রাবি'র মেধাবীদের করোনাকাল কাটছে যেভাবে

মিনহাজ আবেদিন

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • অ্যাম্বাসেডর, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ২২ মে ২০২০, ২০:০০,  আপডেট: ২৪ মে ২০২০, ১২:২৮

দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা পড়েছে বিপাকে। অর্থনৈতিক সমস্যা, বইয়ের সংকট, একাডেমিক পড়াশোনাসহ যাবতীয় বিষয়ে চিন্তিত তারা। যদিও আবার কেউ এ সময়টাকে জীবনের সেরা সময় হিসেবে মনে করছে। পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে যাঁরা 'ফার্স্ট বয়’, ‘ফার্স্ট গার্ল'- এ সময়টা তাঁদের কীভাবে কাটছে? এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে ক্লাসে প্রথম হওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলে লিখেছেন মিনহাজ আবেদিন।

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
রাশেদ শুভ্র

গ্রামের জাত গৃহস্থের ঘরে আমার জন্ম। অভাব বলতে তেমন কিছু নেই এখানে। ক্ষেতে পাকা ধান মাথা নুইয়ে আছে। সেগুলো কাটা হচ্ছে, মাড়াই হচ্ছে। সবজি চাষ হচ্ছে। গাভী দুধ দেয়। উঠান পেরিয়েই আম, জাম, নারকেল গাছের সারি। অভাব নেই।

কিন্তু আমার নিজের অভাব আছে। অভাবটা অন্য কিছুর নয়, বইয়ের। বই নেই কোথাও। বই যা ছিল, পড়া শেষ। ‘যান্ত্রিক-বইয়ের’ সুবাদে সেই অভাব কিছুটা দূর হলেও একেবারে তৃপ্ত হতে পারি না। কাগজের বইয়ের মলাট, অনন্য এক গন্ধ সবসময়ই আমার চিত্তে নাড়া দেয়। পুরাতন বইয়ের স্তুপ খুঁজে মাঝেমধ্যে না পড়া দুই একটা বই পাওয়া গেলে আনন্দে মন ভরে ওঠে। না পাওয়া গেলে পড়া বইগুলোই আবার পড়ি। আর খবরের কাগজে মাথা গুঁজে বইয়ের অভাবটা পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করি।

যখনই বিরক্তি অনুভব হয়, নেমে পড়ি কাজে। ক্ষেতে গিয়ে একেবারে মজুরদেরই একজন হয়ে তাদের সাহায্য করি। ধান মাড়াইয়ের কাজ করতে বেশ ভালোই লাগে। বিকেলের পর সবজি ক্ষেতে চলে যাই। সবজি ক্ষেতে কাজের শেষ নেই। সবসময়ই কোনো না কোনো কাজ থাকবেই। যা সামনে দেখতে পাই, লেগে পড়ি। পাশাপাশি গ্রামের মানুষগুলোকে করোনার করাল গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়গুলো বলে দিচ্ছি।

রাসেদ শুভ্র আরও বলেন, ছোটবেলা থেকেই মা’কে রান্নার কাজে সাহায্য করতাম। এটা আমার কাছে উপভোগ করার মতো অন্যতম একটা কাজ। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতে রান্না-চর্চা ভালোই হতো। বাড়িতে এসেও সেটা অব্যাহত আছে। মাঝেমধ্যেই নিজের হাতে রান্না করে বাড়ির সবাইকে খাওয়াই। আর সবার প্রসংশা শুনে মনে মনে অন্য কোনো পদের রান্নার পরিকল্পনা আঁকি। সব মিলিয়ে ছুটির সময়টা হয়ে উঠেছে ‘বৈচিত্র্যময়’।


ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
শেখ ছাইফুল্লাহ

করোনা ছুটিকালীন নিজ গ্রামেই অবস্থান করছি। প্রাণঘাতী করোনার ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গ্রামের মানুষ একদিকে আর্থিকভাবে যেমন অসচ্ছল হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে তাঁরা মোটেও সচেতন নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আমার এলাকার পাবলিক ভার্সিটির স্টুডেন্টদের নিয়ে গঠিত "রুপসা" সংগঠনের সাথে যুক্ত থেকে এলাকার লোকদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করছি। সত্যি বলতে কি গ্রামের অধিকাংশ মানুষকে বারবার স্বাস্থ্যসম্মত উপায় অবলম্বনের কথা বললেও তারা ব্যাপারটাকে নিছক সাধারণ বিষয় বলেই নিচ্ছে। যাতে করে ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। তারপরও লোকজনকে করোনার প্রভাব সম্পর্কে কিছুটা হলেও অবগত করে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আসলে বর্তমান পরিস্থিতিতে পড়াশোনা ঠিকমতো চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবুও কিছুটা সময় পড়াশোনার মধ্যে দিয়ে কাটানোর চেষ্টা করছি। যদিও পড়াশোনায় মনস্থির করা একটু কঠিন। যাইহোক আগে জীবন তারপর বাকিসব। তাই যতটুকু সম্ভব নিজেকে বিশ্ব মহামারীর প্রতি চোখ রেখে এবং স্বাস্থসম্মত উপায় অবলম্বনের মধ্য দিয়ে এ সময় পার করছি।


রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
ফাতেমাতুজ্জোহরা

এ দীর্ঘ ছুটি কখন শেষ হবে জানি না। তবে সময়টিকে জীবনের সেরা সময় হিসেবে মনে হচ্ছে। এখন একাডেমিক পড়ালেখার কোনো চাপ নেই। নেই কোন এ্যাসাইনমেন্ট। সময়টা একেবারে নিজস্ব। তাই নিজের মতো করে জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পাচ্ছি।

বাসায় বাবার সাথে ইংরেজি চর্চা শুরু করেছি, বাংলা সাহিত্যের কয়েকটা বই পড়েছি, শেক্সপীয়রের রচনা সমগ্র হাতে নিয়েছি। মাঝে মধ্যে অনলাইনে বিভিন্ন বিষয়ের উপর বিভিন্ন শিক্ষকের ক্লাস করছি। এবং টেলিভিশনে বিভিন্ন বিষয়ে টকশো দেখছি।

গতিহীন জীবনে সময়ের প্রবাহও মন্থর গতির। যা স্বাভাবিক জীবনের পরিপন্থী। তারপরও,'প্রলয় নতুন সৃজন বেদন '- এ সত্যকে স্বীকার করে নিয়ে সাময়িক এ দুর্যোগ মেনে নিতেই হচ্ছে। তবে পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে পারছি। মায়ের কাজে সাহায্য করছি। সব মিলিয়ে এই সময়েরর কাজগুলো খুব সুন্দর হয়ে উঠেছে।


চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগ
লাবু হক

মহামারীর এই দিনগুলোর প্রতিটা মুহূর্ত বাসায় কাটাচ্ছি। শুধু চারুকলার শিক্ষার্থী হিসেবেই নয়। নিজের ভালোলাগা থেকে প্রতিদিন একটু আধটু ছবি আঁকি। একাডেমিক পড়াশোনার প্রতি আপাতত মনোনিবেশ করছি না। ক্যাম্পাসে থাকাকালীন বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে ছবি আঁকা ছাড়া অন্য কিছু করার তেমন সময়ই পাওয়া যেতো না। তাই এখন পছন্দের যে কাজগুলো সময়ের অভাবে এতদিন করা হয়নি। সে কাজগুলো করে নিচ্ছি।

ছবি আঁকার পাশাপাশি এলাকার মানুষদের মাঝে করোনাভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি। একটু-আধটু লেখালেখি, মাঝে মধ্যে গল্পের বই পড়ি। এ ছাড়া মাকে বাসার কাজে সাহায্য করছি। আর কিছুটা সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যয় করে চলেছি। নিজেকে নানাভাবে ব্যস্ত রেখে এই উদ্বুদ্ধ পরিস্থিতিতে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখার চেষ্টা করছি। পৃথিবীটা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক সেই কামনায় সময় গুনছি।


ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
মো. হাসান রেজা

মহামারী আকার ধারণ করা করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৮ মার্চ থেকে হল বন্ধের ঘোষণা দেয়। সেদিনই গ্রামের বাড়ি চলে আসি। যারা দিন এনে দিন চলে, সেই গ্রামের মানুষগুলো কি করোনার নিয়মে চলতে পারে? তাই করোনা সম্পর্কে এই মানুষগুলোকে সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তাদের মাঝে মাস্ক, লিফলেট বিতরণ, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখাসহ বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিষয়গুলো অবহিত করছি।

করোনা তার প্রভাব বিস্তার করে খেটে খাওয়া মানুষদেরকে অর্থনৈতিকভাবে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। অসচ্ছল পরিবারের জন্য আমি গ্রামের সচেতন কয়েকজনকে নিয়ে সাধ্যনুযায়ী ত্রাণ বিতরণ, ফ্রি-মেডিকেল পরামর্শসহ তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।

পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা করার চেষ্টা করছি। নিয়মিত কিছু না কিছু লেখছি। এলাকার কিছু ছোট বাচ্চাদের পড়াশোনা করাচ্ছি। অনলাইনে জব রিলেটিভ এমসিকিউ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছি। ধর্মীয় ইবাদতসহ কুরআন শিক্ষা অর্জন করার পিছনেও কিছু সময় ব্যয় করছি। আর বাবা-মায়ের সাথে সুন্দর সময় কাটাচ্ছি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে/মিনহাজ আবেদিন




Loading...
ads






Loading...