দক্ষিণখানে দুই সন্তানসহ মাকে হত্যা, স্বামী রকিবকে ঘিরেই রহস্য

বাবা রাকিব উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তান।
বাবা রাকিব উদ্দিন ভূঁইয়ার সঙ্গে স্ত্রী ও দুই সন্তান। - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:৫১,  আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:৫৭

রাজধানীর দক্ষিণখানে প্রেমবাগান এলাকায় মা ও দুই সন্তানের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত গৃহবধূর স্বামী প্রকৌশলী রকিব উদ্দিন ভূঁইয়া ওরফে লিটনকে ঘিরেই রহস্য ঘনীভ‚ত হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে পলাতক এই স্বামীকে ঘিরেই প্রাথমিক তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। তাকে গ্রেফতার করতেই থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র‌্যাবের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে।

রকিবকে ধরতে পারলেই ত্রিপল মার্ডারের নেপথ্যে কাহিনী বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এদিকে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, গৃহবধূ মুন্নী বেগমের (৩৭) মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে হাতুড়ি জাতীয় কিছু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। আর ভিকটিমের ১২ বছর বয়সী ছেলে ফারহান উদ্দিন ও তিন বছরের কন্যা লাইভা ভূঁইয়াকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকদিন আগে তিনজনকে হত্যা করার কারণে দেহগুলোতে পচন ধরেছে।

অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. হাফিজুর রহমান জানান, গতকাল বিকেলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিহত তিনজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর সন্ধ্যার পর বনানী কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। এরপর রাতে ভিকটিম মুন্নী বেগমের ভাই মুন্না বাদী হয়ে দক্ষিণখান থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

শুক্রবার রাত আটটার দিকে দক্ষিণখানের ৮৩৮ নম্বর প্রেমবাগানের চতুর্থ তলার বাসা থেকে মা মুন্নী বেগম (৩৭) এবং তার দুই সন্তান ফারহান উদ্দিন (১২) ও লাইভা ভূঁইয়ার (৩) অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মা ও মেয়ের লাশ একটি কক্ষের বিছানায় এবং ছেলের লাশ আরেক কক্ষের মেঝেতে পড়ে ছিল। মায়ের মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি হাতুড়িও উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন লিমিটেডের (বিটিসিএল) উপসহকারী প্রকৌশলী রকিব উদ্দিন ভ‚ঁইয়া ওরফে লিটন প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ওই বাসায় স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বাস করে আসছিলেন। সম্প্রতি তিনি বিটিসিএলের গুলশান কার্যালয় থেকে উত্তরা কার্যালয়ে বদলি হন। দুই সন্তানসহ স্ত্রীর লাশ উদ্ধারের পর থেকেই পলাতক রয়েছেন।

তাই তাকে ঘিরেই সন্দেহ ও রহস্য ঘনীভ‚ত হচ্ছে। স্বামী রকিবকে ধরতে শনিবার থেকে চলছে সাঁড়াশি অভিযান। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে স্ত্রী ও দুই সন্তানের হত্যার রহস্য বের হবে মনে হচ্ছে। সর্বশেষ গত ২-৩ দিন ধরে প্রকৌশলী রকিবকে তার বাসায় ও এলাকায় দেখা যায়নি বলে প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন।

পারিবারিক তথ্যের বরাত দিয়ে পুলিশের অপর একটি সূত্র জানায়, মাস তিনেক আগে রকিব একবার অপহরণ হয়েছিলেন বলে বাসায় দাবি করছিলেন। কিন্তু বিষয়টি রহস্যজনক ছিল। কারা, কেন, কোথায় তাকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল তা পরিষ্কার করে কিছুই বলতে পারেননি তিনি। পুরো বিষয়টি নিয়ে গোলকধাঁধা রয়েছে।

জানা গেছে, নিহত গৃহবধূ মুন্নী বেগমের স্বামী রকিব উদ্দিনের পিতার নাম আশরাফ উদ্দিন ভ‚ঁইয়া। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের ভাতশালা এলাকায়। নিহত স্ত্রী মুন্নী রাকিবের খালাতো বোন ছিল। প্রায় এক যুগ আগে তারা প্রেম করে বিয়ে করেন। নিহত মুন্নী বেগমের ভাই সোহেল আহমেদ বলেন, গত বুধবার থেকে আমরা বোন ও বোনের স্বামীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ ছিল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কোথাও ঘুরতে গিয়েছে। শুক্রবার খোঁজ নিতে এসে লাশ পাই। আমার বোন ও বোনের স্বামীর সঙ্গে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিল বলেই জানতাম। আমরা এখনো বুঝতে পারছি না কারা এবং কেন তাদের হত্যা করল।

জানতে চাইলে উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল জানান, আমি মনে করছি, ভিকটিমের স্বামীকে খুঁজে পেলে ও তাকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য অন্য দিকগুলোও মাথায় রেখে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যেই তিন খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হবে। ডিসি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে তিনজনকেই ৩-৪ দিন আগে হত্যা করা হয়েছে। ঘরের ভেতরে তিনটি লাশই কিছুটা পচন অবস্থায় পাওয়া গেছে। তবে মা ও ছেলের শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

পুলিশের উত্তরা বিভাগের দক্ষিণখান জোনের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার হাফিজুর রহমান রিয়েল জানান, নিহত গৃহবধূর ভাই বাদী হয়ে দক্ষিণখান থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ওই নারীর স্বামী তথা দুই সন্তানের বাবার খোঁজ করা হচ্ছে। আমরা খুনিকে ধরতে অভিযান চালাচ্ছি।

মাথায় আঘাতে মাকে, শ্বাসরোধে দুই সন্তানকে হত্যা: রাজধানীর দক্ষিণখান থেকে উদ্ধার মা মুন্নী বেগম, দুই শিশু ফারহান ও লাইভার ময়নাতদন্ত গতকাল বিকেল ৪টার দিকে শেষ হয়। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক একে এম মাইনুদ্দিন।

তিনি বলেন, তিনটি মরদেহের উপরিভাগ বেশি পচনশীল ছিল। নারীটির মাথার পেছনে আঘাত আছে এবং শিশু দুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে এমন আলামত পাওয়া গেছে। মায়ের মাথার পেছনে যে আঘাত রয়েছে তা দেখে মনে হচ্ছে হাতুড়ি জাতীয় কিছু একটা দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়েছে।

এছাড়া তিন বছরের শিশু লাইভার গলায় আঙ্গুলের ছাপ পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাকে হত্যা করা হয়েছে গলাটিপে। আর ছেলে ফারহানকে গলায় জুতার ফিতা জাতীয় রশি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এরপর তিন মরদেহ থেকে ভিসেরা ও রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে। রিপোর্ট হাতে পেলে পুরো ঘটনা জানা যাবে।

 




Loading...
ads






Loading...