মিটারে চলে না সিএনজি অটোরিকশা


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০৫ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫৪

আব্দুল্লাহ রায়হান:

গুলশান ২ নম্বর থেকে শাহবাগ যাবেন বেসরকারি চাকরিজীবী রিফাত আরা। তিনি বলেন, চাকরির কারণে প্রতিদিন রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। বাসে অতিরিক্ত ভিড় থাকে আবার সিটিং সার্ভিসের জন্য অনেক বাসের গেট বন্ধ থাকে। ফলে প্রায় নিয়মিত সিএনজিতে যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু সবসময় কাক্সিক্ষত গন্তব্য অনুযায়ী চালকরা যেতে চান না। কোনো সিএনজি কখনই মিটারে যায় না। তারা অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করে সব সময়। যে গন্তব্যে যেতে মিটারে ভাড়া পড়বে ১৫০ টাকা সেই ভাড়া দিতে হয় ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। তারা যাত্রীদের জিম্মি করে ভাড়া আদায় করে। আমরা যাত্রীরা তাদের কাছে অসহায়। রাস্তায় কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশও কোনো ব্যবস্থা নেয় না। কোনো অভিযোগ করারও জায়গা নেই।

রাজধানীতে সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো  এখন আর মিটারে চলে না। অথচ যাত্রীর ইচ্ছামতো গন্তব্যে মিটার অনুযায়ী চলাচল করবে, এটাই আইন। কিন্তু গত দেড় যুগেও আইনটি বাস্তবায়ন করা যায়নি। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীতে মাত্র ২ শতাংশ অটোরিকশা মিটারে চলে। আর ৮৮ শতাংশ অটোরিকশা যাত্রীদের চাহিদামতো গন্তব্যে যেতে রাজি হয় না। অথচ বিদেশি সংস্থাগুলোর অ্যাপসনির্ভর যাত্রীসেবা চালুর প্রথম দিন থেকেই তাদের সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের বাহনই মিটার মেনে চলাচল করছে। সিএনজি অটোরিকশার এই নৈরাজ্য দমনে ট্রাফিক বিভাগের কোনো তৎপরতা নেই। দৃশ্যমান নয় বিআরটিএর কার্যক্রমও।

ঢাকা শহরে ২০০২ সালের দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল শুরু হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে প্রায় ১৩ হাজার অটোরিকশার নিবন্ধন দেয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। শুরুতে এই অটোরিকশাগুলোর আয়ুষ্কাল (ইকোনমিক লাইফ) ছিল ৯ বছর। কিন্তু মালিকপক্ষের দাবির মুখে এগুলোর মেয়াদ তিন দফা বাড়িয়ে ১৫ বছর করা হয়। যাত্রী ভাড়া পাঁচবার এবং জমা (ভাড়া হিসেবে চালকদের কাছ থেকে মালিকপক্ষ যে টাকা নেন) বাড়ানো হয় তিন দফা। এমন সুবিধা দেয়ার পরও অটোরিকশা খাতে নৈরাজ্যই বিরাজ করছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির এক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, রাজধানীতে চলাচলরত অটোরিকশার ৯৮ শতাংশই চুক্তিতে চলে। মিটারে চলাচলকারী অটোরিকশার ৯২ শতাংশ ২০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত মিটারের অতিরিক্ত ভাড়া বা বকশিশ দাবি করে। তবে বৃষ্টি বা সরকারি ছুটির আগের দিন অথবা গণপরিবহন সঙ্কটকালীন এই বকশিশের পরিমাণ ভাড়ার দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। যাত্রীদের পছন্দমতো গন্তব্যে যেতে রাজি হয় না ৮৮ শতাংশ অটোরিকশা।

২০১১ সালে সিএনজি অটোরিকশার সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া বাড়িয়ে ৭ টাকা ৬৪ পয়সা এবং বিরতিকালীন চার্জ ১ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ভাড়া ও জমা বাড়ানো হয়। ২০১৫ সালে সিএনজির জমা ৯০০ টাকা এবং যাত্রীদের জন্য প্রথম ২ কিলোমিটারের ভাড়া ৪০ টাকা, পরে প্রতি কিলোমিটার ১২ টাকা এবং বিরতিকালীন চার্জ প্রতি মিনিটে ২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কোনো সিএনজি চালক এই ভাড়া একদমই মানেন না। বরং তারা তাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করেন।

এ বিষয়ে সিএনজি চালক আতাউর বলেন, এটা ঠিক যে সিএনজি চালকরা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করে। কারণ আমাদের মিটারে চলাচল করলে লাভ থাকে না। এমনিতেই জমার টাকা বেশি। দোষ চালকদের হলেও আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার মালিকরা। তারা নির্ধারিত টাকার চেয়ে প্রতিদিন অতিরিক্ত জমার টাকা আদায় করছেন। আবার যানটি দুই বেলা দুই চালকের কাছে দিচ্ছেন। তাই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে হয়।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সিএনজির ক্ষেত্রে এখন সরকার নির্ধারিত জমা ৯০০ টাকা। কিন্তু মালিকরা আমাদের কাজ থেকে ১১০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করে।

বিষয়টি স্বীকার করে যাত্রাবাড়ীর সিএনজি অটোরিকশার একজন গ্যারেজ মালিক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, জমার টাকা একটু বেশি না নিলে চলে না। কারণ একটা সিএনজি রাস্তায় চালালে অনেক ধরনের খরচ আছে যা মালিকদেরই দিতে হয়। এ ছাড়া যেভাবে সবকিছুর দাম বাড়ছে তাতে করে জমার টাকা কিছুটা বেশি না নিলে তো আমরা টিকে থাকতে পারব না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, রাজধানীতে ২ শতাংশ সিএনজি অটোরিকশা বাধ্য হয়ে মিটারে চলে। যখন চালকরা দেখেন, মিটারে না চললে সমস্যা হতে পারে তখন তারা মিটারে যেতে রাজি হন। তিনি আরো বলেন, অটোরিকশার নৈরাজ্য বন্ধ করতে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ বা অন্য কোনো সংস্থার তৎপরতা চোখে পড়ছে না।  অটোরিকশা খাতকে এই নৈরাজ্য থেকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে সাত দফা সুপারিশ করেছে যাত্রীকল্যাণ সমিতি। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম উভয় মহানগরীতে ২০ হাজার করে ৪০ হাজার নতুন অটোরিকশা নামাতে হবে। গণমালিকানার পরিবর্তে কোম্পানিভিত্তিক অথবা অ্যাপসভিত্তিক অটোরিকশা পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে। মিটারবিহীন ও ‘প্রাইভেট’ অটোরিকশা চলাচল বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। জমা ও ভাড়া বৃদ্ধি, সিলিং নির্ধারণ, মনিটরিং কমিটিতে যাত্রী প্রতিনিধি রাখতে হবে।

নীতিমালা লঙ্ঘন করে চলাচলকারী অটোরিকশা এক বছর আটকে রাখার বিধান করতে হবে, আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মুনাফা সরকার কর্তৃক নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং নতুন অটোরিকশা নিবন্ধনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। এদিকে কোনো সিএনজি মিটারে না যেতে চাইলে কি করা যাবে এ প্রসঙ্গে বিআরটিএর উপপরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) আব্দুর রাজ্জাক জানান, মিটারে না যেতে চাইলে ওই সিএনজির রেজিস্ট্রেশন নাম্বার দিয়ে বিআরটিএ পরিচালক এনফোর্সমেন্টের দফতরে অভিযোগ জানাতে পারবেন। ফোন (অফিস) ৫৫০৪০৭১৪ ও ফ্যাক্স ৫৫০৪০৭১২। ইমেইল ফবহভÑনৎঃধ.মড়া.নফ । এ ছাড়া ৯৯৯ এ ফোন করে পুলিশের সহযোগিতাও নেয়া যাবে বলে জানান তিনি।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...