জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৩৬ বছর আজ

- ফাইল ছবি

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৫ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডির ৩৬ বছর আজ। ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের তৎকালীন অনুদ্বৈপায়ন ভবনের টেলিভিশন কক্ষের ছাদ ধসে ৪০ জন মারা যান। এরপর থেকে ঢাবি কর্তৃপক্ষ নিহতদের স্মরণে দিনটিকে শোক দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।

এই দুর্ঘটনায় শোক প্রকাশ করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, কেন্দ্রীয় পনেরো ও সাতদলীয় ঐক্য জোটসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতা। বিদেশি কূটনীতিকরাও শোক জানান। তিন দিন জাতীয় শোক ঘোষণা করে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রেখে ১৬ অক্টোবর সারাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এ ঘটনার পর থেকেই দিনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শোক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, জগন্নাথ হল এলাকায় যেখানে ‘অক্টোবর স্মৃতিভবন’ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন বসতো। একে ‘পরিষদ ভবন’ বা অ্যাসেম্বলি হল বলা হতো। এ ভবনটি ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভবনটিকে ছাত্রদের আবাসিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জগন্নাথ হলের সঙ্গে যুক্ত করে।

একাত্তরের শহীদ আবাসিক শিক্ষক অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্যের নামে এ পরিষদ ভবন বা অ্যাসেম্বলি হলের নামকরণ করা হয় ‘অনুদ্বৈপায়ন ভবন’। প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো এই ভবনটিকে আগেই বসবাসের অযোগ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।

ব্রিটিশ শাসনামলে চুন, সুরকি, লোহার রডের বিম দিয়ে তৈরি এ ভবন ছিল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও কর্তৃপক্ষ ছাত্রদের বিনোদন ব্যবস্থা হিসেবে এখানেই একটি বড় রঙিন টেলিভিশন স্থাপন করে।

১৫ অক্টোবর দিনটি ছিল দুর্যোগপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে মুষলধারে বৃষ্টি হয় এবং রাজধানী ঢাকার ওপর দিয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়াসহ ঝড় বয়ে যায়। সারাদিন ধরেই ছিল টিপটিপ বৃষ্টি। আর এ জন্যই পলেস্তারা নরম হয়ে ধসে পড়ে ছাদটি। এরপরই মর্মান্তিক দৃশ্যের সম্মুখীন হয় বিশ্ববাসী।

এদিন রাত সাড়ে ৮টা থেকে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত ধারাবাহিক নাটক ‘শুকতারা’ প্রচার হচ্ছিল। নাটকে অভিনয় করেছিলেন জগন্নাথ হলের ছাত্র শুভ্র দেব। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে নাটকটি দেখার জন্য সমবেত হয় বহু ছাত্র। রাত প্রায় পৌনে ৯টার দিকে ছাত্রদের ওপর ভেঙে পড়ে ভবনের ছাদটি। গভীর রাত ধরে চলে উদ্ধার কাজ।  

তখন ছাত্র হিসেবে ওই হলেই অবস্থান করেছিলেন জগন্নাথ হলের বর্তমান প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা। স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমি তখন মাস্টার্সের ছাত্র। যেদিন ঘটনাটি ঘটল সেদিন মঙ্গলবার ছিল। জনপ্রিয় নাটক ‘শুকতারা’ দেখার জন্য সবাই আমরা উদগ্রীব থাকতাম। ঝুঁকি আছে জেনেও সবাই ওই টিভি রুমে জমায়েত হয়েছিল। কারণ একটা মাত্র রঙিন টিভি ছিল, আর সেটা ওই ভবনে। আমারও ইচ্ছে ছিল কিন্তু হঠাৎ মনে হলো কালতো আমার পরীক্ষা। তাই নাটক না দেখে পড়তে বসলাম একটু পরই বিকট শব্দ, বের হয়ে দেখি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

তিনি আরও বলেন, তারপর আমরা হলের সবাই নেমে এলাম, ঢাকা শহরের সকল মানুষ এখানে চলে এলো। এটা একটা মনে রাখার মতো ঘটনা, যেটা আমরা ৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেখেছিলাম। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই এখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল। প্রচুর রক্তের দরকার ছিল, সকলে লাইন ধরে রক্ত দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। সবাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ওইদিনই ৩৫ জন মারা গিয়েছিল, পরে আরো ৫ জন। গোবিন্দ চন্দ্র দেব ভবনের সামনে সারি সারি লাশ রাখা হলো। এই দৃশ্যটা আমি কখনোই ভুলতে পারব না। ১৫ অক্টোবর এলেই আমার মনে এই স্মৃতি ভেসে ওঠে। আমরা অনেকদিন, অনেক রাত ঘুমাতে পারিনি। বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম সবাই।

এর পুনরাবৃত্তি আর না ঘটুক উল্লেখ করে অধ্যাপক মিহির লাল সাহা জানান, শতবর্ষের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ট্রাজেডি যেন আর না ঘটে সে বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। তৎকালীন সব হল সংস্কার করতে হবে, না হয় এমন দুর্ঘটনার সম্ভাবনা থেকে যাবে। এ বিষয়ে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। ওইদিন যারা নিহত হয়েছিল তাদের আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি এবং তাদের আত্মার শান্তি কামনা করি।


poisha bazar

ads
ads