করোনার দিনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা

সোনিয়া ইশরাত ইভা

করোনার দিনে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ঈদ ভাবনা
বামে থেকে মিনহাজুল আজম, সামছুন্নাহার সাকুরা, জুয়েল মাহমুদ, ডানে শারমিন নিম্মী

poisha bazar

  • ডেস্ক রিপোর্ট
  • ২১ মে ২০২০, ১৪:৪২,  আপডেট: ২১ মে ২০২০, ১৫:০১

একমাসের সিয়াম সাধনা শেষে মুসলিম উম্মাহর ঘরে হাজির হয়েছে ঈদের পূর্বমুহূর্ত। প্রতিবছর এই দিনে আত্মীয়-স্বজন আর পরিবার পরিজন নিয়ে সকলে মেতে ওঠে সীমাহীন আনন্দে। তবে এবার হয়ত সেই চিরচেনা ছবি দেখতে পাওয়া যাবে না। দেশে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আক্রান্ত করে করোনা পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক মহামারীতে। সংক্রমণ ঠেকাতে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে সামাজিক দূরত্ব রক্ষাকরণ ও নেয়া হয়েছে লক ডাউনের মত পদক্ষেপ। এতে করে ঈদের আনন্দ ম্লান হবে বলেই ধারণা করা যাচ্ছে। করোনার দিনে ঈদের সময় নিয়ে কি ভাবছেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীরা। সে কথা জানার চেষ্টা করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সোনিয়া ইশরাত ইভা। তিনি তুলে এনেছেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনের ঈদ ভাবনা।

জুয়েল মাহমুদ

বর্তমানে পৃথিবীতে একটি ভয়ঙ্কর বিপদের বা মহামারির নাম নভেল করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাসের সংক্রমণে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন তারা কোভিড-১৯ রোগ বহন করছেন, যা বিগত ১০০ বছরের মধ্যে এটি পৃথিবীতে সব থেকে বেশি প্রাণঘাতী ভাইরাস। এই রোগের এখন পর্যন্ত কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়ায় পৃথিবীর প্রতিটি দেশ চরম বিপদের সম্মুখীন হয়েছে, যার ফলে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ অর্থনৈতিক ভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পতিত হচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ তাদের রাষ্ট্রকে এবং সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। ফলে পৃথিবীর অধিকাংশ রাষ্ট্র তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো থেকে কর্মী ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছেন। এরইমধ্যে পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের মিল,কলকারখানা বন্ধ ঘোষণা করেছে, যার কারণে বিশ্ব একধরনের অর্থনৈতিক মন্দার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

গবেষকরা বলছেন যদি এই ভাইরাসের সংক্রমণ রোধ করা না যায় তবে বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ার সাথে সাথে প্রায় ৪০ কোটি মানুষ তাদের কর্মসংস্থান হারাবেন এবং সেই সাথে অনেক বেকারত্বের হার বেড়ে যাবে। বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি একমাত্র অপরিশোধিত তেল এবং সোনা,যা ইতোমধ্যে শূন্যের কোঠাই নেমে এসেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচার এবং অর্থনৈতিক মন্দা থেকে উত্তরণ পাওয়ার উপায় হলো সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা এবং সেই সাথে কিছু কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাতে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। এক্ষেত্রে কার্যকারী পদক্ষেপ হলো প্রতিটি রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রশাসনকে সঠিকভাবে বিকেন্দ্রীকরণ এবং সেই সাথে সরকারি - বেসরকারি সকল জায়গা থেকে লজিস্টিক সাপোর্ট দিয়ে সহায়তা করা।

নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যেই পালিত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের পবিত্র ঈদ উল ফিতর। আর এবারই প্রথম বারের মত ঈদ পালিত হতে যাচ্ছে ভিন্ন আঙ্গিকে। প্রতি বছর ইদের জামাত ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হলেও, বেশিরভাগ মুসলিম দেশ ঈদের নামায ঘরে আদায় করতে বলেছেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিটি বাসার ছাদ হতে পারে এক একটি ছোট ছোট ঈদগাহ মাঠে, এতে করে ঐ একই বাসার সব একসাথে ঈদের নামায আদায় করতে পারেন।

তাছাড়া প্রতিবছর বিভিন্ন বিপণী বিতানে যেরকম জাঁকজমকপূর্ণ ভীর থাকত এবার সে রকম থাকবে না বিধায় সেক্ষেত্রে করোনা ভাইরাস একটু কম সংক্রমিত হবে। কিন্তু প্রতিবছর গরীব দুখীরা বিত্তবানদের কাছে থেকে যে হকটুকু পেত তা এবার অনেকাংশে কম হবে, তাই আমাদের উচিত হবে একটি সুনির্দিষ্ট তহবিল গঠন করে সেখানে টাকা জমা নেওয়া এবং সেই টাকা পরিপূর্ণ ও সুনির্দিষ্ট ভাবে যাতে ঐসব গরীব মানুষের হাতের কাছে পৌঁছে যায় তা যথাযথ নিশ্চয়তা প্রদান করা। যাতে করে প্রতিটি মানুষ ইদের আনন্দ পরিপূর্ণভাবে ভাগ করে নিতে পারে এবং প্রতিটি মানুষের মুখে সুন্দর একটি হাসি ফুটে উঠে। শেষে কাজী নজরুল ইসলামের গানটি দিয়ে শেষ করতে চাই -

"ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে,শোন আসমানী তাগিদ
তোর সোনা-দানা, বালাখানা সব রাহে লিল্লাহ
দে যাকাত, মুর্দা মুসলিমের আজ ভাঙাইতে নিঁদ
ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ"

তাই আসুন ইদের খুশিকে সবার সাথে ভাগ করে নেই, দেখবেন এবারের ঈদই সব থেকে আনন্দদায়ক হবে এবং ঐ সব অনাহারী দিন আনা দিন খাওয়া মানুষের কষ্ট বুঝতে পারবেন।

লেখক - শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

সামছুন্নাহার সাকুরা

করোনা ভাইরাসের দিনে ঈদ নিয়ে লিখতেই যেন কেমন লাগছে। ঘরবন্দি মানুষের ঈদ ভাবনা কেমন হতে পারে? এক অনিশ্চিত অনুভূতিহীন সময় পার করছি আমরা। আর এই সময়ে লিখতে হচ্ছে ঈদ ভাবনা নিয়ে।

অনুভূতি শব্দটার সাথেই কেমন যেন একটা আবেগ রয়েছে। তেমনি ঈদ শব্দের সাথেও আলাদা একটা আনন্দের আমেজ রয়েছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত এই অনুভূতি এবং ঈদ কোনো শব্দের সাথেই এবার আলাদা কোনো মন দোলে উঠাটা কাজ করছে না। এই ভাইরাসে হয়তো আমি এখনও আক্রান্ত হইনি কিন্তু অনেক পরিবারের সদস্যই এই ভাইরাসে আক্রান্ত৷

তাদের কাছে কিংবা যারা দিন মজুর অথচ কাজে যেতে না পেরে এক বেলা খাচ্ছে কী খাচ্ছে না তার কোনো হিসেব আমার কাছে থাকছে না - এমন অনিশ্চিত একটা সময়ে আসলেই ঈদের দিনটা প্রাণে দোলা দিতে পারছে না। বরং, যেদিন জানবো দেশ ভাইরাস মুক্ত সেদিন জানবো আজ ঈদ।

লেখক- শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মিনহাজুল আজম মেহেদী

এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বর্তমান সময় এ করোনা আতংকে পুরো পৃথিবী নিমজ্জিত। আতংক, অনিশ্চয়তা, ভয় এসব এর মধ্যে দিয়েই চলছে উচ্চবিত্ত থেকে দরিদ্র মানুষের জীবন যাত্রা। এরই মধ্যে আসন্ন মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ উল ফিতর। এবারের ঈদটা ভিন্ন বিভিন্ন কারণেই।

করোনার দরুন ঈদের জামাত ঘরেই পড়তে হবে, আত্মীয় দের বাসায়ও যাওয়ার অবস্থা নেই, নেই নতুন জামার আনন্দও। কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতার মাঝেই খুঁজে নিতে হবে ঈদ এর আনন্দ। এবারের ঈদ ভিন্ন ভাবে করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে যে যার সাধ্যমত গরীবদের সাহায্য করা। ৩০ দিনের রোজাও আমাদের সে শিক্ষাই দেয়। করোনার জন্য কাজ বন্ধ দেশে তাই দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো হোক এবার আমাদের একটি জরুরি উদ্দেশ্য।

আর্থিকভাবে, খাদ্য দিয়ে সহায়তা করা যেতে পারে। এতে সামাজিক বন্ধন আরও বেগবান হবে। নামায, কুরআন তেলাওয়াত এর মধ্যে দিয়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ঈদ এর এ সময়টা হতে পারে সুন্দর কিছু করার যেহেতু সবাইকে বাসায়ই থাকা পড়বে।

ছেলে মেয়ে উভয়ই নতুন রান্নার আইটেম শিখে নিতে পারে, কম্পিউটার স্কিল আরও ডেভেলপ করতে পারে। বই হতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম যা সময় কাটানোর পাশাপাশি বিকশিত করবে মানসিক শক্তি। মেডিটেশন করা যেতে পারে যা আনতে পারে শারীরিক সুস্থতার জন্য এক নতুন মাত্রা।

কালজয়ী চলচ্চিত্র দেখার মধ্যে দিয়ে বিশ্ব সংস্কৃতির সাথে গড়ে উঠবে নতুন সম্পর্ক। নিজ নিজ জায়গা থেকে মানুষ এর মধ্যে করনা নিয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার বিভিন্ন মাধ্যমে নিজেকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সময়ও ঠিক এখনি। এভাবেই এবার ঈদ টাকে আমরা একটু নতুন ভাবে পালন করতে পারি যা করনা থেকে মুক্তির পথে এক ধাপ এগিয়ে নিবে আমাদের।

লেখক- শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

শারমিন নিম্মী

ঈদ মানে আনন্দ ঈদ মানেই খুশি।মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর দুটি ঈদ পালন করে থাকে। এই দুটি ঈদকে ঘিরে থাকে নানা কল্পনা জল্পনা। আমার কাছে ঈদ মানে এক ঝাঁক তরুণের ঘরে ফেরার গল্প, সেই সঙ্গে সকলের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করার গল্প। প্রতিবছরেই ঈদ পালিত হয় খুব জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে আর নানা ধরনের পরিকল্পনার মাঝে যেমন ঈদে নতুন জামা কেনা, খাবারের মেনু ঠিক করা। ঈদের দিনটি কাটে সবার সাথে কুশল বিনিময়ে, পাড়াপ্রতিবেশির বাসায় বেড়ানো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা, পরিবারকে নিয়ে পার্কে বেড়ানো এভাবেই কাটতো প্রতিটা ঈদ।

তবে এ বছরে ঈদের গল্পটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক গল্প, যেখানে আগের মত কিছুই হবে না। এক ভয়াবহ প্রাণঘাতী ভাইরাস পুরো পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলেছে সেই ভয়াবহতা থেকে বাংলাদেশও রক্ষা পায়নি। করোনার ভয়াবহতা থেকে যেখানে ঘর থেকে বের হওয়া বিপদজনক সেখানে কেনাকাটা, মার্কেট যাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া এসব করে নিজেদের মৃত্যুর দিকে ধাবিত করা ছাড়া আর কিছুই নয়।

বন্দিত্ব কারো কাছেই সুখকর নয় হোক সে মানুষ কিংবা পশুপাখি সবাই চায় মুক্ত আকাশে মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করতে। বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে অবরুদ্ধ পুরো পৃথিবী। চারদিকে প্রতিনিয়ত বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। এই পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের প্রত্যেকের উচিত সকলের পাশে থাকা, অসহায় মানুষদের জন্য কিছু করা।

এই প্রাণঘাতী ভাইরাসটি অনেক কিছু বুঝিয়ে দিচ্ছে মানবজাতিকে সেই অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করাটাই এখন মুখ্য। তবে এই ঈদটি কাটুক পরিবারকে নিয়ে।

মনকে বুঝিয়েছি এই ঈদে শপিং না হয় নাই বা করলাম, বন্ধুদের সাথে ভিডিও কিংবা চ্যাটিং এ না হয় আড্ডা দিলাম, তবুও আমরা না হয় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখলাম। তবে এ যাত্রায় বেঁচে গেলে ভীষণ করে বাঁচবো। প্রকৃতি তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পেলে আবার না হয় আমরা মুক্ত আকাশে মেতে উঠবো, নানা রঙ্গের ঘুরি উড়াবো। প্রকৃতি তার এক হাত দিয়ে কিছু কেড়ে নিলে তার অপর হাত দিয়ে ভরিয়ে দেয় সেই প্রত্যাশায় সবাই সুস্থ থাকি, নিরাপদ থাকি।

লেখক- শিক্ষার্থী, লোক প্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

সম্পাদনা- আরিফুল ইসলাম






ads