরেফিরে সংগঠনটির আহ্বায়ক ও প্রধান উপদেষ্টা পদ ধরে রেখে কার্যত সংগঠনের কর্তৃত্বই ধরে রেখেছেন। এ নিয়েও নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

জানা গেছে, জুনায়েদ বাবুনগরী সামনে থাকলেও হেফাজতে মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীরও প্রভাব কম নয়। আহমদ শফীর পর বয়সসহ বিভিন্ন কারণে কওমি ঘরানার আলেমরা মুরুব্বি মানেন প্রভাবশালী এই হেফাজত নেতাকেই। তাকে সম্মান ও সমীহ করার পাশাপাশি তার নির্দেশনা-পরামর্শকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে নেন নেতা-কর্মীরা। অশীতিপর হলেও সংগঠনে তার বেশ দাপট।

পেছনে থেকে সংগঠনে কলকাঠি নেড়ে থাকেন ‘চরম কট্টর’ এ নেতা! ভেঙে দেয়া কমিটির মহাসচিব মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদিকে আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সচিব করা হয়েছে। এছাড়া কমিটির সদস্য করা হয়েছে- সালাহউদ্দীন নানুপুরী ও অধ্যক্ষ মিজানুর রহমানকে। এরমধ্যে নুরুল ইসলাম ঢাকার এবং সালাহউদ্দীন গাজীপুরের। কমিটি ভেঙে এভাবে নেতৃত্ব ধরে রাখাকে জাতি তথা আলেম-ওলামাদের সঙ্গে ধোঁকা দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রয়াত আহমদ শফীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত মঈনুদ্দিন রুহী।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ১৫ নভেম্বর জুনায়েদ বাবুনগরীকে আমির ও নূর হোসাইন কাসেমীকে মহাসচিব করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করে হেফাজতে ইসলাম। ওই বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আল্লামা আহমদ শফীর ইন্তেকালের কারণে নতুন এ কমিটি করেছিল হেফাজত। এরপর ওই বছরের ১৩ ডিসেম্বর মহাসচিব নূর হোসাইন কাসেমী মারা গেলে নায়েবে আমির মাওলানা নুরুল ইসলাম জিহাদীকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দিয়েছিল হেফাজত।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ আগমনের বিরোধিতা করে দেয়া হেফাজতের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গত মার্চের ২৫, ২৬ ও ২৭ তারিখ দেশজুড়ে যে সহিংস ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৭ জন মানুষের প্রাণহানি হয়। পরে গত ১১ এপ্রিল থেকে বিভিন্ন মামলায় হেফাজতের নেতাদের গ্রেফতার শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রবিবার পর্যন্ত হেফাজতের কেন্দ্রীয় অন্তত ১৬ জন নেতা ও সারাদেশে অন্তত দুই শতাধিক নেতা, কর্মী ও সমর্থক গ্রেফতার হয়েছে। হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম-সচিব মাওলানা মামুনুল হক টানা দুই মামলায় পুলিশি রিমান্ডে রয়েছেন। কথিত দ্বিতীয় স্ত্রীসহ সোনারগাঁ রয়েল রিসোর্টে ধরা পড়েন তিনি। এরপর বেরিয়ে আসে মামুনুলের ব্যক্তিগত জীবনের নানা অপকর্ম।

এদিকে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যে মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী ও নুরুল ইসলাম জিহাদীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম থেকে ইতোমধ্যে কয়েকজন দায়িত্বশীল আলেম পদত্যাগ করেছেন। এই পদত্যাগের তালিকা আরো দীর্ঘ হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তা সামনে আসবে। নাশকতার পেছনে জড়িত না থাকা ও বিচারের দাবিতে অন্তত এক ডজন হেফাজত নেতা পদত্যাগ করবেন।

পদত্যাগের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে হেফাজতের এই নেতারা জানান, গত মার্চে ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফরিদপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, কিশোরগঞ্জের যেসব এলাকায় সহিংস ঘটনা ঘটেছে, এসব ঘটনার সঙ্গে তাদের সংযুক্ততা নেই। বিশেষ করে মাওলানা বাবুনগরীর নেতৃত্বাধীন হেফাজতে ইসলাম কর্মসূচি পালনে হঠকারিতা প্রদর্শন করার কারণে তারা আর এই সংগঠনে থাকতে নিরুৎসাহিত বোধ করছেন। আর এ কারণেই হেফাজত ছেড়ে দেয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তারা। ইতোমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নানাভাবে তথ্যও পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন আগ্রহী নেতারা।

হেফাজতে ইসলাম থেকে পদত্যাগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে- এমন নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম (কাসেমী অংশ)-এর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা বাহাউদ্দিন জাকারিয়া, খেলাফত আন্দোলনের (একাংশ) নায়েবে আমির মাওলানা জাফরুল্লাহ খান, কেন্দ্রীয় সহকারী মহাসচিব জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের (মুফতি ওয়াক্কাছ অংশ) ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা মহিউদ্দিন ইকরাম, কেন্দ্রীয় সদস্য জমিয়তের (মুফতি ওয়াক্কাস অংশ) সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা শেখ মুজিবুর রহমান, কেন্দ্রীয় দাওয়াহ বিষয়ক সম্পাদক, জমিয়তের (কাসেমী) সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা নাজমুল হাসান।






ads
ads