• বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২০
  • ই-পেপার

ভিসির স্বজনদের পদচারণায় মুখর খুবি

মানবকণ্ঠ
খুবি - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • আলমগীর হান্নান, খুলনা ব্যুরো
  • ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:১৮,  আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৮:৩৩

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নে নিম্নমানের কাজ, ঘুষ, দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা ভাগাভাগি ও লোপাটের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয়েছে ভিসির নিয়োগ বাণিজ্য নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে তোলপাড়। তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম এবং নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অযোগ্যদের ডিন ও বিভাগীয় প্রধান পদেও নিয়োগ দিয়েছেন ভিসি। এমনকি নিজের আত্মীয়-স্বজনকে তিনি বসিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, সব নিয়োগ প্রক্রিয়াই স্বচ্ছতার ভিত্তিতে হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের বর্তমান ডিন ও প্রধানেরই নিয়োগ হয়েছে বেআইনীভাবে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিয়োগ বিধিতে স্পষ্ট উল্লেখ আছে যে, অধ্যাপক হতে গেলে ‘সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে অন্তত ৪ (চার) বছরের শিক্ষকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা’ থাকতে হবে। কিন্তু আইন বিভাগের প্রধান ওয়ালিউল হাসনাতের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে মোট অভিজ্ঞতা মাত্র ৩ বছর ৬ মাস ৭ দিন। কিন্তু তাঁর লিয়েন কার্যকালকে (১০ মাস ১৪ দিন) অভিজ্ঞতা হিসেবে গণনা করে মোট অভিজ্ঞতা দেখানো হয়েছে ৪ বছর ৪ মাস ২১ দিন। অথচ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের কোনও বিশ্ববিদ্যালয়েই লিয়েনকে চাকুরিকালীন বাস্তব অভিজ্ঞতা হিসেবে গণনা করার বিধান নেই।

এছাড়া পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ঘটেছে বড় ধরণের অনিয়ম। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিতে অধ্যাপক হতে গেলে মোট ২৫ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতার কথা স্পষ্ট করে বলা থাকলেও তা নামিয়ে আনা হয়েছে ২০ বছরে। এছাড়া অধ্যাপক হতে নূন্যতম ১০টি প্রকাশনার কথা বলা থাকলেও এই বিশেষ ক্ষেত্রে চাওয়া হয়েছে মাত্র ৫টি প্রকাশনা। আর এমন শিথিলকৃত যোগ্যতাতেই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক উত্তম মজুমদারকে। এতো কম যোগ্যতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে আর কোনও অধ্যাপকই কখনোই নিয়োগ পাননি।

তালিকার ৫৯ নম্বর থেকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ইতিহাস ডিসিপ্লিনের প্রভাষক মোঃ হাফিজ আহমেদকে। অথচ তার আগের সবকটি প্রার্থীরই শিক্ষাজীবনের সকল পর্বে প্রথম শ্রেণি ছিলো। তারমধ্যে অনেকেই ছিলেন পিএইচ.ডি. ডিগ্রিধারীও। তাদের বাদ দিয়ে মানের অবনমন করে এমন নিয়োগও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরল। মানের অবনমন করে এমন নিয়োগ সঙ্গত কারণেই নেপথ্যের কার্যকারণ সম্বন্ধে সন্দেহের উদ্রেক করে।

আরও দেখা যায় যে, খুবির অনেক ডিসিপ্লিনে শিক্ষক স্বল্পতা থাকলেও বিজ্ঞাপিত পদের চেয়ে কম সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কিন্তু কোনো কোনো ডিসিপ্লিনে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বিজ্ঞাপিত পদের চেয়ে অনেক বেশি। যেমন- পদার্থ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিন, কলা অনুষদ বা চারুকলা অনুষদের ডিসিপ্লিনসমূহে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়নি বা বিজ্ঞাপিত পদের চেয়ে কম সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফার্মেসি ডিসিপ্লিনে শিক্ষকস্বল্পতা না থাকলেও তিনটি পদের বিপরীতে নেওয়া হয়েছে ৭ জন, আইন বিভাগে ৩টি পদের বিপরীতে ৫ জন এবং সাংবাদিকতা বিভাগেও ৩টি পদের বিপরীতে নেওয়া হয়েছে ৫জনকে।

এছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলে ৯ মাস খণ্ডকালীন হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন খুবিরই বাংলা ডিসিপ্লিনের সাবেক শিক্ষার্থী পুজা মিত্র। কিন্তু তাকে সরিয়ে দিয়ে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বাংলা ডিসিপ্লিনেরই শিক্ষক মোঃ দুলাল হোসেনের স্ত্রীকে। অথচ দুলাল হোসেনের স্ত্রীর একাডেমিক যোগ্যতা কোনোভাবেই পুজামিত্রের সাথে তুলনীয়ই নয়। পুজা মিত্রের অনার্স ও মাস্টার্সের রেজাল্ট প্রথম দিকে। তিনি মাস্টার্সে থিসিস গ্রুপের শিক্ষার্থী ছিলেন। মাস্টার্সে মেধা তারিকায় তার অবস্থান ৩য়। ইতিমধ্যে তার দুটি গবেষণাগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু দুলাল হোসেনের স্ত্রীর রেজাল্ট পুজার চেয়ে অনেক কম, তিনি নন-থিসিস গ্রুপের শিক্ষার্থী এবং তার কোনো লেখাপত্র না থাকলেও কেবল স্বামীর সুবাদেই তিনি পুজামিত্রকে সরিয়ে নিজের জায়গা করে নিতে পেরেছে।

এছাড়া খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দেখা গেছে উপাচার্যের উন্মুক্ত স্বজনপ্রীতির চিত্রও। যেমন- খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত মোঃ ইউসুফ রায়হান (বোনের ছেলে), মোঃ জামাল মিয়া (ফুপাতো ভাই), মোঃ আবু সাঈদ (বোনের ছেলে), রুবেল হাসান (বোনের ছেলে), সৈকত মাহমুদ (ভাইয়ের ছেলে), আসাদুর রহমান (মামাতো ভাই), নাজমুল ইসলাম (ভাইয়ের ছেলে), মোঃ সফিকুল ইসলাম (ফুপাতো ভাই), নজরুল ইসলামসহ অনেকেই (চাচাতো ভাই) উপাচার্যের খুব ঘনিষ্ট আত্মীয়। এরা ছাড়াও মো. আনিছ, পলাশ, মো. রাজু কাজী, ইব্রাহীম মোল্লা, সুজন খানও তাঁর আত্মীয় বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব সহকারী, উপাচার্যের ভাইয়ের ছেলে সৈকত মাহমুদ চুরি করে ধরাও পড়েছেন।

নিয়োগের ক্ষেত্রে লাগামহীন অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির এমনসব চিত্র নজরে আসায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ ও খুলনা জনপদের শিক্ষাবিদেরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এবিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্টার প্রফেসর ড. এটিএম গোলাম কুদ্দুস বলেন, সবগুলো নিয়োগই যথাযথ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই হয়েছে। এখানে কোনো চাতুরির বিষয় নেই, নেই স্বজনপ্রীতি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...