যেভাবে ফিরে এলো ‘ঢাকাই মসলিন’


poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১০ জানুয়ারি ২০২১, ১৬:৪৬,  আপডেট: ১০ জানুয়ারি ২০২১, ১৭:১২

৪০ হাত লম্বা ও ২ হাত চাওড়া। এক টুকরো কাপড় আংটির ভিতর দিয়ে অনায়াসেই বের করা যেত। এমন কি এটি এতটাই মিহি ও সুক্ষ্ম ছিল যে ৫০ মিটার দীর্ঘ কাপড়কে একটি দিয়াশলাই বাক্সে রাখা যেত। এটি এক প্রকার তুলার আঁশ থেকে প্রস্তুতকৃত সূতা দিয়ে বয়ন করা অতি সূক্ষ্ম কাপড়বিশেষ। যেটি ‘ঢাকাই মসলিন’ নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত।

ঢাকার ইতিহাস বেশি পুরনো না হলেও মসলিনের ইতিহাস অনেকটাই পুরনো। 'ঢাকাই মসলিন' প্রস্তুত করা হত পূর্ব বাংলার সোনারগাঁও অঞ্চলে। কারিগররা ফুটি কার্পাস নামক তুলা থেকে প্রস্তুত অতি চিকন সুতা দিয়ে মসলিন তৈরি করতেন। চড়কা দিয়ে কাটা, হাতে বোনা মসলিনের জন্য সর্বনিম্ন ৩০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার করা হত যার ফলে মসলিন হত কাচের মত স্বচ্ছ। এই মসলিন রাজকীয় পোশাক নির্মাণে ব্যবহার করা হত। নানা কারণে বাংলায় মসলিন বয়ন বিলুপ্ত হয়ে যায়। প্রচলিত আছে, মসলিন শিল্পীদের আঙুল কেটে দেওয়ার পরে ঢাকাই মসলিন তৈরি বন্ধ হয়ে যায়।

১৭০ বছর পর বাংলার হারিয়ে যাওয়া সেই গৌরব ফেরাতে সক্ষম হয়েছেন একদল গবেষক। দীর্ঘ ছয় বছরের চেষ্টায় আবারও মসলিন বুনতে সক্ষম হয়েছেন তারা।

জানা যায়, ২০১৪ সালের অক্টোবরে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মসলিনের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। বাংলাদেশের কোন কোন এলাকায় মসলিন সুতা তৈরি হতো, তা জেনে সে প্রযুক্তি উদ্ধারের নির্দেশনা দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়। পরে গবেষণা কাজের স্বার্থে আরও সাত সদস্যকে এই কমিটিতে যুক্ত করা হয়। প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক করা হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. মনজুর হোসেনকে।

মসলিনের ফিরে আসার গল্প দৈনিক মানবকন্ঠের রাবি প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক অধ্যাপক ড. মো. মনজুর হোসেন। তিনি জানান 'ঢাকাই মসলিন' যেভাবে ফিরে এলো।

অধ্যাপক মনজুর বলেন, মসলিনের সঙ্গে আমার জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টা একদম কাকতালীয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমানের সহায়তায় ফুড ফ্রিজারভেশন স্টোরেজের উপর গবেষণা করছিলাম। তখন আমার সঙ্গে দুজন জাপানি কাজ করতো। তারা আমাকে পরামর্শ দেন মসলিন বানানো যায় নাকি। তারপর এক ভদ্রলোক অধ্যাপক আব্দুল করিমের লেখা ‘ঢাকাইয়া মসলিন’ বইটা আমাকে পাঠায়। বইটি পড়ে বুঝতে পারলাম মসলিন তুলার আঁশ থেকে প্রস্তুতকৃত সূতা দিয়ে বুনানো একধরনের কাপড়বিশেষ। এটি এতটাই সূক্ষ্ম ও মিহি কাপড় যে ঘাসের উপর শুকাতে দিলে খোঁজে পাওয়া মুশকিল।

মন্ত্রী মির্জা আজম ও তার সচিব সেরিকালচার একটা প্রজেক্ট নিয়ে রাজশাহী আসেন। মসলিন নিয়ে উনার সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়। তিনি বললেন আপনি অনেকদূর এগিয়েছেন। সেরিকালচার প্রজেক্ট বাদ আগে মসলিন প্রজেক্ট হবে। তিনদিনের মধ্যে প্রজেক্ট লিখে সাবমিট করবেন। এভাবেই আমার এই প্রজেক্ট এর সঙ্গে যুক্ত হওয়া।

ফুটি কার্পাসের খোঁজে গবেষকদল:
প্রকল্পের প্রধান বৈজ্ঞানিক বলেন, আমাদের হাতে কোনো মসলিন কাপড়, ফুটি কার্পাস কোনটাই ছিল না। বই থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী মসলিন কাপড় বোনার জন্য ‘ফুটি কার্পাস’র এর কথা উল্লেখ ছিলো। এই গাছ পূর্ব ভারত তথা বাংলাদেশে চাষ হতো বলে বই থেকে জানতে পারি। মসলিন কাপড়ের নমুনা পেলে তার সুতার ডিএনএ সিকুয়েন্স ফুটি কার্পাস গাছের ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই হয়তো কোন তথ্য পাওয়া যাবে।

তিনি আরও বলেন, ফুটি কার্পাস বন্য অবস্থায় বাংলাদেশে কোথাও টিকে থাকতে পারে। এ ধারণার ওপর ভিত্তি করে দেশের বিভিন্ন জায়গায় থেকে তুলার জাত সংগ্রহ করে গবেষণা মাঠে চাষ শুরু করি। তুলার জাত সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন জায়গাতে খোঁজখবর নিয়েছি। এরমধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তাঁর ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাস দেখে গাজীপুরের কাপাশিয়া থেকে একজন ছাত্র আমাকে ফোন দিয়ে বলে, কাপাশিয়ায় এক সময় ওই রকম দেখতে তুলার চাষ হতো। এখানে জঙ্গলে খোঁজলে হয়তো পাওয়া যেতে পারে। ওই এলাকার বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদরাসাতে চিঠি দেওয়া হয়, মাইকিং করে তুলা গাছের খোঁজ দিতে পারলে পুরস্কৃত করা হবে বলেও বলা হয়েছে। পরে সেখানে আমরা নয়টা তুলা গাছ পাই। এছাড়াও আমরা রংপুর, খাগড়াছড়ি, বাগাইছড়ি, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারি বিভিন্ন এলাকায় থেকে ৩৮ প্রজাতির তুলার সন্ধান পাই। পরে সেগুলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের নিজস্ব মাঠে ও আইবিএসসির মাঠে লাগানো হয়।

মসলিনের খোঁজে গবেষকরা:
গবেষক ড. মনজুর বলেন, আমরা তো কোন সময় মসলিন দেখিনি। মসলিন হারিয়ে গেছে প্রায় দুশত বছর আগে। তার মানে মসলিন তৈরি হতো পাঁচশত বছর আগে। সিদ্ধান্ত নিলাম তুলার জাত আর মসলিন খোঁজে বের করার। স্থানীয় উৎস থেকে মসলিন খোঁজতে বিভিন্ন মিডিয়া ও পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এরপর দুই হাজার ফোন কল আসে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আট টুকরা কাপড়ও সংগ্রহ করা হয়। সেগুলোর কোনটি মসলিন ছিলো না। এসময় তারা ৩০০ বছরের পুরনো শাড়ীও পান বলে জানান ড. মনজুর। কোথাও মসলিন না পেয়ে অবশেষে গবেষক দল জাতীয় জাদুঘর কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চান। তাদের আশায় আট মাস পার হয়ে যায়। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না থাকায় কোন নমুনা দিয়ে সহযোগিতা করেননি কর্তৃপক্ষ। একপর্যায়ে মসলিনের নমুনা সংগ্রহের জন্য ভারতের ন্যাশনাল মিউজিয়াম কলকাতায় যান। সেখানেও হতাশ হয়ে ফিরে আসেন গবেষকরা। পরে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে যান চার সদস্যের একটি দল। সেখানে মসলিনের কাপড়ের নমুনা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপাত্ত পেয়ে যান গবেষকরা।

পাওয়া গেলো ফুটি কার্পাস:
প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, আমরা যতগুলো তুলার জাত পাই তার তুলনায় কাপাশিয়া থেকে সংগ্রহ করা তুলার আঁশ বেশি শক্ত, সাদা ধবধবে। আমরা দেখেই বুঝতে পারি এটা মসলিনের সেই সুতার কাছাকাছি যেতে পারে। অন্য জাতের তুলার থেকে সেটা ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারপর লন্ডন থেকে সংগৃহীত মসলিন কাপড়ের ডিএনএ আর সেই তুলার ডিএনএ মিলিয়ে দেখা হলো। কাপাসিয়ায় যে জাতটা পেলাম সেটাই ফুটি কার্পাস। এভাবেই দেড় থেকে দুইশ বছর অবহেলায় পড়ে ছিল। তার আঁশ শক্ত তা থেকে ৫৬ পাউন্ড সুতা হচ্ছে। তাহলে বলাই যায় আমরা 'ঢাকাই মসলিন' কাপড় বানাইতে পারি।

মসলিন তৈরিতে সুতা ব্যবহার:
আমরা বলছি ‘ঢাকাই মসলিন’ এর কথা। সেটা একশ শতাংশ কটন। যা ফুটি কার্পাস তুলা থেকে তৈরি সুতা দিয়ে বানানো হয়। জামদানী শাড়ি বানাতে ১২০-১৫০ কাউন্টের সুতার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু মসলিন তৈরি করতে ৩০০-৫০০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার হয়ে থাকে। কাউন্টের হিসেব বলতে বুঝায়, এক কিলোমিটার সুতাকে ওজন করলে যত গ্রাম হয়, তা দিয়ে সুতার দৈর্ঘ্যকে ভাগ করলে কাউন্ট পাওয়া যায়। যদি ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের একটি সুতার ওজন যদি ২ গ্রাম হয়, তাহলে ২ দিয়ে ১০০০ মিটারকে ভাগ করলে ভাগফল হয় ৫০০। এই ভাগফলকেই কাউন্ট হিসেবে গণ্য করা হয়। একটি শাড়িতে ১৪০ থেকে ১৫০ গ্রাম সুতার প্রয়োজন পড়ে। এই প্রকল্পের প্রশিক্ষিত সুতা কাটুনিরা পাঁচ দিনে এক গ্রাম সুতা কাটতে পারে। অর্থাৎ এই গতিতে একজন যদি মসলিনের সুতা কাটতে থাকেন, তাহলে একটি শাড়ির জন্য সুতা তৈরি করতে প্রায় দুই বছর লাগার কথা।

সুতা কাটার প্রস্তুতি:
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মনজুর বলেন, তুলা থেকে ৫০০ কাউন্টের সুতা তৈরি করা সহজ কথা নয়। এই সুতা আধুনিক যন্ত্রে হবে না, চরকায় কাটতে হবে। সুতা তৈরির কাজের নেতৃত্ব দেন কমিটির সদস্যসচিব ও তাঁত বোর্ডের জ্যেষ্ঠ ইনস্ট্রাক্টর মঞ্জুরুল ইসলাম। এবার খোঁজা শুরু হয় দেশের কোথায় এখনও তাঁতিরা চরকায় সুতা কাটেন। কুমিল্লাতে এখনও তাঁতিরা রয়েছেন তারা সুতা কাটেন, এমন তথ্য আসে। কিন্তু তারা মোটা সুতা কাটেন যাতে কাউন্টের মাপ আসে না। পরে সে মোটা সুতাকাটুনিদের আটটি দলে ৪০ জনের গ্রুপ করা হয়। সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত ছয় জনকে বাছাই করা হয়। এদের বাছাই করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগে যায়। নতুন করে এই সুতা কাটার জন্য চরকা তৈরি করেন মঞ্জুরুল ইসলাম ও টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন অধ্যাপক আলীমুজ্জামান।

মসলিনের সুতা মিহি করার ব্যাপারটা আসলে তিন আঙুলের জাদু। সুতা কাটায় পুরুষের তুলনায় নারীদের আঙুলেই ভালো হতো। তিনটি আঙুলকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় নরম করে রাখতে হয়। সন্ধ্যারাতে তিনটি আঙুলে লোশন মাখিয়ে রেখে সকালে সুতা কাটা হতো। আর সব সময় আঙুল তিনটির যত্ন নিতে হয়েছে। আবার কখনো কাজ করতে গেলে আঙুল ঘেমে যেত, তখন আবার পাউডার দিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হতো।

তাঁতির খোঁজ ও বুনন প্রস্তুতি:
অবশেষে সুতা নিয়ে তাতির দুয়ারে হাজির হলাম। অনেক খোঁজাখুঁজির পর নারায়ণগঞ্জে দুজন তাঁতির খোঁজ পেলাম। কিন্তু সুতাগুলো এত মিহি ছিলো যে, কেউ বানাতে রাজি হচ্ছিল না। তারা বলেছিল এত চিকন সুতা দিয়ে কাপড় বুনা সম্ভব না। পরে তাদের কয়েক ধাপে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। বহু কষ্টে তারা বুনন পদ্ধতি রপ্ত করেছে চিকন সুতা। ঘর্ষণ থেকে ক্ষয় রোধের জন্য মাড় দেওয়া প্রয়োজন, কিন্তু সাধারণ মাড়ে কাজ হচ্ছিল না। তাই চিকন ধানের খইয়ে মাড় ব্যবহার করে কাজ করতে হয়। তারপরও বিভিন্ন কারণে সুতা ছিঁড়ে যাচ্ছিলো। সুতা বারবার ছিঁড়ে যাওয়া রোধ করার জন্য বালতিতে পানি রেখেও কাজ করতে হয়েছে।

অবশেষে বুনা হলো ঢাকাই মসলিন।নারায়ণগঞ্জে দুজন তাঁতি ১৭১০ সালে বোনা শাড়ির নকশা দেখে হুবহু একটি শাড়ি বুনে ফেলে। লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে প্রায় সাড়ে তিনশ ঢাকাই মসলিন শাড়ি সংরক্ষিত আছে। প্রথম অবস্থায় শাড়িটি তৈরি করতে খরচ পড়ে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। ইতিমধ্যে মোট ছয়টি শাড়ি তৈরি করা হয়েছে। একটি শাড়ি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক মনজুর হোসেন।

প্রকল্পে ব্যয় সম্পর্কে অধ্যাপক মনজুর হোসেন বলেন, এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ১৪ কোটি ১০ লাখ টাকা। বরাদ্দে ৩০ শতাংশ টাকা খরচ হয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ৭০ শতাংশ টাকা সরকারের খাতে ফেরত দেওয়া হয়েছে। আমাদের যথেষ্ট লোকবল, সুতা, তাঁত আছে আশা করছি আরও শাড়ী তৈরি করা সম্ভব হবে। কমার্শিয়াল বা ব্যবসা কেন্দ্রিক শাড়ী তৈরি করার সরকারিভাবে বিশেষ পরিকল্পনা ও প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে।

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads
ads