শঙ্খ ঘোষের জীবনাবসান


  • অচিন্ত্য চয়ন
  • ২২ এপ্রিল ২০২১, ০৯:২৩

লেখো আয়ু লেখো আয়ু/ চুপ করো, শব্দহীন হও- নিজেই আয়ুর কথা বললেও বাড়িয়ে লিখতে পারেননি নিজের আয়ু। নিজেই চুপ হয়ে বিদায় নিলেন, চিরবিদায়- তারার দেশে চলে গেলেন কবি শঙ্খ ঘোষ।

রবীন্দ্রনাথ-জীবনানন্দ পরবর্তী সময়ে বাংলা আধুনিক কবিতার পঞ্চপাণ্ডবের অন্যতম পাণ্ডব ছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। শক্তি-সুনীল-শঙ্খ-উৎপল-বিনয়, জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতার এই পঞ্চপাণ্ডবের বাকি চারজন চলে গিয়েছিলেন আগেই। বুধবার চলে গেলেন শঙ্খ ঘোষও। স্তব্ধ কবিতার মুহূর্ত। প্রয়াত কবিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানিয়েছেন রাজ্য সরকার। শুধু বাদ রেখেছেন তোপধ্বনি।

কারণ, কবি তা পছন্দ করতেন না। ‘শব্দহীন হও, শষ্পমূলে ঘিরে রাখো আদরের সম্পূর্ণ মর্মর...’ লিখেছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। আসল নাম ছিল চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তাই বিদায়বেলায় শব্দহীন রাখা হল। এটা অবশ্য সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। অগ্রাধিকর দেয়া হয়েছে কবির ইচ্ছাকে। আর তার মধ্য দিয়েই ‘দিনগুলি রাতগুলি’, ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’ থেকে ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’, ‘কবির অভিপ্রায়’ তার সৃষ্টি বাংলা সাহিত্য জগতে অমর সম্পদ হয়ে থেকে যাবে।

তিনি এক অন্যরকম চিন্তা-চেতনার মানুষ ছিলেন। শঙ্খ ঘোষ কবিতা লিখে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল। গদ্য আর পদ্য সাহিত্যের দুই ভাগেই নিজের ছাপ রেখে চলে গেলেন তারার দেশে। কারো কাছে অভিভাবকসম। কারো কাছে অগ্রজের সমান।

তবে সকলেই একমত, বাংলা সাহিত্যের এক মহীরুহের শিকড় উপড়ে গিয়েছে। শব্দের জগতে ঘটেছে ছন্দপতন। বাংলা সাহিত্যের একটা যুগ যেন হঠাৎই স্তব্ধ হয়ে গেল। করোনা কেড়ে নিল আরো এক নক্ষত্রকে। সত্যি তো, আকাশের নক্ষত্রের স্থানেই তো আজ থেকে দেখা মিলবে প্রিয় কবি শঙ্খ ঘোষের। বিপ্লব ছিল রক্তে। যা ঝলকে পড়ত লেখায়।

কবির লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হতো তরুণ সমাজ। পেত এক নতুন বল। ওপার বাংলা নয়- বাংলা কাব্য সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল কবি শঙ্খ ঘোষ আর নেই। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টায় কলকাতায় নিজ বাড়িতে ঘুমের মধ্যেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

বেশ কয়েক দিন ধরেই করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাড়িতেই নিভৃতবাসে ছিলেন তিনি। পাশাপাশি, বার্ধক্যজনিত কারণেও শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন কবি। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বাড়িতেই করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন শঙ্খ ঘোষ। তার সংক্রমিত হওয়ার খবরে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এসেছিল বাংলা সাহিত্যজগতে। মঙ্গলবার রাত থেকেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। বুধবার সকালে কবিকে ভেন্টিলেটরে দেয়া হলেও চিকিৎসকদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। সব আশঙ্কাকে সত্যি করে বুধবার শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন কবি। তার প্রয়াণে তাই আজ শব্দের জগতে গভীর শূন্যতা। থেমে গেল কলম, আধুনিক কবিতার অন্যতম জনক শঙ্খ ঘোষ এখন তারার দেশে। কবির চলে যাওয়াই বাংলা সাহিত্যের যে ক্ষতি হলো তা পূরণের নয়।

বর্ষীয়ান ওই কবির মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি শোকবার্তায় বলেন, ‘শঙ্খ দার মৃত্যুতে শোক জ্ঞাপন করছি। তার পরিবার এবং শুভানুধ্যায়ীদের সবাইকে সমবেদনা জানাই।’

এ ছাড়া কবি শঙ্খ বাবুর মৃত্যুতে শোকাহত বাংলার সাহিত্য ও নাট্যজগত। নাট্যকার কৌশিক সেন গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণ বাঙালির সাহসের আর এক নাম শঙ্খ ঘোষ। কোনো দিনই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত করেননি।

নাট্যব্যক্তিত্ব রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত বলেন- ‘সমাজের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বক্তা ছিলেন শঙ্খ দা। শাসকের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বদা স্পষ্ট বক্তা ছিলেন তিনি। নাট্যকার বিভাস চক্রবর্তী বলেন, তার কবিতা বাঙালির সামাজিক শেকড়ে গাঁথা। কোনোদিনই মেরুদণ্ডহীন ছিলেন না তিনি। প্রকৃত অভিভাবককে হারালাম। তার ব্যক্তিত্ব পরিচিতি এক অন্য মাত্রা ছুঁয়েছিল।’

বুধবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবির শেষকৃত্য করা হয়। তবে কবির শেষ বিদায়ের সময় তোপধ্বনি করা হয়নি। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার কবিকে শেষ সম্মান জানানো হলেও ‘গান স্যালুট’ বাদ রাখা হয়। কারণ, তোপধ্বনি পছন্দ করতেন না কবি। পাশাপাশি, কবির পরিবারের ইচ্ছানুযায়ী আড়ম্বরহীনভাবেই তাকে শেষ সম্মান জানানো হয়েছে।

প্রায় দু’দশকের ফারাক দুজনের মধ্যে। তবে শঙ্খ ঘোষ শুধু অভিভাবকই ছিলেন না তার কাছে, ছিলেন অগ্রজ সমান। তার প্রয়াণে ‘নিঃস্ব’ হলেন কবি জয় গোস্বামী। শঙ্খ ঘোষের প্রয়াণে শুধু বাংলা সাহিত্যজগতই নয়, ব্যক্তিগতভাবে তার অপূরণীয় ক্ষতি হল-এমন কথাই জানিয়েছেন জয়। সে খবর পেয়েই শোকস্তব্ধ হয়ে যান শঙ্খ ঘোষের ‘শিষ্য’ জয়।

সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যজগতে মহা বটবৃক্ষের পতন ঘটল। তরুণ কবি এবং লেখকদের মাথার ওপর পিতা এবং অভিভাবকস্বরূপ বিরাজ করছিলেন উনি। জাতির বিবেক হিসেবে ছিলেন। মাথার ওপর থেকে সেই আশ্রয় সরে গেল। নিঃস্ব হলাম।’

জয়ের কথায়-‘আমার কী হারাল তা, আমিই জানি। আর বাংলা সাহিত্যজগত কী হারাল, তা যত দিন যাবে, ততই বুঝবে সকলে।’

রাশভারী হলেও শঙ্খের কাছে যেতে, তার পরামর্শ পেতে বাধা পাননি কেউ। গতকাল কবির প্রয়াণের পর এমনটাই প্রতিক্রিয়া তার অনুরাগীদের। তার মধ্যে শঙ্খের অনুজপ্রতিম কবি-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে সাহিত্যের শাখায় বিচরণকারীরাও রয়েছেন। সকলেই একমত, শঙ্খের উপস্থিতিতে সব সময়েই ভরসার আশ্বাস ছিল। বিদ্রোহ থেকে শুরু করে প্রেমের অনুভূতি, শব্দকে হাতিয়ার করে সবকিছুতেই অনায়াস বিচরণ করেছেন তিনি। প্রতিবাদকে ভাষায় ফোটাতে কলমকে সঙ্গী করেছেন। সে ভাষায় কথা বলেছেন অগণিত মানুষ।

বাংলা আধুনিক কবিতার পঞ্চপাণ্ডব ছিলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, উৎপল কুমার বসু এবং শঙ্খ ঘোষ। প্রথম চারজনকে আমরা আগেই হারিয়েছি। আর এবার শঙ্খ ঘোষের বিদায় শেষে হয়ে গেল সাহিত্যের একটা যুগের। ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘উর্বশীর হাসি’, ‘ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ কবি উপহার দিয়েছেন পাঠককে।

কবিতার পাশাপাশি গদ্যও লিখতেন তিনি। আসলে গদ্য হোক বা পদ্য, শঙ্খ ঘোষের প্রতিটি রচনায় থাকত এক অনন্য রসবোধ, বৈদগ্ধতার পরিচয়। যা পাঠকের মনকে শান্ত করে। নতুন করে ভাবতে শেখায়। সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসার জন্ম দেয়।

দেশভাগের সময় গর্জে উঠেছিল কবির কলম। তারপর বাংলা যখন ধীরে ধীরে শান্ত হচ্ছে তখনও থেমে থাকেনি তা। একটার পর একটা কালজয়ী কবিতা উপহার দিয়েছেন পাঠকদের। মধ্যবিত্ত বাঙালির মনন তার মতো করে আর কেউ ফুটিয়ে তুলতে পারেননি। সাধারণের নিজেকে নিয়ে দ্বন্দ্ব, আলো-অন্ধকারে ঘেরা জীবন, প্রবঞ্চনা-ভালোবাসার চেনা ছকই অচেনা হয়ে ধরা দিত তার সৃষ্টিতে।

বর্ষীয়ান কবি শঙ্খ ঘোষ জন্ম গ্রহণ করেন ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলাভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক পাস করেন। তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন অধ্যাপনাকে। শিয়ালদহের বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের প্রিয় ছিলেন শঙ্খ বাবু।

তার সাদামাটা জীবনে চিরকালই প্রচারবিমুখ ছিলেন তিনি। কবিতা লিখে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধেও গর্জে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের এই দিকপাল। বাংলা কবিতাজগতে শঙ্খ ঘোষ এক প্রবাদপ্রতিম নাম। অনুবাদ সাহিত্যেও তার অবদান অবিস্মরণীয়।

‘দিনগুলি রাতগুলি’, তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আছে ‘বাবরের প্রার্থনা’, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’, ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’। তিনি ছিলেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন রবীন্দ্রবিশেষজ্ঞ। ‘হাতের উপর হাত রাখা খুব সহজ নয়/ সারা জীবন বইতে পারা সহজ নয়/ এ কথা খুব সহজ, কিন্তু কে না জানে/ সহজ কথা ঠিক ততটা সহজ নয়’- প্রবাদ হয়েই থেকে যাবে শঙ্খ ঘোষের লেখা এই পঙ্ক্তিগুলো।

তাই তো বহু মানুষ চেয়েছেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু সেটা করা যাচ্ছে না পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে। বুধবার দুপুরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় নিমতলা মহাশ্মশানে কবির শেষকৃত্য করা হয়। তবে কবির শেষ বিদায়ের সময় তোপধ্বনি করা হয়নি। পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদার কবিকে শেষ সম্মান জানানো হলেও ‘গান স্যালুট’ বাদ রাখা হয়। কারণ, তোপধ্বনি পছন্দ করতেন না কবি।

দীর্ঘ সাহিত্যজীবনে একাধিক সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ‘বাবরের প্রার্থনা’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য তিনি সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান ১৯৭৭ সালে। ১৯৯৯ সালে কন্নড় ভাষা থেকে বাংলায় ‘রক্তকল্যাণ’ নাটকটি অনুবাদ করেও সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পান তিনি। রবীন্দ্র পুরস্কার, সরঃস্বতী সম্মান, জ্ঞানপীঠ পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারে ভ‚ষিত হয়েছেন শঙ্খ ঘোষ। ২০১১ সালে পান পদ্মভ‚ষণ পুরস্কার। এই বর্ষীয়ান কবির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।



poisha bazar

ads
ads