হেমন্ত ও জীবনানন্দ

দালান জাহান


poisha bazar

  • ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১২:১৯

বাঙালির চেতনায় হেমন্ত এক উৎসব মুখর দিন। শরতের শারদীয় সৌন্দর্য নিয়ে উমা চলে যাওয়ার সাথেই সাথেই দস্যি মেয়ে হেমন্তের আগমন। হেমন্ত ষড়ঋতুর চতুর্থ ঋতু। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসের সমন্বয়ে আসে হেমন্ত বা ধান কাঁটার মওসুম। মূলত কার্তিকের শুরুতে ধানের গর্ভ পরিপুষ্ট সাদা দুধ ঘন হতে থাকে। প্রকৃতির অসম মিলনে লবনাক্ত বাতাসে হেলেদুলে ধানগুলো পরিপক্ব হয়ে হেঁটে যায় অগ্রহায়ণে। এসময় যেন তাদের ঘরে ফেরার কথা। প্রকৃতির পথে ঘাটে শিউলি ফুলেরা ফুটে থাকে স্বর্গীয় শিশুর মতোন।

এক সময় বাংলায় বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে। কারণ, ধান উৎপাদনের ঋতু হলো এই হেমন্ত। বর্ষার শেষ দিকে বোনা আমন-আউশ শরতে বেড়ে ওঠে। আর হেমন্তের প্রথম মাস কার্তিকে ধান পরিপক্ক হয়। এ ঋতুতে ফোটে গন্ধরাজ, মল্লিকা, শিউলি, কামিনী, হিমঝুরি, দেব কাঞ্চন, রাজ অশোক, ছাতিম, বকফুল।

আগে বলা হতো ‘মরা কার্তিকের’ পর আসে সর্বজনীন লৌকিক উৎসব নবান্ন। কিন্তু কার্তিকের সেই ক্ষুধার্ত চিত্রটা এখন শুধুই আমরা ভষকের লালা ঝরা জিহ্বায় দেখতে পাই। মানুষের ভাগ্যের চাকা বদলে নিয়েছে নিজেদের মেধা। কিন্তু পূর্বের কার্তিক মাস মানেই গ্রাম বাংলার মানুষের অসহনীয় ক্ষুধা অসহ্য এক জীবন পুড়া দিনকে বুঝাতো।

তীব্র গরমের ঝাঁঝালো রোদের গন্ধ ছেড়ে , হেমন্তের সাদা শুভ্র আকাশ যাত্রা করে হিমহিম অনুভ‚তির নদী বেয়ে বেয়ে। সুজলা সুফলা বাংলার রূপ বৈচিত্র্য হেমন্ত এনে দেয় নতুন আরেক উদ্দাম। ভেজা ভেজা সন্ধ্যা অথবা উৎসবমুখর কৃষাণ পাড়ার অনাবিল আনন্দ স্রোত যদিও অনেকটা কমে গেছে নগরায়ণের করালগ্রাসে, তবুও আমরা উৎসবের কথা বলি পিঠাপুলির কথা বলি। কেউ কেউ আয়োজন করে জীবনের শুভ্র তায় যোগ করে আরেকটু বাড়িত খোড়াক। মাঝে মাঝে গান বাজে বাদ্য বাজে ঢোল নিয়ে হেঁটে যায় ঝাঁকড়া চুলের বাদ্যশিল্পীরা। যাত্রার বাজনা হারমোনিয়ামে ওঠে অতীতের রাজা-রানি কাজল-রেখার গান।

নদীর ধারে ফুটে থাকা কাশ ফুলেরা আমাদের হৃদয়ে ঢেলে দেয় শীতল জল আমরা উষ্ণতার দিকে এগিয়ে যাই রুক্ষতার ক্লান্ত চোখ ভেঙে আমাদের সামনে উদিত হয় নতুন বৃক্ষ।

হেমন্তের রূপ বৈচিত্র্য যেন কিশোর বয়সের মতো উচ্ছ্বসিত আনন্দ হিল্লোল কিশোরীর মতো তার শীতল রসায়ন। হৃদয় বিদীর্ণ করে বয়ে যাওয়া লীন হাওয়ায় মুহূর্তেই মানুষ পাখি হয়ে ওড়ে যায় অতীতে। বিশেষ করে যাদের শৈশব কেটেছে পল্লীর ধান কাটা জমিতে চাঁদনি রাতে হাঁটতে হাঁটতে। অথবা চাষ করা ভ‚মির বুকে রূপালি ইলিশের মতো সাদা শক্ত মাটি মাড়িয়ে-মাড়িয়ে যারা অতিক্রম করে গেছে আশৈশব।

যারা শুনেছে দূর থেকে ভেসে আসা হিম বাতাসের শোণিত চিৎকার কিংবা যাত্রার দলের ঢোলের শব্দ, হারমোনিয়ামে ঝংকার উঠা ঐ একই সুর অথবা বন্দনা বাঁধা গান ‘এই পদ্মা এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদী তটে’ এক অমিয় আনন্দে তারা আজও ছুঁয়ে যায় রোমাঞ্চিত হৃদয়ের স্বচ্ছ ঝর্ণাধারা।
হেমন্তের বাতাস তাদেরকে মারাত্মকভাবে নষ্টালজিক করে দেয়।

হেমন্ত নিয়ে সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন কালজয়ী কবি জীবনানন্দ দাশ। তার কবিতায় হেমন্তের যে রূপ বৈচিত্র্য পাওয়া যায়, তা অন্য কারও কবিতায় এভাবে ধরা দেয় না। হেমন্তের ভেজা শিশির যেন তার উন্মন প্রেমিকা। কামুক এই ঋতুর গন্ধ ও বৈশিষ্ট্য যেন সদ্য যৌবনা কিশোরীর অবুঝ হাত। যাকে একবার ধরে ফেললে আর ছাড়া যায় না। স্মৃতিকাতর জীবনানন্দ দাশ সবসময় হেমন্তকে নিমন্ত্রণ করেছেন, বোধহয় তিনি চেয়েছেন সারাটি বছর হেমন্ত থাকুক, থাকুক এই হাল্কা বাতাস হাল্কা রোদ হাল্কা শীতলতার মধুর পরশ। তাই কবি বলেছেন, ‘মাঠের নিস্তেজ রোদে নাচ হবে/শুরু হবে হেমন্তের নরম উৎসব। তিনি হেমন্তের রোদে হয় তো তাকিয়ে ছিলেন জীবনের গভীর দেনা থেকে হয় তো তাই তিনি বলেছেন,

‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/
অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের খেতে।’

শীতের আগমনে মন যখন, চঞ্চল হয়ে উঠে একটা পরিবর্তনের কণ্ঠ প্রকৃতির অরণ্যে সমুদ্রে তোলে জাগরণী ঢেউ। শীত বাতাসের সাক্ষী হয়ে তখন শিশির হাঁটতে শুরু করে। সরষে ফুলগুলো ঝরতে শুরু করে। যেন শীতের কাঁপুনিতে পরিপক্ব হয় ধানের সাদা দুধ এবং গর্ভ সঞ্চারণের লজ্জায় কেঁদে-কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে মাটিতে। তাই কবি বলেছেন,

চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল/
তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা-ফোঁটা পড়িতেছে
শিশিরের জল।’

হেমন্তের অপলক সৌন্দর্য কবি জীবনানন্দ দাশকে কতভাবে যে বিমোহিত করেছেন, তা তার কবিতা পড়লেই বোঝা যায়। হেমন্ত যে প্রেম। প্রেমেরই আরেক নাম হেমন্ত যে প্রেম জেগে উঠে শুধুই প্রেমিক হওয়ার জন্য নয়। কসমিক পৃথিবীর ভ্রমন গদ্যে সে প্রেম কখনও কখনও হেিয় উঠে সাধারণ আবিষ্কার। সে আবিষ্কারে ফুল ফোটে শিশু কথা কয়। মাঠের তৃণভ‚মি উপযুক্ত হয়, হাম্বা-হাম্বা করা ষাঁড়ের পেটে যেতে। তাই কবি বলেছেন-

‘হেমন্ত বিয়ায়ে গেছে শেষ ঝরা মেয়ে তার শাদা মরা শেফালীর বিছানার ’পর; /
মদের ফোঁটার শেষ হ’য়ে গেছে এ-মাঠের মাটির ভিতর।’

কবি জীবনানন্দ দাশ হেমন্তের ভেতরেও মানুষের দুঃখ কষ্ট দেখেছেন, তিনি দেখেছেন বিভাজিত লাঙলের কষ্ট। বঞ্চিত মানুষের কুয়াশা প্রিয় মুখ। কৃষকের ছাপ পড়া মাটির কোলাহল। আদিকাল থেকে সামন্ত বাহিকায় যা ছড়িয়ে গেছে পৃথিবীর কোণায় কোণায়। মাটির চিৎকারে যখন অঙ্কিত হয়, অনাবিষ্কৃত বর্ণমালা। তখন জীবনানন্দ দাশ বলতেই পারেন, ‘জমি উপ?ড়ায়ে ফেলে চ’লে গেছে চাষা

নতুন লাঙল তার প’ড়ে আছে- পুরানো পিপাসা।’ আসলে এ পিপাসার কী শেষ হবে কখনও। অনেক পিপাসা আছে যেগুলো ফুরিয়ে গেলে মানুষেরা মাটি হয়ে যায়। হেমন্তের কবি জীবনানন্দ দাশ হেমন্তকে ফুটিয়েছেন তার অলংকৃত হৃদয়ের বাগানে তাই আশার আলো অনন্ত পথ পাড়ি দিয়ে এসে পৃথিবীতে পড়ে। প্রজাপতি ওড়ে, পাখি গান গায়, রাখাল গরু চড়িয়ে নাচতে-নাচতে মাঠে যায়। ধান কাটা শেষে পুঁতির মালা দিয়ে রায় কিশোরীকে প্রেম নিবেদন করে কৃষ্ণকান্ত আর জীবনানন্দ দাশ তখনও বলে উঠেন,

হেমন্তের ধান ওঠে ফ’লে/
দুই পা ছড়ায়ে বোসো এইখানে পৃথিবীর কোলে।’

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads
ads