১৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতিতে ১০ ব্যাংক


poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ৩০ জুন ২০১৯, ২১:৪০,  আপডেট: ৩০ জুন ২০১৯, ২১:৪১

ব্যাংক খাতে অব্যাহতভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। এর প্রভাবে ব্যাংকিং খাতে বাড়ছে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ। আর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাওয়ায় মূলধন ঘাটতিও বেড়ে যাচ্ছে। আমানতকারীদের অর্থ নিরাপদ রাখতে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয় ব্যাংকগুলোকে। কিন্তু দেশের সরকারি ও বেসরকারি খাতের ১০ ব্যাংক তা করতে পারেনি। এ ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি হয়েছে ১৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আন্তর্জাতিক নীতিমালার আলোকে ব্যাংকগুলোকে মূলধন সংরক্ষণ করতে হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাসেল-৩ নীতিমালার আলোকে ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের ১০ শতাংশ অথবা ৪০০ কোটি টাকার মধ্যে যেটি বেশি সে পরিমাণ মূলধন রাখতে হচ্ছে। কোনো ব্যাংক এ পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে মূলধন ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের প্রভাবে মূলধন ঘাটতি মেটাতে ব্যর্থ হয়েছে ১০টি ব্যাংক। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এসব ব্যাংকের ১৮ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি ও বিশেষায়িত খাতের ৬টি, বেসরকারি খাতের তিনটি ও বিদেশি একটি ব্যাংক রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ৮ হাজার ৮৮৪ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ৮ হাজার ৮৪৭ কোটি টাকা। ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপ জালিয়াতির অকুস্থল জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৮৮৮ কোটি টাকা। এর আগে ডিসেম্বর শেষে ঘাটতি ছিল ৫ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। হলমার্কসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে নাম আসা সোনালী ব্যাংকের ঘাটতি গত ডিসেম্বরে ৫ হাজার ৩২০ কোটি টাকা হলেও এবারে তাদের ঘাটতি কাটিয়ে উদ্বৃত্ত রয়েছে ১৩ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঋণের নামে অর্থ লুটে নেয়া বেসিক ব্যাংকের ঘাটতিও কিছুটা কমেছে। ব্যাংকটির বর্তমান ঘাটতি ২৩৬ কোটি টাকা।

গত ডিসেম্বরে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। তবে রূপালী ব্যাংকের গত ডিসেম্বর শেষে ২০ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকলেও মার্চে এসে ঘাটতি রয়েছে ১৫৪ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা ঘাটতি বেড়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির ঘাটতি ছিল ৮৮৩ কোটি টাকা। রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ঘাটতি হয়েছে ৭৩৪ কোটি। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে আইসিবি ইসলামী ব্যাংকের ১ হাজার ৫৬৯ কোটি, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের ৪৩৪ কোটি, এবি ব্যাংকের ৩৭৬ কোটি ও বিদেশি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের ঘাটতি হয়েছে ৫৪ কোটি টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের জোগান দেয়া অর্থ ও মুনাফার একটি অংশ মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো ব্যাংক মূলধনে ঘাটতি রেখে তার শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারে না। সমপ্রতি দেশের ব্যাংকিং খাতের সুদ অনেক কমেছে। খেলাপি গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে পাচ্ছেন সহজ শর্তে ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণের বাড়তি মেয়াদের সুযোগ পাচ্ছেন। তবে সেসব সুবিধা পাওয়ার পরও কমেনি খেলাপি ঋণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ছিল ৮৮ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই মূলধন ঘাটতি বাড়ে। ১০টি ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের মূলধন ঘাটতি থাকলেও কিছু ব্যাংক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাখতে সক্ষম হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো খাতে ১১ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি রয়েছে। গত বছর একই সময়ে ২৩ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকার মূলধন ঘাটতি ছিল।

এদিকে, সংশোধিত ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, বছরের পর বছর কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি থাকতে পারবে না। আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত মেনে নেবে। ২ বছরের পর মূলধন ঘাটতি হলে ওই ব্যাংককে হয় মার্জার অর্থাৎ অন্য কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত হয়ে যেতে হবে, অথবা বন্ধ হয়ে যাবে। এ কারণে কোনো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি হলে, তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে কীভাবে মূলধন ঘাটতি পূরণ করবে তার পরিকল্পনা জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ে সময়ে তা মনিটরিং করবে। এভাবে দুই বছর পর আইন অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি বেড়ে যাওয়া মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এটা সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাই ফুটে উঠেছে। এর ফলে শুধু ব্যাংকিং খাতে নয়, পুরো অর্থনীতিতেই বিপর্যয় নেমে আসবে। বিদেশি বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে ঘাটতির মুখে পড়া ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বিদেশি ব্যাংকগুলো লেনদেন করতে আস্থার সঙ্কট দেখা দেয়। এতে পণ্য আমদানি-রফতানিতে গ্যারান্টি হিসেবে তাদের বাড়তি ফি দিতে হয়, যার প্রভাবে ব্যবসা ব্যয় বেড়ে যায়। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি ও লুটপাটের দায় জনগণের ঘাড়েও চাপানো হচ্ছে। কেননা, দুর্নীতির দায় মেটানো হচ্ছে জনগণের অর্থ দিয়ে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়লে মূলধন ঘাটতি বাড়বেই। রাষ্ট্রীয় মালিকানার অনেক ব্যাংক বিনিয়োগের গুণগত মান যাচাই-বাছাই না করেই নানান প্রেক্ষাপটের কারণে ঋণ বিতরণ করেছে। যা পরবর্তীতে ব্যাংকের জন্য বোঝা হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে রূপান্তরিত হয়েছে। ফলে ব্যাংকের সংরক্ষিত মূলধন ঘাটতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে প্রতি বছর অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে খেলাপি ঋণ আদায়ে আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেয়া উচিত।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক বছর সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক, বেসিক এবং জনতা ব্যাংকসহ বড় বড় ঋণ কেলেঙ্কারি হয়েছে। ওই সব ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকের খাতায় মন্দঋণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। কিন্তু এসব মন্দঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকগুলোর ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে গেছে। এ সম্পদের বিপরীতে মূলধন সংরক্ষণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো।

অন্যদিকে, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় ব্যবসাবাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে ব্যবসায়ীরা ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এতে বেড়ে গেছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ার অর্থই হলো ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ বেড়ে যাওয়া।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ

 




Loading...
ads





Loading...