আমার লেখালেখির সূত্রই সাংবাদিকতা: রাহিতুল ইসলাম


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:২১

সাধারণত আমরা যখন কোনো গল্প বা উপন্যাস পড়ি, তখন লেখকের কল্পনা আর লেখার কৌশলের সঙ্গে আমাদের কল্পনা মিশিয়ে নিয়ে সেটির ভালো–মন্দ মূল্যায়ন করি। কিন্তু রাহিতুল ইসলাম লেখক হিসেবে একটু ব্যাতিক্রম। তিনি সাধারণত সত্য ঘটনা অবলম্বনে তার বই লিখেন, যে কারণে পাঠক কেবল একটি চরিত্র সম্পর্কেই জানেন তা নয়। এও জানেন যে এই দেশের কোনায় কোনায় কত গল্প লুকিয়ে আছে। গল্পটা প্রেমের হোক কিংবা বিচ্ছেদের; সাফল্যের হোক কিংবা প্রতিকূলতার রাহিতুল ইসলামের লেখায় বরাবরই বিশেষভাবে ফুটে ওঠে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ভিন্ন ভিন্ন দিকের কথা। তার উপন্যাসে নায়ক-নায়িকার মতো আইসিটি শিল্পও সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকে। রাহিতুলের লেখার উপজীব্য কখনো চরের শিক্ষক, কখনো কল সেন্টারের অপরাজিতাদের, কখনো ফ্রিল্যান্সিং ক্যারিয়ার, আবার কখনো টেলিমেডিসিন সেবা ও ই-কমার্স ব্যবসা। বিষয় নির্বাচনে এভাবেই বছরের পর বছর নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে চলেছেন এসময়ের জনপ্রিয় তরুণ এ সাহিত্যিক রাহিতুল ইসলাম। জয় করে যাচ্ছেন পাঠকদের মন। সম্প্রতি লেখালেখি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কথা বলেছেন মানবকন্ঠের সঙ্গে—

লেখালেখিতে কিভাবে এসেছেন? এ পর্যন্ত আপনার কতটি বই প্রকাশ হয়েছে?
রাহিতুল ইসলাম: ২০০৯ সাল থেকে তথ্যপ্রযুক্তি সাংবাদিকতা করতে এসে দেখলাম, এ শিল্পখাত নিয়ে মানুষের মধ্যে খুব একটা সচেতনতা তৈরি হয়নি। তাই তখন থেকেই আমি এ বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করি। তবে আমার জীবনে ও লেখালেখির পেছনে সাবেক বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান স্যার ও কবি রফিক আজাদের অনেক ভূমিকা রয়েছে। এ পর্যন্ত আমার প্রায় ১১টির মতো বই প্রকাশিত হয়েছে। যার মধ্যে ‘আউটসোর্সিং ও ভালোবাসার গল্প’, ‘চরের মাস্টার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার’, ‘কেমন আছে ফ্রিল্যান্সার নাদিয়া?’, কল সেন্টারের অপরাজিতা, ফ্রিল্যান্সার সুমনের দিনরাত ‘হ্যালো ডাক্তার আপা’ ও ‘ভালোবাসার হাট-বাজার’ উপন্যাস বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতের গল্পগুলো আপনার লেখায় উঠে আসে, কেমন সাড়া পাচ্ছেন তাতে?
রাহিতুল ইসলাম: আমার গল্পগুলো বাস্তব ও জীবনঘনিষ্ঠ। যেমন ধরুন, কিছুদিন আগের কথাই বলি, টাঙ্গাইলের মধুপুর বনাঞ্চলের গায়রা গ্রামের কথা। সেখানকার গ্রামগুলোয় বসবাস করে গারো ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা। অবাক করা বিষয় হলো, এ এলাকার বেশকিছু তরুণ-তরুণী ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করেন। অর্থাৎ এ বনাঞ্চলে বসেই তারা বিদেশের গ্রাহকদের কাজ করে দিচ্ছেন। আয় করছেন ডলারে। কিন্তু তাদের কাজের প্রধান সমস্যা ধীরগতির ইন্টারনেট। এ নিয়ে প্রথম আলোর প্রথম পাতায় একটি বিশেষ প্রতিবেদন ও ধারাবাহিক কিছু প্রতিবেদন প্রকাশের পর ঢাকার ইন্টারনেট সংযোগদাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাম্বার আইটি মধুপুর উপজেলার গায়রা গ্রামে দ্রুত গতির (ব্রডব্যান্ড) ইন্টারনেট সংযোগ দিয়েছে, গ্রামীণফোন সেখানে একটি টাওয়ার বসিয়েছে, সরকার একটি ল্যাব ও ল্যাপটপ উপহার দিয়েছে। এখন মধুপুরের প্রায় ৪০টি গ্রাম ডিজিটাল হচ্ছে। একটি লেখায় যে কতটা শক্তি থাকে, সেটা ইতোমধ্যে প্রমাণ পেয়ে গেছেন। আমার যে লেখাগুলো পাঠক গ্রহণ করে বা সাড়া ফেলে, আমি সেটির বর্ধিত অংশকে পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ করি। তখন পাঠক ভালোবেসে সেই গল্পগুলো আপন করে নেয়।

rahitul 2

আপনার উপন্যাস অবলম্বনে বেশকিছু টেলিছবি নির্মিত হয়েছে, দর্শকের রেসপন্স কেমন?
রাহিতুল ইসলাম: আমার উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ হয়েছে ‘আউটসোর্সিং ও ভালোবাসার গল্প’। এতে অভিনয় করেছেন আফরান নিশো ও তানজিন তিশা। এ উপন্যাস থেকেই বাংলাদেশের সাড়ে ৬ লাখ ফ্রিল্যান্সার স্বীকৃতি পেয়েছে। ‘চরের মাস্টার কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি হয়েছে টেলিফিল্ম ‘চরের মাস্টার’। এতে অভিনয় করেছেন খায়রুল বাশার ও সাফা কবির। উপন্যাসটির মতো টেলিফিল্মটিও ভীষণ প্রশংসা কুড়িয়েছিল দর্শকমহলে। এবার ‘কেমন আছে ফ্রিল্যান্সার নাদিয়া?’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘ফ্রিল্যান্সার নাদিয়া’। এতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী। নারীর ক্ষমতায়নের ওপর নির্মিত এ টেলিফিল্মের একটি বিশেষ দৃশ্যে অভিনয় করেছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। তা ছাড়া একটি দৃশ্যে আমাকেও দেখা যাবে। আশা করছি, টেলিছবিটি দর্শকদের যেমন সাহস জোগাবে, তেমনই কাঁদাবেও।

সাহিত্যে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সফলদের তুলে আনছেন, এ নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
রাহিতুল ইসলাম: ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আকাশ ছোঁয়ার! মনে হচ্ছে, কিছুই তুলে ধরতে পারিনি এখনো। এখনো অনেক কিছু করার বাকি। তবে একটা বড় কাজ আসছে, যেটা বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দলিল হতে যাচ্ছে। বইয়ের নাম ‘তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নায়কেরা’। বইটি তাদের নিয়ে, যাদের আমরা ভুলে যাচ্ছি বা যতটুকু সম্মান পাওয়ার কথা; তাদের ততটুকুও দিতে পারছি না। আজ চার বছর ধরে এই একটি বই নিয়ে কাজ করছি। এটাই আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলতে পারেন।

যতদূর জানি, আপনার বইয়ের রয়্যালিটির টাকা সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝে দান করেন। এ বিষযে যদি কিছু বলতেন?
রাহিতুল ইসলাম: আসলে এটা বলার মতো কিছু নয়। যেই সেক্টর নিয়ে আমি লিখি, বইয়ের প্রথম রয়্যালিটির টাকাটা সেই সেক্টরের সুবিধাবঞ্চিতদের মাঝেই দেই। বই তো সারা বছর বিক্রি হবে। আমি মনে করি, প্রথম রয়্যালিটির টাকাটা দিয়ে দিলে ক্ষতি নেই। এতে যদি কারো উপকার হয়। কেমন যেন একটা শান্তি অনুভব করি। তা ছাড়া এবার প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আমার ‘কল সেন্টারের অপরাজিতা’ উপন্যাসটি বইমেলায় প্রথমার বেস্ট সেলার হিসেবেও ছিল। এ বইয়ের প্রথম রয়্যালিটির টাকাও সুবিধাবঞ্চিতদের সাহায্যার্থে দেয়া হয়েছে।

আমরা বিভিন্ন খবরে দেখেছি 'কল সেন্টারের অপরাজিতা' উপন্যাসের রয়্যালটি থেকে অনুদান দেয়া হয়েছে দুজনকে এই গল্পটি জানতে চায়?
রাহিতুল ইসলাম: আসলে চলতি বছরের শুরুতে প্রকাশনা সংস্থা প্রথমা থেকে প্রকাশিত হয় আমার উপন্যাস 'কল সেন্টারের অপরাজিতা' যেখানে উঠে এসেছে একটি মেয়ের জীবনের নানা সংগ্রামের কথা। বরাবরই আমার বইয়ের প্রথম রয়্যালটির অর্থ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য ব্যয় করে থাকি। সেই ধারাবাহিকতায় 'কল সেন্টারের অপরাজিতা' উপন্যাস থেকে প্রাপ্ত প্রথম রয়্যালটি ৫০ হাজার টাকা প্রথম আলো ট্রাস্টকে অনুদান হিসেবে দিয়েছি। অনুদানের অর্থ থেকে প্রথম আলো ট্রাস্ট দুজনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করেছে। অনুদানের অর্থ থেকে চিকিৎসা সহায়তা পেয়েছে নাটোরের মেয়ে সানজিদা আক্তার, যিনি গত বছরের নভেম্বরে অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হন। প্রথম আলো ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে তার চোখের চিকিৎসা চলছে। রয়্যালটির বাকি ১৫ হাজার টাকা পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মো. শাহিন আলম। তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মাস্টার্সের ছাত্র। শাহিন আলম তার মতো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের অনলাইনে মাইক্রোসফট অফিসের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। দেশ–বিদেশ থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা তাঁর কাছে এই প্রশিক্ষণ নেন। নির্বিঘ্নে প্রশিক্ষণের জন্য শাহিন আলমের একটি জুম আইডি প্রয়োজন। 'কল সেন্টারের অপরাজিতা' থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটির অংশ থেকে তার জুম আইডিটি এক বছরের জন্য কিনে দেয়া হয়েছে, যাতে তিনি তার কাজটি চালিয়ে যেতে পারেন।

পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে কি লেখালেখির অন্তরায় মনে হয়েছে কখনো?
রাহিতুল ইসলাম: তা মনে হয়নি বরং সাংবাদিকতা বরাবরই আমার লেখালেখির সহায়ক ছিল। সাংবাদিকতা করতে গিয়ে যে গল্পগুলো গভীর থেকে বের করে বড় আকারে তুলে ধরছি, সে গল্পগুলো থেকে পরবর্তীতে বই করেছি। আমার কাছে মনে হয়, আমার লেখালেখির সূত্রই সাংবাদিকতা।

আপনার এবং মানবকন্ঠের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলতে চান?
রাহিতুল ইসলাম: প্রথমেই ধন্যবাদ জানাব আমার প্রিয় পাঠকদের। কারণ, তারা বই পড়েন, বই কেনেন, যে কারণে আমি বইয়ের প্রথম রয়্যালটির টাকাটি সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের দিতে পারি। আমি তথ্যপ্রযুক্তি খাতের গল্পগুলো লিখে যাব। সহজ ও সরলভাবে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এ অনুপ্রেরণার গল্পগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব। আর মানবকন্ঠের পাঠকদের বলবো, আপনারা গল্পগুলো পড়বেন বা পর্দায় দেখবেন, আশা করি ভালো লাগবে। ধন্যবাদ মানবকন্ঠকে।


poisha bazar