দীপনপুরের ব্যতিক্রমী আয়োজন


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১৪ অক্টোবর ২০২১, ২১:৫৬

‘দীপনপু’র নাম শুনলেই মানুষের চিন্তায় চলে আসে বুকশপের কথা। কিন্তু দীপনপুর শুধু বই বিক্রিতেই সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক আন্দোলন থেকে শুরু করে শিশুদের নিয়ে বিভিন্ন কাজ করছেন। এবার প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ব্যতিক্রমী আয়োজন করলো এই প্রতিষ্ঠানটি। দীপনপুর এর আয়োজনে ইউনেস্কো তত্ত্বাবধানে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শারীরিক-মানসিক ও উত্সাহ প্রদান বিষয়ক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ও গাইডলাইন প্রণয়ন কর্মশালা। এই কর্মশালাটি স্মাইলিং চিলড্রেন স্পেশাল স্কুলে অনুষ্ঠিত হয় । অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধী শিশুদের সুরক্ষা কার্যক্রমের সাথে সম্পৃক্ত অভিভাবক, শিক্ষক ও সেবাপ্রদান কারী ব্যক্তি।

সমাজের বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের কথা বিবেচনা করে দীপনপুর এই প্রশিক্ষণগুলি তাদের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দেয়ার কথা চিন্তা করে। ইউনেস্কোর আওতাধীন হবার সৌভাগ্য অর্জন করতে পেরে দীপনপুর গর্বিত। তবে কোভিডকালীন প্রতিকূল সময়ে এসব কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া বিলম্বিত হয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে একবছর মেয়াদি এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ২ দিন ব্যাপী কর্মশালার আয়োজন হয় ১১ ও ১২ অক্টোবর।

প্রথমদিন আয়োজনে ছিলো সেমিনার। সেমিনারের বিষয়- প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শারীরিক- মানসিক ও উত্সাহ প্রদান বিষয়ক প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ও গাইডলাইন প্রনয়ন। সেমিনার শুরুর পূর্বে ৫০ জন অংশগ্রহণকারী এই কর্মশালায় নিবন্ধন করেন। তাদের প্রত্যেককে মুূদ্রিত ট্রেনিং ম্যানুয়াল ও গাইডলাইন বিতরন করা হয়।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন দীপনপুরের নির্বাহী পরিচালক ডা. রাজিয়া রহমান জলি। তিনি দীপনপুর প্রতিষ্ঠার ইতিহাস তুলে ধরে ইউনেস্কোর সাথে এই প্রকল্পের সম্পৃক্ততা বিশ্লেষণ করেন এবং অংশগ্রহণকারীদের উদ্দীপিত করেন তাঁর উত্সাহব্যঞ্জক বক্তৃতায়।এরপর এই প্রকল্পের কনসালটেন্ট জনাব মো. আশরাফ আলী মজুমদার প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল ও গাইডলাইন প্রনয়নের উদ্দেশ্য বিশদভাবে উপস্থাপন করেন।

তার বক্তব্যের সমান্তরালেই অংশগ্রহণকারীরা ম্যানুয়ালে উল্লেখিত তত্ত্ব ও তথ্যগুলি যাচাই করে তাদের মতামত পেশ করেছেন এবং তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন আশরাফ। এই পর্ব শেষ হলে বক্তব্য প্রদান করেন সেমিনারের মূল আলোচক ডা. সানজিদা শাহরিয়া (কাউন্সিলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার,ফিনিক্স ওয়েলফেয়ার সেন্টার বাংলাদেশ)।

বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিদের দিকনির্দেশনায় তিনি কিছু মুল্যবান বিষয়ে আলোকপাত করেন। অটিজমের ব্যবস্হাপনায় জনসচেতনতা বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নির্মাণের ওপর তিনি জোর দেন। এরপর ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে আগত, সেমিনারের বিশেষ অতিথি ফারহানা ইয়াসমিন জাহান (বিসিএস- জেনারেল এডুকেশন, সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার,বাংলাদেশ ন্যশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কো) শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের শিক্ষা জীবনে ইউনেস্কোর পদক্ষেপ ও আগ্রহ তিনি তুলে ধরেন।

সেমিনারের প্রধান অতিথি জাকিয়া রহমান (প্রভাষক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) এরপরে ভাষন দেন। স্কুল সাইকোলজিতে তিনি বিশেষজ্ঞ বিধায় উপস্থিত শিক্ষক ও অভিভাবকদেরকে তিনি শিশুর মনো-দৈহিক গঠনে কার্যকর ভুমিকা রাখার জন্য সুপরামর্শ প্রদান করেন এবং বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের জন্য বিশেষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি মনে করেন সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমেই কেবল এই শিশুদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো সম্ভব। উন্নত বিশ্ব এই ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে, বাংলাদেশকেও পিছিয়ে পড়লে চলবেনা কারণ এ ধরনের শিশুর সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছে।

ওনার বক্তব্যের পর ইউনেস্কোর প্রোগ্রাম অফিসার (এডমিন ও ফিন্যান্স) শেখ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শুভ উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের সাথে কিছু তথ্য ও অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। এ ধরনের সেমিনার আয়োজনের জন্য তিনি দীপনপুর এবং স্টাইলিং চিলড্রেন স্পেশাল স্কুল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। সবশেষে সেমিনারের সভাপতি মাহমুদা আকতার (প্রতিষ্ঠাতা প্রিন্সিপাল, স্মাইলিং চিলড্রেন স্পেশাল স্কুল) সকলের উদ্দেশ্যে ধন্যবাদ জ্ঞপন করে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন। সেমিনার শেষে অতিথিবৃন্দ স্কুলটির বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেন এবং স্কুল কর্তৃপক্ষের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে মত বিনিময় করেন।

কর্মশালার ২য় দিন একই ভেন্যুতে অংশগ্রহণকারী অভিভাবক, শিক্ষক ও সেবা প্রদানকারীদের মাঝে প্রকল্পের জন্য ডিজাইনকৃত লিফলেট ও পোস্টারের খসড়া বিতরণ করা হয় এবং এগুলির নানাদিক নিয়ে গঠমমুলক একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন স্মাইলিং চিলড্রেন স্পেশাল স্কুলের প্রিন্সিপাল মাহমুদা আকতার। দীপনপুরের পক্ষ থেকে পোস্টার ও লিফলেট সংক্রান্ত ফিডব্যাক গ্রহন করার জন্য উপস্থিত ছিলেন নির্বাহী পরিচালক ডা. রাজিয়া রহমান জলি এবং প্রকল্প কনসালটেন্ট মো. আশরাফ আলী মজুমদার।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন স্কুলের চেয়ারম্যান আর. কে. ফারুকী নজরুল। তিনি তার শুভেচ্ছা বক্তব্যে এই স্কুলের মত প্রতিষ্ঠানগুলির সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। সবশেষে সভাপতি মাহমুদা আকতার তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে সকলকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে আন্তরিক আবেদন জানান।

প্রতিবন্ধী শিশুদের আশ্রয় হিসেবে স্মাইলিং চিলড্রেন স্পেশাল স্কুলের মত আরও অনেক প্রতিষ্ঠান সারাদেশে তৈরী হওয়া জরুরী। দীপনপুরের মত আরও অনেককে সহযোগিতামুলক মনোভাব নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের পাশে দাঁড়ানো উচিত।

বিশেষ শিশুদের জন্য সুন্দর হোক আগামী দিনের পৃথিবী। ইউনেস্কোর এই প্রোগ্রামের আরও কয়েকটি ধাপ রয়েছে যেগুলি সফলভাবে সম্পন্ন করতে বদ্ধপরিকর দীপনপুর। দীপনপুরপর শ্লোগান- ' আলোকের এই ঝরনাধারায় ধুইয়ে দাও'। আলোর শক্তি থেকে প্রতিবন্ধী শিশুরাও যেন বাদ না পড়ে সেই লক্ষ্যে পরিচালিত হোক আমাদের সমাজ।


poisha bazar

ads
ads