প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বান্ধব নয় রাবি


  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ০৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৯:৫৭

কামরুল হাসান অভি, রাবি

২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩২ জন শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগে বর্তমানে অধ্যয়নরত রয়েছে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন চারশো’রও অধিক শিক্ষার্থী। তবে প্রতিষ্ঠার ৬৮ বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে গড়ে উঠেনি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীবান্ধব অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা। এতে করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণে প্রতিনিয়ত নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাদের।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হন ৪০ শতাংশের বেশি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। এর মাঝে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পান মাত্র দুই শতাংশের বেশি কিছু শিক্ষার্থী। উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাওয়া প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্র এ অংশটিও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বঞ্চিত হচ্ছেন অবকাঠামোগত সুবিধা থেকে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি একাডেমিক ভবন, ১৭টি আবাসিক হল, ব্যাংক, ক্যাফেটেরিয়া, চিকিৎসাকেন্দ্রসহ অন্য কোনো স্থাপনায় প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে যুক্ত করা হয়নি সাংকেতিক চিহ্ন বা নকশা। স্থাপনাগুলোতে নেই বিশেষ রেলিং, কমোড, স্বয়ংক্রিয় ব্যবহারোপযোগী বেসিন বা কোনো ডেডিকেটেড ওয়াশরুম। এছাড়াও বিশ্ববদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর প্রবেশ পথে নেই হুইল চেয়ারের উপযোগী বিশেষ কোনো র‌্যাম্পের ব্যবস্থা। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপরে উঠার জন্য বিশেষ কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি ভবনগুলোতেও। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারেও যুক্ত করা হয়নি বিশেষায়িত কোনো ব্যবস্থাপনা। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদেও জন্য করা হয়নি ব্রেইল বুকের ব্যবস্থা।

বিশ্ববিদ্যালয় লোক প্রশাসন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী ফাহিমা আক্তার খুশি বলেন, আমার একটি পা নেই। চলাফেরা করতে খুব কষ্ট হয়। নিয়মিত ক্লাসগুলো আমাদের হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনে। কিন্তু ভবনটিতে নেই আমাদের মতো বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য উপরে উঠার সিঁড়িতে রেলিং বা অন্য কোন ব্যবস্থা। যখন আমাদের ক্লাসগুলো দুই তলা বা চার তলাতে হয় তখন খুবই ঝামেলায় পড়তে হয়। ওই ভবনে আমাদের মত শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ কোন ওয়াশরুম বা কমোডেরও ব্যবস্থা নেই। যার ফলে প্রতিনিয়ত নানামুখি সমস্যায় পরতে হয় আমাদের।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সংগঠন ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (পিডিএফ) সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেন রিফাত বলেন, বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে চার শতাধিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের জন্য অবকাঠামোগত কোনো ধরণের সুযোগ-সুবিধা নেই ক্যাম্পাসে। একাডেমিক ভবন থেকে শুরু করে হলগুলোতে কোনো ধরনের র‌্যাম্প, বিশেষ ওয়াশরুম, স্বয়ংক্রিয় ব্যবহার উপযোগী বেসিন, সাংকেতিক চিহ্ন বা নকশা নেই। সৃষ্ট করা হয়নি আংশিক, স্বল্প এবং পূর্ণ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী শিক্ষার পরিবেশ। প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করাসহ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য শ্রুতি লেখক সহজীকরণের কথা থাকলেও তেমন কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না তারা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এবং শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. আকতার বানু বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি বছর তিন ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হন। এর মধ্যে রয়েছে শারীরিক, বাক ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। এই তিন ধরণের শিক্ষার্থীদের জন্য যেসব বিশেষায়িত ব্যবস্থা থাকা দরকার তার কোনটিই নেই বিশ্ববিদ্যালয়ে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিভাগের পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিতে শ্রুতি লেখকের প্রয়োজন পড়ে। প্রতিবার পরীক্ষার আগে শ্রুতিলেখক পেতে তাদের যথেষ্ট অসুবিধায় পরতে হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রুতিলেখকের অনুমতি পেতে প্রশাসনিক জটিলতা।

তিনি বলেন, এই জটিলতা কমিয়ে আনা গেলে পরীক্ষার আগে এতোটা দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না এসব শিক্ষার্থীদের। প্রতিবার পরীক্ষায় শ্রুতিলেখকের সহযোগিতা নিতে আর্থিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের। কিন্তু প্রশাসন থেকে এসব বিষয়ের জন্য কোনো আর্থিক সাহায্য করা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবশ্যই এসব শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা রাখা উচিত। কানে শুনতে পায় না এমন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে ক্লাসগুলো করা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এসব শিক্ষার্থীদের কথা মাথায় রেখে প্রতিটি বিভাগের উচিৎ এমন একজন শিক্ষক রাখা যিনি সাংকেতিক ভাষায় শিক্ষার্থীকে বোঝাতে সক্ষম হবেন।

বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের প্রতিবন্ধীদের সুবিধা সম্পর্কে অধ্যাপক বানু বলেন, গ্রন্থাগারে এতসব বইয়ের সমাহার থাকলেও দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই। অথচ তাদের জন্য ব্রেইল বুক থাকার দরকার ছিল। যাতে করে তারা হাত দিয়ে ধরে ধরে পড়তে পারে। যদি সরকারি এবং বেসরকারি এনজিও সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষর্থীদের জন্য ব্রেইল বইয়ের ব্যবস্থা করে দিত তাহলে এধরণের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পথ আরও সহজ হতো। খুব সহজেই জাতির মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা যেত তাদের।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক তারেক নূর বলেন, আসলে আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী সম্পর্কিত ধারণা ও তাদের সুযোগ-সুবিধার কথা খুব বেশি দিনের না। বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো যেহেতু অনেক আগেই তৈরি করা তাই প্রতিবন্ধীদের কথা সেভাবে চিন্তা করা হয়নি তখন। তবে এখন প্রতিবন্ধীদের বিষয়ে আমরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনা করেছি। যত দ্রুত সম্ভব আমরা প্রতিবন্ধীদের সুযোগ-সুবিধাসমূহ আরো বৃহত্তর পরিসরে বাড়ানোর জন্য সবরকম পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।


poisha bazar

ads
ads