যানজট কমাতে প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ জরুরি


poisha bazar

  • হাসান মাহমুদ রিপন
  • ০৮ জুলাই ২০১৯, ১৭:০৯

রাজধানীতে যানজট নিরসনে রিকশা চলাচল বন্ধের পাশাপাশি প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পরিকল্পনাবিদরা। এ ছাড়া কোনোভাবেই নগরীর যানজট নিরসন অসম্ভব বলে মনে করেন তারা।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ৩ বছর আগে ঢাকায় গাড়ির গতি ঘণ্টায় ৭ কিলোমিটার ছিল। বর্তমানে ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারে এসে পৌঁছেছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০২৭ সালে গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১ কিলোমিটার হবে।

‘কত সংখ্যক যাত্রীকে পরিবহনের জন্য কতটুকু জায়গা কোনো বাহনের জন্য থাকল, এমন দীর্ঘ পরিসরের হিসাবটা মেলানো হয় না বলে প্রতিনিয়তই নগরীতে বেড়ে চলেছে ব্যক্তিগত গাড়ি, আর বাড়ছে যানজট।’ এমন মন্তব্য ঢাকা আইডিয়াল কলেজের অধ্যক্ষ এসএম মান্নান মনিরের। নিজের গাড়ি কেনার সামর্থ্য থাকলেও গণপরিবহনে চলাচল করেন তিনি।

এসএম মান্নান মনির বলেন, ‘প্রাইভেট কারের লাগাম টেনে না ধরলে নগরবাসীকে নগর ছেড়ে পালাতে হবে। অনেক বাড়িতে তিনজন সদস্য অথচ প্রাইভেটকারও তিনটি। সে জন্য আমরা সাধারণ যাত্রীরা ঢাকায় যানজটে পড়ে থাকি। প্রাইভেটকারের ওপর কর আরো বাড়াতে হবে। কর দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ করতে হবে। একটা প্রাইভেটকার থাকার পর কেউ যেন দ্বিতীয় প্রাইভেটকার না কিনতে পারে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। নগরীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাচ্চারা যেন প্রাইভেটকারে না আসে এ বিষয়েও খেয়াল রাখতে হবে। সরকারের উচিত প্রতিটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণপরিবহন দেয়া।’ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সূত্র বলছে, রাজধানীতে জনসংখ্যার অনুপাতে সড়ক হিসেবে ভ‚মির পরিমাণ অপ্রতুল। ব্যক্তিগত গাড়ি ও রিকশা ঢাকা শহরের বেশিরভাগ সড়ক দখল করে আছে।

সাধারণত একটা বড় বাস ১৭টি এবং একটা ডাবল ডেকার বাস ২৫টি প্রাইভেট কারের সমান যাত্রী পরিবহন করতে পারে। অথচ ঢাকা শহরে সড়কের ৪০ শতাংশ জায়গাই প্রাইভেট কারের দখলে। পক্ষান্তরে গণপরিবহন চলছে মাত্র ৬ শতাংশ জায়গা নিয়ে। ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) খন্দকার রাকিবুর রহমান বলেন, ‘রাজধানীর বেশিরভাগ মানুষই বাসে চলাচল করলেও নগরীর অধিকাংশ রাস্তাই প্রাইভেট কারের দখলে থাকে। ১০ শতাংশ প্রাইভেটকারের যাত্রীদের কারণে আমরা ৯০ শতাংশ মানুষ দুর্ভোগে। প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণে না আনলে ঢাকার যানজট কমবে না।’ রাকিবুর রহমানের মতে, ‘নগরীতে বসবাসরত বিশাল জনগোষ্ঠীর চলাচলের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক বাসেরও অভাব রয়েছে। যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবের কথা বলে সম্প্রতি কিছু বিআরটিসি বাস আমদানি করলেও তা আবার বিভিন্ন অফিস-প্রতিষ্ঠানে ভাড়া দেয়া হয়েছে। আবার যেসব বাস চালু রয়েছে তাও জরাজীর্ণ, মানসম্মত নয়। ঢাকার রাস্তায় প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ অথবা রিকশামুক্ত করা ছাড়া যাতায়াতে স্বাচ্ছন্দ্য আনা সহজ নয়।’

সড়কে রিকশা বন্ধের সিদ্ধান্তের বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যানজট নিরসনে প্রধান সড়কে রিকশা চলাচল বন্ধের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু স্বল্প দূরত্বে রিকশায় চলাচল করে যাত্রীদের বড় একটি অংশ, তাই পর্যাপ্ত গণপরিবহনের ব্যবস্থা করতে পারলেই এই উদ্যোগ সার্থক হবে। তা না হলে ব্যাপক বিড়ম্বনায় পড়বেন স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতকারী যাত্রীরা। রিকশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নগরীর যানজটের অন্যতম কারণ প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণেও সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
অপরদিকে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শুধু ঢাকায় নিবন্ধিত প্রাইভেটকারের সংখ্যা ৪ লাখ। দেশের অনেক প্রাইভেট গাড়িও ঢাকায় চলাচল করে, সে হিসাবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বাড়বে।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রাইভেটকারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটা নিয়ন্ত্রণে একটা আইন আছে। এই আইনটা বাস্তবায়ন করতে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রাইভেট গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করে নগরীর মানুষকে গণপরিবহনে চড়ার এবং তাদের মধ্যে হাঁটার অভ্যাস গড়তে আমরা পদক্ষেপ নেব।’

রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে দফায় দফায় নানা ধরনের সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ নেয়ার পরও কোনো সুফল পায়নি উদ্যোগী সংস্থা। জনগণের ভাগ্যেও জোটেনি যানজটমুক্ত রাজধানী দেখার সুযোগ। সকল আবেদন-নিবেদন, আয়োজন আর উদ্যোগ বিফলে যাওয়ার পর এখন আবার নেয়া হয়েছে নতুন উদ্যোগ। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে রাজধানীর চলমান উন্নয়ন কাজ দ্রæত শেষ করার পাশাপাশি রিক্সা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া রাস্তার লেন মার্কিংসহ ফুটপাত দখলমুক্ত করার চেষ্টা হচ্ছে। বর্তমানের উদ্যোগের আওতায় চলমান উন্নয়নকাজ দ্রæত শেষ হলে সহনীয় পর্যায়ে আসবে নগরীর যানজট এমন আশা করা হচ্ছে। জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশে প্রাইভেট কার, জিপ ও মাইক্রোবাস এই তিন ধরনের ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৮ হাজার ৪৯৫। ২০১৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এ গাড়ির সংখ্যা ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৫৫টি। তার মানে সাড়ে পাঁচ বছরে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৬০টি। বর্তমানে এর সংখ্যা আরো অনেক বেশি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান থেকে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। বিআরটিএ ২০ ধরনের যানবাহনের হিসাব সংরক্ষণ করে। এর মধ্যে কার, জিপ (স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল-এসইউভি) ও মাইক্রোবাসকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের গাড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া বাস-ট্রাকসহ অন্য যানবাহনগুলো বাণিজ্যিক যানের আওতাভুক্ত। এদিকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য মতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথমার্ধে ১১ হাজার ৪৭৩টি রিকন্ডিশন গাড়ি আমদানি হয়েছে। যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ হাজার ৭৭৮টি বেশি। এসবের অধিকাংশই জাপান থেকে আমদানি করা হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে ৭ হাজার ৬৯৮ ইউনিট গাড়ি আমদানি হয়েছিল। ২০১৫-১৬তে ৮ হাজার ৪৬০ ইউনিট গাড়ি, ২০১৪-১৫তে ৭ হাজার ২২১ ইউনিট এবং ২০১৩-১৪তে ৭ হাজার ৯৩৯ ইউনিট গাড়ি আমদানি হয়েছে। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও গাড়ি ব্যবসায়ীরা দাবি করেন, নিবন্ধন নেয়া ব্যক্তিগত গাড়ির মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই রিকন্ডিশন্ড বা পুরোনো (জাপানে একবার ব্যবহৃত)।

তবে বিআরটিএর কর্মকর্তারা মনে করেন, এই সংখ্যা ৭৫ শতাংশ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বাস্তবতায় সড়ক গতিশীল ও যানজটমুক্ত করতে গণপরিবহন সহজলভ্য করে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তবে আশার কথা হলো, যানজটের অন্যতম কারণ প্রাইভেট কারের দাপট নিয়ন্ত্রণে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্র বলছে, প্রাইভেটকার কেনায় নিরুৎসাহী করতে সামনের ডিসেম্বরে ৬০০ বাস নামবে নগরীতে।

ক্রয়-প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। আগে থেকে চলছে মেট্রোরেল ও বিআরটি লাইন-০৩ (গাজীপুর-এয়ারপোর্ট) নির্মাণের কাজও। তা ছাড়া প্রাইভেটকার ব্যবহার সামলাতে মানুষকে সচেতন করতে সরকার আরো কাজ করবে বলে জানা গেছে।

মানবকণ্ঠ/এএম




Loading...
ads




Loading...