থমথমে ইডেন কলেজ

রিভা-রাজিয়ার ‘বড় ভাই’ কারা

সংঘর্ষের পরপর বিনা তদন্তে বহিষ্কার


  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৬:০২

হলের সিটবাণিজ্য ও চাঁদাবাজিসহ অসংখ্য অভিযোগ এবং এ নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের দুপক্ষের দফায় দফায় সংঘর্ষের পর সেখানে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। প্রতিপক্ষ গ্রুপ ও ভুক্তভোগী সাধারণ ছাত্রীদের হাতে গণপিটুনি খেয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা ক্যাম্পাস ছাড়া হওয়ার পর রবিবার রাতে কমিটি স্থগিত করে সংগঠন থেকে উল্টো প্রতিবাদকারী ১৬ জনকে স্থায়ী বহিষ্কার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর প্রতিবাদে গতকাল সোমবার দুপুরে ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে একঘন্টা অনশন পালন করার পর সিনিয়র নেতাদের আশ্বাসে কর্মসূচি থেকে সড়ে আসেন বহিস্কৃত নেত্রীরা। তারা বলেছেন, ‘আমাদের অপরাধ আমরা আমাদের নির্যাতিত সহযোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়েছি। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে এত বিস্তর অভিযোগ থাকা সত্তে¡ও তাদের কেন বহিষ্কার করা হলো না?’ বিনা তদন্তে বহিষ্কার, নেপথ্যে কারা'?”

ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও অভিযোগ, ক্ষমতা পেয়ে মাত্র পাঁচ মাসে ইডেন কলেজকে অনেকটা যেন মগের মুল্লুক বানিয়ে ফেলেছেন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা ও সহযোগীরা। সিটবাণিজ্য, চাঁদাবাজি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, সুন্দরী মেয়েদের দিয়ে খারাপ কাজ করানোর কুস্তাব দেয়াসহ নানা অপকর্মে জড়িয়েও কতিপয় দলীয় ‘বড় ভাইয়ের’ পৃষ্ঠপোষকতায় এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন দাপুটে এই বিতর্কিত নেত্রী।

ইডেন কলেজ সূত্র জানায়, সম্মেলনের প্রায় তিন বছর পর গত ১ মে রিভাকে সভাপতি এবং রাজিয়া সাধারণ সম্পাদক করে ইডেন ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি গঠন করা হয়। সভাপতি হওয়ার পর থেকেই বেপরোয়া হয়ে ওঠেন রিভা। ছাত্রীদের পাঁচটি হলের সিটবানিজ্য, ক্যান্টিনে ও ফুটপাতে চাদাবাজিসহ বিভিন্নখাত থেকে তিনি মাসে অন্তত পাঁচ লাখ আয় করেন টাকা বলে অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার দাপটে রিভা লিপটে একা চড়েন, অন্য কাউকে উঠতে দেয়া হয় না। এছাড়া বিনা কারণে ছাত্রীদের মারধর ও ব্যক্তিগত কাজে সাধারণ ছাত্রীদের লাগানোসহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কমিটি ঘোষণার পরেই রিভার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছিল ছাত্রলীগের একাংশ। যদিও কলেজ কর্তৃপক্ষের দাবি, হল কর্তৃপক্ষ সিট বরাদ্দ দেয়ায় সিটবানিজ্যে করে অর্থ আয়ের সুযোগ নেই। কমিটি মেনে নিতে না পারায় এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে দাবি অভিযুক্ত নেত্রীদের।

সাধারণ শিক্ষার্থীরা বলছেন, গত ২০ আগষ্ট রুপা ও মিথিলা নামে দুই ছাত্রীকে কলেজ শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভার অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের অডিও ভাইরাল হয়। এতে শোনা যায়, ‘এক পায়ে পাড়া দিমু, আরেক পায়ে টাইনা ছিঁড়ে ফেলব’। পরের দিন ক্ষমা প্রার্থনা করলেও গত সপ্তাহে তুচ্ছ কারণে এক ছাত্রীর শরীরে গরম চা ঢেলে দেন রিভা। এভাবে ঘটনা তার ও গ্র’পের সদস্যদের নিত্যদিনের। এসব ঘটনার পর বিতর্কিত এই নেত্রীকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করলে সবশেষ সংগঠনের ঘটনায় ছাত্রলীগ প্রশ্নবিদ্ধ হতো না। বিশেষ করে শনিবার রাতে সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসকে আটকে রেখে মারধরের ঘটনায় সংগঠন ও ইডেন কলেজ প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে শক্ত পদক্ষেপ নিলেও রবিবারে ছাত্রলীগের দুপক্ষের ফের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটত না। রিভা-রাজিয়া গ্র’পের সদস্যদের

অত্যাচার-নির্যাতনের প্রতিবাদে একাট্ট্রা হয় ছাত্রলীগের দলের একাংশ ও সাধারণ ছাত্রীরা।
‘ইডেন ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদক বহিষ্কার নয় কেন?’ দুই পক্ষের হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনায় রবিবার রাতে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের কমিটি স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠন থেকে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে ১৬ জনকে। এরপ্রতিবাদে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সহসভাপতি সুস্মিতা বাড়ৈ বলেন, রাতের আঁধারে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ যে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, এটির প্রতিবাদেই আমাদের এই সংবাদ সম্মেলন। আমাদের সংবাদ সম্মেলনের শিরোনাম, ‘বিনা তদন্তে বহিষ্কার, নেপথ্যে কারা'?” তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে বহিষ্কারে আমাদের হƒদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। আমাদের কোন অন্যায়ের কারণে স্থায়ী বহিষ্কার করা হয়েছে? আমাদের অপরাধ আমরা আমাদের নির্যাতিত সহযোদ্ধার পাশে দাঁড়িয়েছি। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে এত বিস্তর অভিযোগ থাকা সত্তে¡ও তাদের কেন বহিষ্কার করা হলো না?’

কলেজ ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার বৈশাখি বলেন, ‘তদন্ত কমিটিতে থাকা বেনজির হোসেন নিশি তারই সহযোদ্ধা রোকেয়া হল ছাত্রলীগের সাবেক এজিএস ফাল্গুনী দাস তন্বীকে মারধরের ঘটনায় হওয়া মামলার আসামি। সেই মামলা এখনও চলমান। অথচ তাকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। আর তাকেই পাঠানো হয়েছে আমাদের ঘটনার তদন্ত করতে!’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের ভাষ্য মতে, ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি হয়েছে, কিন্তু কোন কারণে শুধু একটি গ্রæপকে গণহারে বহিষ্কার করা হয়েছে, সে ব্যাপারে সুষ্ঠু জবাব দিতে হবে।’ বহিষ্কারের ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হয়নি অভিযোগ করে বৈশাখি বলেন, ‘বিভিন্ন ইউনিটে কোনো সমস্যা হলে সেই সমস্যা সমাধানের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়। অথচ আমাদের ক্ষেত্রে সেটি করা হয়নি। তাহলে কি তারা এই অন্যায়ের ক্ষেত্রে সহমত পোষণ করছে? কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের কাছ থেকে আমরা এর জবাব চাই।

এর আগে রবিবার মধ্যরাতে ছাত্রলীগ সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় এবং সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ১৬ জনকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। স্থায়ী বহিষ্কার হওয়াদের মধ্যে ১০ জন বর্তমান কমিটির সহসভাপতি, একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, একজন সাংগঠনিক সম্পাদক আর চারজন কর্মী। স্থায়ী বহিষ্কার হওয়া ছাত্রীরা হলেন-ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি সোনালি আক্তার, সুস্মিতা বাড়ৈ, জেবুন্নাহার শিলা, কল্পনা বেগম, জান্নাতুল ফেরদৌস, আফরোজা রশ্মি, মারজানা ঊর্মি, সানজিদা পারভীন চৌধুরী, এস এম মিলি ও সাদিয়া জাহান সাথী। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফাতেমা খানম বিন্তি, সাংগঠনিক সম্পাদক সামিয়া আক্তার বৈশাখি এবং কর্মী রাফিয়া নীলা, নোশিন শার্মিলী, জান্নাতুল লিমা ও সূচনা আক্তার।

বহিষ্কৃতদের ‘আমরণ অনশন’ টিকল ১ ঘণ্টা: বহিষ্কার আদেশের প্রতিবাদে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে আমরণ অনশনে বসার এক ঘণ্টা পর চলে যান ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগ নেতারা। লেজ ক্যাম্পাসে সংবাদ সম্মেলন শেষে গতকাল দুপুর ১২টার পর অনশনে বসেন বহিষ্কৃতরা, তবে ১ ঘণ্টা পরই তারা স্থান ত্যাগ করেন। বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতারা অনশন শুরু করলে আওয়ামী লীগের কার্যনিবাহী সংসদের সদস্য আবদুল আউয়াল শামীম তাদের সঙ্গে কথা বলেন। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে আলোচনার আশ্বাস দিয়ে তাদের চলে যেতে বলেন। পরে তারা সেখান থেকে চলে যান।

ছাত্র পেটানো তিলোত্তমার নেতৃত্বে কমিটি মানেন না ইডেনের কর্মীরা: ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের সহসভাপতি জান্নাতুল ফেরদৌসকে মারধরের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি মানেন না বলে জানিয়েছেন তার অনুসারীরা। তারা রবিবারই বলছেন, তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি তিলোত্তমা শিকদার এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেনজির হোসেন নিশিকে। এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় তাদের সদস্য করে কমিটি গঠন করা হলেও তারা শেষ পর্যন্ত কোনো রিপোর্ট জমা দেননি।

এ ঘটনায় অভিযুক্ত কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা এবং সাধারণ সম্পাদক রাজিয়া সুলতানাকে বহিষ্কার না করা হলে গণপদত্যাগেরও ঘোষণা দিয়েছেন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের ২৫ নেত্রী। জান্নাতুলের অনুসারীরা শনিবারের ঘটনা তদন্তে গঠিত কমিটি মানেন না জানিয়ে তারা বলেন, তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়েছে নিশি ও তিলোত্তমাকে। এর আগে যখন রিভার অডিও ফাঁস হয়েছে সেটিরও তদন্ত করতে দেয়া হয় নিশি-তিলোত্তমাকে। তারা সেই তদন্তের কোনো রিপোর্ট আমাদের জানায়নি। নিশি আর তিলোত্তমার তদন্ত কমিটি আমরা মানব না।

এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি তিলোত্তমা শিকদার নানা কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন। গত ২৬ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের ঘটনায় তিলোত্তমার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় হাতে লাঠি ও হেলমেট পরা অবস্থায় দেখা যায় তাকে। এ ঘটনায় তিলোত্তমা শিকদারসহ ৩২ নেতার বিরুদ্ধে মামলাও হয়।


poisha bazar