পুরো শিক্ষাবর্ষই তছনছ


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৮ আগস্ট ২০২০, ০৮:৫৪

করোনা মহামারী দিনকে দিন আরো ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশের শিক্ষা কার্যক্রম অনেকটা তছনছই হয়ে গেছে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঁচ মাস ধরে চলমান টানা ছুটি আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে শিশু থেকে শুরু করে কলেজ-ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের লেখাপড়াও।

প্রাথমিক সমাপনীর (পিইসি) মতো অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষাও এবার হচ্ছে না। এদিকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের অনলাইনে ভর্তি শুরু হলেও ক্লাস অনিশ্চিত। একই সঙ্গে অনিশ্চিত এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাও। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ক্লাসের বার্ষিক পরীক্ষাও সম্ভবত হচ্ছে না। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বক্তব্যে বিষয়টি অনেকখানি খোলাসা হয়ে গেছে।

গতকাল এক অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গে দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘সামনে তো বার্ষিক পরীক্ষা। পরীক্ষা তো আর হবে না, দেখি সে ক্ষেত্রে আর কী করা যেতে পারে।’ ৩১টি উপজেলার শতভাগ বিদ্যুতায়নের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অনলাইনে নোয়াখালীর শুভশ্রী রায় নামে এক ছাত্রীর বক্তব্য শোনার পর প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি আমাদের শিক্ষার্থীদের সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে। এই যে এত দিন পর্যন্ত স্কুল নাই, ক্লাস নাই, পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে। কিছু করারও উপায় নেই, কারণ এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বই এই সমস্যায় ভুগছে।’

শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার প্রমোশনের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘টেলিভিশনের মাধ্যমে অনলাইনে আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। বইপত্র তো আছেই। সব শিক্ষার্থীকে বলব ঘরে বসেই তারা পড়াশোনা করুক। তারপর দেখি আমরা কিভাবে কী করতে পারি। কারণ সামনে তো ফাইনাল পরীক্ষা। পরীক্ষা তো আর হবে না, সে ক্ষেত্রে আর কী করা যেতে পারে। প্রমোশনটা দেয়া কিংবা পড়াশোনা যাতে চলতে পারে সে ব্যবস্থাটাই করা।’

এর আগে ১৮ জেলার ৩১টি উপজেলার শতভাগ বিদ্যুতায়নের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এতে দেশের মোট ২৮৮টি উপজেলা শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় এলো। এর ফলে দেশের ৯৭ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা ভোগ করবে। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জেলার প্রশাসক, জনপ্রতিনিধি ও নানা পেশাজীবীদের কথা শোনেন প্রধানমন্ত্রী।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বন্ধ: করোনা মহামারীর মধ্যে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছুটি আরো এক মাস তিন দিন বাড়িয়েছে সরকার। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বব্যাপী মহামারী করোনার কারণে কওমি মাদরাসা ছাড়া দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে।’

যদিও প্রথমে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান ছুটি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর কথা জানানো হয়েছিল। পরে সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৩০ সেপ্টেম্বর নয়, কওমি মাদরাসা ছাড়া সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি থাকবে। দেশে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বাড়তে থাকায় গত ১৭ মার্চ সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ২৬ মার্চ থেকে সারা দেশে সব অফিস-আদালত আর যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখে শুরু হয় ‘লকডাউন’।

টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটির পর ৩১ মে থেকে সীমিত পরিসরে অফিস খুলে যানবাহন চলাচল শুরু হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বন্ধই আছে। গত ১ এপ্রিল থেকে নির্ধারিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা মহামারীর কারণে স্থগিত হয়ে আছে। এবারের প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষাও কেন্দ্রীয়ভাবে না নিয়ে স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা নেয়ার ঘোষণা এসেছে সরকারের তরফ থেকে। তবে করোনা মহামারীর মধ্যেই দেশের কওমি মাদরাসাগুলোকে ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে’ ডিগ্রি ও মাস্টার্স পরীক্ষা নেয়ার অনুমতি দিয়েছে সরকার।

জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা হবে না: করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে প্রাথমিক সমাপনীর মতো অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষাও এবার হবে না। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞতিতে বলা হয়, ‘২০২০ সালের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না।’

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা নিয়ে করণীয় জানতে চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রস্তাব পাঠায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মহামারীর মধ্যে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এবারের জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষা না নেয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।’

তবে অষ্টমের শিক্ষার্থীদের পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে কোন পদ্ধতি অবলম্বন করা হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।

করোনা ভাইরাস মহামারীর মধ্যে এবার কেন্দ্রীয়ভাবে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা না নিয়ে নিজ নিজ বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষা নেয়া হবে বলে এর আগে জানিয়েছিল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

জেএসসি-জেসিডি পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে না হলে অষ্টমের শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষায় বসতে হবে কি না, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখনো সেই সিদ্ধান্ত চ‚ড়ান্ত করেনি বলে একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। মহামারীর কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। গতকাল এই ছুটির মেয়াদ ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গত ১ এপ্রিল থেকে নির্ধারিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা মহামারীর কারণে স্থগিত আটকে আছে। তবে কওমি মাদরাসাগুলোকে ‘স্বাস্থ্যবিধি মেনে’ ডিগ্রি ও মাস্টার্স পরীক্ষা নেয়ার অনুমতি দিয়েছে সরকার।

এইচএসসির বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি খোঁজার নির্দেশ: মহামারীকালে এবং পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয়ের অধীন দফতর ও সংস্থা প্রধানদের সঙ্গে গতকাল ভার্চুয়াল সভা করেন শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি।

সেই সভার সিদ্ধান্ত জানিয়ে মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পরিস্থিতি যদি স্বাভাবিক না হয়, সে ক্ষেত্রে এইচএসসি পরীক্ষা এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরবর্তী ক্লাসে উত্তীর্ণের বিষয়ে বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতি কী হতে পারে সে বিষয়ে একটি প্রস্তাব তৈরি করে পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ঢাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার এইচএসসিসহ মাধ্যমিকের কোনো পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হবে না- এমনটা ধরে নিয়েই ওই পরিকল্পনা করতে হবে।’

বাসায় পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে: আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। তবে স্কুল বন্ধে শিক্ষার্থীদের বাসায় বসে লেখাপড়া নিশ্চিতের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। গতকাল প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার জন্য আগামী ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কিন্ডারগার্টেন বন্ধ থাকবে। এ সময়ে নিজেদের ও অন্যদের করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষার লক্ষ্যে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাসস্থানে অবস্থান করবে।

শিক্ষার্থীদের বাসস্থানে অবস্থানের বিষয়টি অভিভাবকরা নিশ্চিত করবেন এবং স্থানীয় প্রশাসন তা নিবিড়ভাবে পরিবীক্ষণ করবেন। প্রধান শিক্ষকরা তাদের শিক্ষার্থীরা যাতে বাসস্থানে অবস্থান করে নিজ নিজ পাঠ্যবই অধ্যয়ন করে সে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট অভিভাবকদের মাধ্যমে নিশ্চিত করবেন। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের জারি করা নির্দেশনা ও অনুশাসনগুলো মেনে চলতে হবে বলে নির্দেশনা দিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। করোনার কারণে স্কুল বন্ধে এবার প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা হবে না, তবে বার্ষিক পরীক্ষা নিয়ে মূল্যায়ন করা হবে বলে জানিয়েছে গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়।

অনলাইন ক্লাসে আগ্রহ নেই শিক্ষকদের: এদিকে আমাদের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ক্লাস পরিচালনায় নবীন শিক্ষকদের কেউ কেউ ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে সামলে নিলেও ক্লাসবিমুখ প্রবীণ শিক্ষকরা। ঈদের পর ক্লাস নেয়া বন্ধ করে দিয়েছেন অনেকেই। বলছেন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম, ক্লাসের আবহ না পাওয়ায় ক্লাস চালিয়ে যেতে উৎসাহ পাচ্ছেন না তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. লায়লা আরজুমান বানু বলেন, ‘অনলাইন ক্লাস শুরু হলে শিক্ষার্থী উপস্থিতি অর্ধেকের বেশি ছিল। তবে ঈদের পর উপস্থিতি অনেক কমেছে। কখনো কখনো ১০০ জনের মধ্যে ১০-১৫ জন উপস্থিত হচ্ছে। ক্লাসের আবহ পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনায় ক্লাস চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ক্লাসের সেই পরিবেশ না পাওয়ায় এখন ক্লাসে যাচ্ছি না।’ বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষক ক্লাস বন্ধ করেছেন বলেও জানান তিনি।

অনলাইন ক্লাসের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের ডিন অধ্যাপক ফখরুল ইসলাম বলেন, আপাতত আপৎকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের কোনো রকমে ব্যস্ত রাখা। একদম বন্ধ করে না দিয়ে কোনোভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগটা রাখা যায় সে প্রচেষ্টা। তবে তার ব্যক্তিগত মতামত হলো, ‘করোনা মহামারীকাল আরো অনেক দীর্ঘায়িত হতে পারে। রাজস্থান, দক্ষিণ কোরিয়া, আমেরিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু অভিজ্ঞতায় বলা যায় শিগগিরই আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পারব না।’

 






ads