‘গাহি সাম্যের গান...’

জাতীয় কবির প্রয়াণ দিবস আজ


  • এস এম মুন্না
  • ২৭ আগস্ট ২০২১, ১২:১২

বিশ্বে এমন ক’জন আছেন যিনি প্রেমের টানে রক্তের সম্পর্কে অস্বীকার করে পথে বেরিয়ে পড়তে পারেন। তিনি হলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার গান ও কবিতা ছিল প্রেরণার উৎস। শত শত জনপ্রিয় গানের রচয়িতা ও সুরস্রষ্টা তিনি। তার রচিত ‘চল্ চল্ চল্!/ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল’ আমাদের রণসঙ্গীত।

আজ ১২ ভাদ্র। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রয়াণ দিবস। ৪৫ বছর আগে এই দিনে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল) ৭৭ বছর বয়সে এই মহৎপ্রাণ কবির জীবনাবসান ঘটে। বাংলা সাহিত্যে তার অবদান অসামান্য।

জীবদ্দশায় তিনি সর্বদা হিন্দু-মুসলমান মিলনের গান গেয়েছেন। বিদ্রোহী কবির মর্যাদা পেলেও তিনি ছিলেন মূলত প্রেমের কবি। তিনি ছিলেন কর্মে ও চিন্তায় স্বাধীন। দাসত্বের বন্ধনমুক্তি ও প্রাচীন সংস্কারের শৃঙ্খল ভঙ্গ করার সংগ্রামে উচ্চকণ্ঠ। তার সৃজনশীল কর্মে এসব প্রকাশ পেয়েছে পরতে পরতে। তার কাব্যের বাণী, গানের কথা কিংবা ক্ষুরধার লেখনী বুলেটের চেয়ে শক্তিশালী ছিল।

দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। বাবা কাজী ফকির আহমদ ও মা জায়েদা খাতুন। তার ডাক নাম দুখু মিয়া।

বাংলা সাহিত্যে নজরুল এসেছেন অন্যায়-অসাম্যের বিরুদ্ধে চরম বিদ্রোহ নিয়ে। মাত্র ২৩ বছরের সাহিত্যজীবনে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন পর্যন্ত বিপুল প্রেরণা জুগিয়েছে তার গান, রচনাবলি ও কবিতা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত।

জন্মস্থান ভারতের বর্ধমান হলেও বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তার। কৈশোরের একটা পর্যায় কেটেছে ময়মনসিংহের ত্রিশালের দরিরামপুরে। কুমিল্লায় কবির শ্বশুরবাড়ি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কেটেছে তার আনন্দ-বেদনার অনেক দিন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার কাছে সমান প্রিয় তিনি। অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে তিনি লিখে গেছেন অবিরাম।

বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে তার অজস্র কবিতা, বাংলা গানের জগৎকে গীত সুধারসে ভরিয়ে দিয়েছে তার গানের কলি, তাতে যোগ করেছে নতুন মাত্রা ও স্বাদ। গান ও কবিতার মাধ্যমে তিনি অবহেলিত-বঞ্চিত মানুষের পাশে যেমন দাঁড়িয়েছেন, তেমনি বিরল শিল্প সুষমায় ভরিয়ে তুলেছেন বাঙালির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে।

প্রজন্ম পরম্পরায় এই কবির জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা এখনো আকাশচুম্বী। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়েও তিনি কখনো আপস করেননি। মাথা নত করেননি লোভ-লালসা, খ্যাতি, অর্থ-বিত্ত ও বৈভবের কাছে। ‘চির উন্নত মম শির’ বলে আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন।

কবি নজরুল ধ্যানে-জ্ঞানে, নিঃশ্বাসে-বিশ্বাসে, চিন্তাচেতনায় ছিলেন পুরোদস্তুর অসা¤প্রদায়িক মানবতাবাদী। কবিতায়, গানে, গদ্যে সর্বত্র তার এই উদার দৃষ্টিভঙ্গি উৎকীর্ণ। শোষিত বঞ্চিত মানুষকে তিনি উদ্বুদ্ধ করেছেন সাম্য ও ন্যায়ের বন্ধনে এক হয়ে শোষণ, বঞ্চনা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হতে। তাই কবি গেয়েছেন- ‘গাহি সাম্যের গান/মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান’।

১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১ ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভ‚ষিত করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। জাতীয় কবির প্রয়াণ দিবসে আজ নানা কর্মসূচি নেয়া হয়েছে।

তবে করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীর কারণে দর্শকসমেত কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে না। আজ বাদ ফজর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে কোরআনখানি, শোভাযাত্রা, সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও ফাতেহা পাঠ করা হবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন ও এফএম রেডিও স্টেশন অনুষ্ঠানমালা স¤প্রচার করবে।

 


poisha bazar

ads
ads