আমিনুল ইসলামের কবিতায় শিল্প ও বাস্তবতা


poisha bazar

  • মাসুদার রহমান
  • ২৬ ডিসেম্বর ২০২০, ১৬:০০

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ভাল লেগেছে এই কথাটি ঠিক মতো বলতে পারাই যথার্থ সমালোচনা। এর বেশি কোনো কথা নেই। পাণ্ডিত্য নয়, অনুভবের আলো ঠিকরে ভালো লেগেছে কথাটা বলবার মতো হয়, শোনবার মতো হয়।’ আমিনুল ইসলামের কবিতা পড়তে গিয়ে আবু সায়ীদ আইয়ূবের একটি বক্তব্য মনে এসেছে বার বার। ‘গদ্যের বক্তব্য পাঠক বুঝে ফেলবার সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থের বাহন যে ধ্বনিপুঞ্জ তা নিয়ন্ত্রণ হয়ে পড়ে।

যেন বক্তার তীর থেকে নদীর ওপারে শ্রোতার তীরে একটি রেলগাড়িকে পার করে দেয়ার দরকার পড়েছিল বলে আলাদিনের দৈত্য মুহূর্তের মধ্যে ঠিক মাপের একটি সাঁকো তৈরি করে ফেলল। তারপর রেলগাড়িটি যেই ওপারে নির্বিঘ্নে পৌঁছে গেল, অমনি সাঁকোটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।’ কিন্তু কবিতার ক্ষেত্রে তা হবার নয়। অর্থ বোঝানোর পরও শব্দ ও তার ধ্বনি পাঠকের চৈতন্যে আবার নবজন্ম লাভ করে। সেখানে সাঁকোটা মিলিয়ে যায় না। বরং অপেক্ষায় থাকে। সেখানে তো শুধু যাওয়া নেই। সেখানে যাতায়াত। নিরন্তর যাওয়া আর ফিরে ফিরে আসা। আমিনুল ইসলামের পাঠ অভিজ্ঞতা এরকম—
প্রথম শীতের হাত; সেই হাতে রচিত আস্তানা।

তথাপি সংহার নয়, ফসলের পক্ষে ছিল গান।
উন্মুক্ত চলনবিল, বাতাসে ডানার ধ্বনি-
আর জলজুড়ে মুগ্ধতার ছবি: খুশি ফলে
ঈর্ষাতুর আলোরাও। আর ছায়ার পাশে
জমেছিল অকৃত কর্তব্য। প্রকৃতির জবাবদিহিতা?
কিন্তু কে নেবে ? বসন্ত করেনি ভুল।
অথচ এখন কোথায় পাখি! শূন্যবিলে
যতসব বিভ্রান্তির ছায়া; রৌদ্রের গায়ে রঙ।

নিঃসঙ্গ দুহাতে পালক কুড়িযে রাখি।
ধূসর শিল্পীর হাতে গড়ে ওঠে জাদুঘর।
পুনঃপুন বিজ্ঞাপন কিউরেটের পদে;
তবু একমাত্র অ্যাপ্লিক্যান্ট—আমাদেরই দুখু বাঙাল ।
(কুয়াশার বর্ণমালা/কুয়াশার বর্ণমালা)

বাংলা কবিতা পাঠের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে,—‘বাংলা কবিতাকে বিচ্ছিন্নভাবে না পড়ে পড়তে হবে বিশ্বের কবিতার প্রেক্ষিতে।’ তৃতীয় বিশ্বের কবিতার সঙ্গে একালখণ্ডের বাংলা কবিতার একটি আত্মিক মিল পাওয়া যায়। এই তুলনামূলক পাঠ বাংলা কবিতার বহুমাত্রিক চরিত্রকে বুঝতে সাহায্য করে। আমরা আমাদের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের অশনি সংকেত শুনতে পাচ্ছি। প্রকৃতিবোধ বা প্রকৃতিচেতনা এখনো সর্ব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছেনি। কারণ তারা মানসিকভাবেই প্রকৃতি বিচ্ছন্ন। বিপন্নতা ও অস্তিত্ব সংকট সম্পর্কে এখনও ওয়াকিফহাল নয়।

কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। আজ আমাদের প্রকৃতির ক্ষয়িষ্ণুতার মধ্যে , এসে প্রকৃতিমুখিনতার এখন জীবনের একটা দায়। তারই প্রকাশ ঘটেছে এ সময়ে নানা প্রকৃতি আন্দোলনে, লেখালেখিতে। কবি নাট্যকার জন মিলিংটন সিং—এর ‘রাইডার্স টু দ্য সী’ (Riders to the Sea) নাটকটিতে প্রকৃতি এসেছে প্রান্তিকের দৃষ্টিতে । প্রান্তিকের এই প্রকৃতি দেখার মধ্যেই টোটালিটিকে স্পর্শ করার চেষ্টা।

শিল্পে যুক্তি কাঠামো একটি স্বকৃত ব্যাপার। একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে কবিতা। তাই যুক্তির পরস্পরা যে অনিবার্য যুক্তি সিঁড়ি বেয়ে একটি কবিতা পৌঁছে যায় স্থির সিদ্ধান্তে। পাঠকও যুক্তির দড়ি ধরে বারবার পৌঁছতে পারেন তার গন্তব্য বিন্দুতে। পরিকল্পিত ও উপযুক্ত টাইটেল থেকেই কবি ও পাঠকের ভাবনাতন্ত্র তৈরি হয়। এখানে প্রস্থান চলাচল ও গন্তব্য সুনির্দিষ্ট। কিন্তু শিল্প সৃষ্টি পূর্ব প্রতিশ্রুতিই হল নতুন দিকে উন্মোচন। এই দিক উন্মোচন যে কত ভাবে হতে পারে। এক একটি কবিতায় তা এক এক রকমভাবে। এক একজন কবির হাতে তাও তার স্বাতন্ত্রিকতা নিয়ে।

বায়ুস্পর্শে পর্ণমোচীর পাতায় হলদে শিহরণ;
নন্দিনীর কোমরে হাত দিতে দেখি:
নদী নেই,
পার্কে খালে ঘুরে মরে স্রোতেলা অস্তিত্ব;
হয়তোবা মৌসুমও এসে যায় মেনোপজে!
আর শ্যামলীকে চাঁদকানা করবে-
এমত প্রকল্পে
উত্তরের হাওয়া ওড়ায় লাল ইটের গুঁড়ো।
তবু এই ঘোরলাগা সন্ধ্যায়
জোছনা কুড়াবো বলে
‘সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে’
মাইক্রো-ক্রেডিটের মতো মন বিছিয়েছি।

(শেষ হেমন্তের জোছনা/ শেষ হেমন্তের জোছনা)
কবিতাটি পাঠে বোঝা যায় অনেকাংশে এখানে যুক্তিচাপকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। বিজ্ঞানী পাউলিং কথিত যুক্তিফাটল বা লজিক্যাল লেফট এইসব কবিতায় অর্থহীন নয়। প্রচলিত অর্থ ঈপ্সাকে অতিক্রম করে কবিতা এখানে প্রবেশ করেছে অনন্ত অর্থ ঐশ্বর্যের পরিসরে। ‘শেষ হেমন্তের জোছনা’ এখানে অসংলগ্নতার মধ্যে খোঁজা হয়েছে অর্থময়তাকে, বিশৃঙ্খলতার মধ্যে শৃঙ্খলাকে। যা এক আশাবাদ, ‘সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে/ মাইক্রো-ক্রেডিটের মতো মন বিছিয়েছি।’

তিনটি পূর্ণ বিরতিচিহ্ন বা দাড়ি দিয়ে শেষ হয়েছে। লক্ষণীয় এই তিন বিরামচিহ্নবদ্ধ পঙক্তি যদি উপর নিচে এনে সাজাই তাতেও কবিতা অর্থহীন হয়ে পড়ে না। আমরা অবশ্যই ধারণা রাখি কবি কখনও তা কবিতার শরীরে এ জাতীয় ব্যাভচার কামনা করেন না। কিন্তু এ রকম একটি বৈশিষ্ট্য যে এ কবিতা ধারণ করে আছে তা বাস্তব। আমাদের সাহিত্যে পাঠ জীবনের প্রথম দিকে তেজীয়ান কলম থেকে হঠাত্ আলোর ঝলকানির মতো কিছু একটা অনুভূত হলেও সময় অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে ক্রমশ তা মিইয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে নিজেকে পরিবর্তন করতে পারে না এক সময় স্মৃতি ও পরে বিস্মৃত হয়ে পড়ে কবি ও কবিতা আর যারা টিকে যান তারা সুনাম ভাঙিয়ে পুরনো বিষয়েরই পুনরাবৃত্তি করে চলেন, লেখার গ্রাফ ঊর্ধ্বগামী হওয়ার বদলে নিম্নগামী হয়ে পড়ে।

অনেকের ক্ষেত্রে এ অভিযোগ চললেও অনেকের ক্ষেত্রে তা চলে না। কবি আমিনুলের প্রথম গ্রন্থের যে স্ফুলিঙ্গের দেখা পাই ‘মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম’-এ তা শিখা এবং ‘শেষ হেমন্তের জোছনা’ কিংবা ‘কুয়াশার বর্ণমালা’, ‘পথ বেঁধে দিল’ বন্ধনহীন গ্রন্থি’, ‘স্বপ্নের হালখাতা’, ‘জলচিঠি নীলস্বপ্নের দুয়ারে’, ‘শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ’, ‘জোছনার রাত বেদনার বেহালা?-’, ‘আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্ট’, ‘প্রণয়ী নদীর কাছে’ ক্রমে ক্রমে তা কুণ্ডলির মতো প্রজ্জ্বলিত হয়ে ওঠে। আমিনুল ইসলামের মধ্যে এক সপ্রতিভ দীপ্তি আছে। রুচি মনন ও বুদ্ধির প্রাখর্যে তার কবিতা সহলেখকদের চেয়ে আলাদা, স্বভাবসুন্দর। প্রায় ক্ষেত্রে নাতিদীর্ঘ এবং সম্ভ্রান্ত ও সুদর্শন, সহজ ও প্রতীকী, শুদ্ধ ও শান্ত, প্রেম ও শোকের।

কালে বা সমকালে নানা প্রবণতা লক্ষযোগ্য শিল্পক্ষেত্রে; কবিতাও, তবে তার সবটুকুই মহাকাল গ্রহণ করে না। বরং বলা যায় সময়ের কষ্টি-বিচারে তার বেশিরভাগই পরিত্যগযোগ্য হয়ে পড়ে। এই সময়ে কবিতায় নানা হঠকারিতামূলক সিদ্ধান্তে আলোচ্য কবিকে গা করতে কমই দেখা যায়। তাই তো যেখানে অনেককে দেশকাল মুছে ফেলে কবিতা চর্চা করতে উদ্যোগী সেখানে তিনি বাংলা কবিতার পরস্পরাকে ধরেই সামনে এগিয়ে যেতে চান। আমিনুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমরা শাশ্বত বাংলাদেশকে পাই নতুনভাবে।

এই মাটি মানুষের প্রতি দায় কবি কখনো এড়িয়ে যান নি। তার কলম প্রসূত ‘বাবার খাটে শুয়ে’ কবিতাটির কথা উল্লেখ করতে পারি, যেখানে ‘বাবা’ চরিত্র কবিতার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে বাবার তুমুল অস্তিত্ব দীর্ঘ কবিতাটি জুড়ে। কবি যন্ত্রণা দীর্ণ বাবার অনুপস্থিতিতে। বাংলা কবিতায় বাবাকে নিয়ে লেখা অনেক কবিতা পেয়ে যাব যদি সন্ধানে নামি। তবে তা আমিনুল ইসলামের ‘বাবার ঘাটে শুয়ে’ কবিতাটির সঙ্গে কতটুকু মেলে? নব্বই বা শূন্য দশকের কবি তাদের কবিতায় দেশকালকে যেভাবে উহ্য করে তোলেন আমিনুল সেভাবে তার পায়ের তলার মাটিকে ফেলে শূন্যে উঠে যেতে চাননি।

তাই তো কবিতাটিতে বাবাকে ঘিরে আনন্দ শোক বিষাদ যন্ত্রণা হয়ে ঘুরে ঘুরে নেচেছে দেশের প্রকৃতি ও পরিবেশ পরিবার প্রাত্যাহিক জীবন। কবি আমিনুল ইসলাম লিখেছেন- ‘তুমি চলে গেছ বাবা, তোমার খাটটা রয়ে গেছে-/ জলশূন্য নদীর খোলস,’ কিংবা, ‘লাউয়ের মাচানের স্নিগ্ধছায়া/ তিলাঘুঘুর অন্ত্যমিল কবিতা’। আমিনুলের এই ভাষা বয়ন বাংলা কবিতার পরস্পরাকে অস্বীকার করে না কোনোভাবেই; বরং এর ভিতরে ভিতরে সূক্ষ্ম শিল্প স্বাক্ষর রেখে যান তা মেনে নিয়ে। সুপাঠ্য দীর্ঘ এই কবিতাটি পাঠককে উস্কানি দেয় পাঠমত্ততায়, যেখানে কবিতার দুর্বোধ্যতা কথা বলে কবিতাকে পাঠক সরিয়ে রাখতে চান সে সময়েও।

এমনই নানা অনুষঙ্গ ঐতিহ্য (বিশেষ করে নদীমাতৃক জীবন, ও যান্ত্রিক জীবনের ছবি) ইতিহাসও চলে এসেছে কবি আমিনুলের কাব্যধ্যানে। সমকালীনতার উপরে দাঁড়িয়ে অতীত বর্তমান আর ভবিষেক এক সূত্রে গেঁথেছেন তিনি শিল্পে। তার এই সমকালীন শিল্প চেতনার ধ্যানই পৌঁছে দেবে কালের ওপারে।






ads
ads