12 12 12 12
দিন ঘন্টা  মিনিট  সেকেন্ড 

গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখছে এজেন্ট ব্যাংকিং


poisha bazar

  • মৃত্তিকা সাহা
  • ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৯:২৬

ব্যাংকের শাখা এখনো সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেই। এরপরও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের জনগণ পাচ্ছেন ব্যাংকিং সেবা। বর্তমানে ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মতো বিকল্প সেবার মাধ্যমে এভাবে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে। এতে গ্রামীণ জনগণ আরো বেশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে দ্রুতগতিতে সচল হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা। দেশের সুবিধা বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতেই ২০১৪ সালে চালু হয় এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম। এজন্য বাড়তি চার্জও গুণতে হয় না গ্রাহককে। ব্যাংকের ডেবিট কার্ড ব্যবহারের সুযোগও পাচ্ছেন তারা। ফলে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় এবং পরিচালন ব্যয় কম হওয়ায় এখন ব্যাংকগুলোও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে মনোযোগ দিচ্ছে। এতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে গ্রাহক সংখ্যা, সেইসঙ্গে বাড়ছে লেনদেনের পরিমাণও।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে দেখা গেছে, বিদায়ী ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ১৯টি ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে ৩৯ লাখ ৬৪ হাজার ৩৪৬ জন গ্রাহক অ্যাকাউন্ট খোলেছেন। যা আগের বছরের একই সময়ে অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা ছিল ১৭ লাখ ৭৭ হাজার ৪শ’ জন। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে গ্রাহক সংখ্যা বেড়েছে ১২৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর তিন মাসের ব্যবধানে গ্রাহক বেড়েছে ১৬ দশমিক ০৩ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রামের মানুষই ৩৩ লাখ ৮ হাজার ১৮ জন। অন্যদিকে শহর অঞ্চলের গ্রাহক রয়েছেন মাত্র ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩২৮ জন। অর্থাৎ ৮৩ শতাংশ গ্রামীণ জনগণ এজেন্ট ব্যাংকিং ব্যবহার করছেন। আলোচ্য সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের এজেন্টের সংখ্যা ছয় হাজার ৫৩১টি এবং যাদের আউটলেট রয়েছে নয় হাজার ৩৯১টি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ’১৯ শেষে এজেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে মোট স্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ১৬ হাজার ৯৮৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। যা সেপ্টেম্বর ’১৮ শেষে ছিল ২ লাখ এক হাজার ২৭৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আমানত স্থিতি বেড়েছে ২০৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ বা ৪ লাখ ১৫ হাজার ৭১০ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আলোচ্য সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে খোলা অ্যাকাউন্টের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৭ গুণ। নারী অ্যাকাউন্টধারীদের চেয়ে পুরুষ অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। তথ্য মতে, আলোচ্য সময়ে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের জন্য ২৪ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯৮ জন পুরুষ ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। আর নারীর সংখ্যা মাত্র ১৪ লাখ ৬৫ হাজার ২৪ জন।

জানা গেছে, এখন ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে ঝুঁকছে। কারণ, কোনো জায়গায় শাখা খোলতে হলে ব্যাংকের বড় খরচ চলে যায় ‘পজিশন’ নিতে। আর মাসে মাসে ভাড়া গোনার পাশাপাশি ব্যাংকের নিজস্ব স্টাফদের বেতন তো আছেই। এর বাইরে ব্যাংকের নতুন শাখা নেয়ার ঝক্কি-ঝামেলাও আছে। এসব বিবেচনায় এজেন্ট ব্যাংকিং করতে বা এজেন্ট নিয়োগ দেয়া সহজ। এক্ষেত্রে ব্যাংকের বাড়তি কোনো খরচ করতে হয় না। সংশ্লিষ্ট এজেন্টই সমস্ত খরচ বহন করেন। ফলে এতে একদিকে কোনো খরচ ছাড়াই ব্যাংকের লাভ করার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকের গ্রাহক সংখ্যাও বাড়ছে কোনো খরচ ছাড়াই। আর গ্রাহকরাও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে অ্যাকাউন্ট খুললে পাচ্ছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, গ্রামীণ সুবিধা বঞ্চিত পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে এজেন্ট ব্যাংকিং চালুর উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকগুলোর আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। সঠিকভাবে পরিচালনা করলে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রমের মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে ঘরে ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দেয়া সম্ভব হবে। এছাড়া, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংগৃহীত আমানতের অর্থের সিংহভাগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের সুযোগ করা গেলে তা গ্রামীণ অর্থনীতির চাকাকে আরো শক্তিশালী ও সচল রাখতে বিশেষ ভ‚মিকা রাখবে বলে মন্তব্য করেন তারা।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৯টি ব্যাংক এ সেবা দিচ্ছে। শহরের চেয়ে গ্রামে এজেন্ট ব্যাংকিং বেশি জনপ্রিয় হচ্ছে। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এ সেবায় শীর্ষে অবস্থান করছে বেসরকারি খাতের ডাচ-বাংলা ব্যাংক। এরপরই রয়েছে ব্যাংক এশিয়া এবং ইসলামী ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো শুধু হিসাব খোলা/ পরিচালনা করা এবং রেমিটেন্স বিতরণের মধ্যেই সীমাবব্ধ নেই বরং, ঋণ বিতরণের মাধ্যমে আয় উপার্জনকারী কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল রাখার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভ‚মিকা পালন করছে। ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর এজেন্ট ব্যাংকিং নীতিমালা জারির পর ২০১৪ সালে প্রথম এ সেবা চালু করে বেসরকারি খাতের ব্যাংক এশিয়া। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শুধু টাকা উত্তোলন বা জমাই হচ্ছে না। এর মাধ্যমে ঋণ বিতরণও হচ্ছে। গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৩০ হাজার ৫৭৯ কোটি ৪৫ লাখ টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে বিতরণ করছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ ঋণই গ্রামাঞ্চলে বিতরণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের নীতিমালা মেনেই কাজ করছে ব্যাংকগুলো।

প্রসঙ্গত, এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে হিসাব খোলা, টাকা জমা ও উত্তোলন, টাকা স্থানান্তর (দেশের ভেতর), রেমিটেন্স উত্তোলন, বিভিন্ন মেয়াদি আমানত প্রকল্প চালু, ইউটিলিটি সার্ভিসের বিল পরিশোধ, বিভিন্ন প্রকার ঋণ উত্তোলন ও পরিশোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় সরকারি সব ধরনের ভর্তুকি গ্রহণ করা যায়। এজেন্টরা কোনো চেক বই বা ব্যাংক কার্ড ইস্যু করতে পারে না। এজেন্টরা বৈদেশিক বাণিজ্য সংক্রান্ত কোনো লেনদেনও করতে পারেন না। এ ছাড়া এজেন্টদের কাছ থেকে কোনো চেকও ভাঙানো যায় না। মোট লেনদেনের ওপর পাওয়া কমিশন থেকেই এজেন্টরা আয় করেন।

এদিকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহক চলতি হিসাবে সর্বোচ্চ চার বার ২৪ লাখ টাকা নগদ জমা এবং সর্বোচ্চ দুইটি লেনদেনে ১০ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। সঞ্চয়ী হিসাবে সর্বোচ্চ ২ বার ৮ লাখ টাকা নগদ জমা এবং সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা করে দুইটি লেনদেনে ৬ লাখ টাকা উত্তোলন করতে পারবেন। তবে রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে উত্তোলন সীমা প্রযোজ্য হয় না। দিনে দুবার জমা ও উত্তোলন করা যায়। প্রতি এজেন্টকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে চলতি হিসাব থাকতে হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ পর্যন্ত ২২টি বাণিজ্যিক ব্যাংককে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনার লাইসেন্স দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৯টি ব্যাংক মাঠপর্যায়ে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ব্যাংকগুলো হলো- ব্যাংক এশিয়া, এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, মিডল্যান্ড ব্যাংক, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, এবি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক এবং ইস্টার্ন ব্যাংক। এ ছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংক ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংক শিগগিরই এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের কাজ শুরু করবে বলে জানা গেছে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...