রাস্তিদীঘি

শাহমুব জুয়েল


poisha bazar

  • ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১২:১৬,  আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২০, ১২:১৭

জলের জন্য খা খা করছে ময়নাপুর। পেটের তলায় খাবার নেই। দিনমজুরেরা ঘন ঘন নুইয়ে পড়ছে মাটির চাকায়। বছর শেষে গোলায় এবং উঠানে ধান আর ধান। কোলে কোলে নতুন মুখ। এখন মাটিতে আঠা নেই; উর্বা যাচ্ছে ধানের শীষ। মুখ থেকে দুর্গন্ধ, উগরে পড়ছে আবেদ আলির। কেউ তার পাশে ঘেঁষে না; মুখ চেপে থু থু ফেলতে ফেলতে দৌড়ে পালায়।

সুগন্ধি ধান ক্ষেত করত সে। চালান হতো শহরে। শহরে বাবুরা তাকে তালাশ করে বস্তায় বস্তায় চাল নিত। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ এসে ছবি তুলে নিতো তার। ক্ষেতও নেই ছবিও নেই মায়াও নেই। বাহ! কী চমৎকারভাবে দিন বদলে যাচ্ছে।

কালো রাস্তায় হনহন করে গাড়ি ছুটছে। কেউ কারো ছায়া দেখে না, খবরও নেয় না। রাস্তার পাশ দিয়ে খাল গিয়ে ঠেকেছে শহরের নাভিমূলে। মাঝখানে গড়ে উঠেছে আতিক আশহাবের টাওয়ার। খালে ও বিলে আটকে গেছে জল। আতিক আশহাব দ্বীনদার মানুষ টাওয়ারের সেফটি চিন্তা করে পাশে তৈরি করেছেন সুরম্য মসজিদ। মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের আজানের সুর ভেসে আসে ময়নাপুর। ময়নাপুরের মানুষ মানত করে এবং শুক্রবারে বাক্সের ওপর হাত বাড়ায়। আতিক আশহাব দিনে দিনে জনদরদি হতে থাকে। দু’চার পয়সা খরচ করলেই দু’চারজন খাদেম বা চাটুকার মিলে তার।

আতিক আশহাবের দেখাদেখি খাল দখলে নিয়েছে পাড়ের মানুষ। টাওয়ার তৈরির পর থেকে খালের চি?হ্ন দিন দিন মুছে যাচ্ছে। ময়নাপুর থেকে খাল গিয়ে মিশেছে ডাকাতিয়ার মোহনায়। ১৯৭১ সালে নৌকাযোগে মুক্তিযোদ্ধারা ছুটে যেত শহরে। হামলা চালাত হানাদারের লরির উপর। সে খালে এখন বয়োসর্ধো পুরুষের হিসুর মতো জল গড়ায়। জল দুর্গন্ধ। পথিকেরা নাক ছিটকে ছিটকে পাশ কেটে চলে যাচ্ছে।

খালের পাশ দিয়ে গাঁয়ের রাস্তা। কাঁধে গামছা হাতে কাঁচি নিয়ে শহরে গেল আবেদ আলি। কাঁচিতে ধার নেই, শান দিতে বেরিয়েছে সে। কালো জল কালো রাস্তা দেখে নিজের শরীরের দিকে বারবার তাকায়; অনেক দিন বিলে নামে না; কেমন ফর্সা হয়ে উঠেছে তার কেঁচো শরীরের ভাঁজ। কাজ না করায় শরীর অলস হয়ে উঠেছে। শরীরে মাঝে মাঝে শিং মাছের মতো ঘাই মারছে। কাজ করলে শরীর ভালো থাকত বিল শুকিয়েছে, শরীর শুকিয়েছ, বাসা বেঁধেছে নানা জাতের রোগ। তবে আলসারই তাকে বেশি কাবু করেছে।

ডাক্তার দেখাবে সে। টাওয়ারে বড় বড় ডাক্তার বসে। একবারে দুই কাজ সারবে। কাঁচি শান দিয়ে ডাক্তারখানায় শরীররটাও শান দিয়ে আসবে। হাঁটতে হাঁটতে সামনের দিকে তাকাতে লাগল। রাস্তায় ঘনঘন গাড়ি, পাশে হরেক রকম বাতি জ্বলছে পেছনে বিরাট টাওয়ার। মানুষগুলো ছোটাছুটি করছে। কেউ কারো দিকে ফিরেও তাকায় না। প্রত্যেকেরই মনে হচ্ছে কাজ না করলে খাবে কী!

আবেদ আলি কোমরে হাত রেখে উপরের দিকে তাকাতে লাগল। আকাশের হালকা মেঘের আনাগোনা। সামনে থেকে মনে হলো মেঘের সাথে ঠেকেছে টাওয়ার। দেখতে দেখতে ঘাড় ব্যথা হয়ে গেল। এগিয়ে গেল গলির দিকে। চোখ গেল খালের মুখে, একটা টগবগে ছেলে চেইন টান দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল খালের পাশে। জল গড়িয়ে পড়ছে, মনে হলো খাল জীবন পেয়েছে সে পেয়েছে স্বস্তি। পাশে ছিল কলেজ পড়ুয়া মেয়ে। যুবক তাকে বলল- শ্রেয়সী সামনে গিয়ে দাঁড়াও। শ্রেয়সী নাক-মুখ চেপে তার পাশ দিয়ে দ্রæত বেরিয়ে গেল। আবেদ আলি মনে করল শহুরে মানুষের অনেক সরম আছে।

যুবকের কাজ শেষ হলে তার পাশে দাঁড়িয়ে আবেদ আলি বলল- বাবা, একটু কথা হুনবেন?

যুবক দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বলল- ধুর মিয়া, নাকে কী বোধ নেই; কী আজব মানুষ! আবেদ আলি হাসতে হাসতে বেরিয়ে পড়ল। কী ভালা! আমার মুখের দুর্গন্ধ উইরা গেছে। তার চেয়ে বেহাল দুর্গন্ধও পৃথিবীতে আছে।

যুবক সামনে গেলে শ্রেয়সী তার হাত ধরে বলল- লোকটি তোমাকে কিছু বলেছে? কোত্থেকে যে এরা আসে, ক্ষেত খামারের লোক। চল চল ট্রেন চলে যাবে।

আবেদ আলি খালের কিনার ঘেঁষে দাঁড়াল। খালের ওপর হরেক রকম প্যাকেটের স্ত‚প। মনে পড়ল তার বাবার কথা। বাবার সাথে ধান বেচাকেনা করতে নৌকাযোগে এসেছিল সে। তার সরলতার কারণে ভাইয়েরা তাকে পছন্দ করত না। তাই বাবা তাকে সাথে নিয়ে মাঠে ও হাটে যেত। বাবা মারা গেছে, সংসার ভেঙেছে। জমিজমা ভাগ হয়েছে তাদের।

ভাইয়েরা ফসলি জমি নিয়েছে। সে সহজ সরল মানুষ, তাকে দিয়েছে রাস্তার পাশের খানাখন্দ। ধান হয় না; উর্বা যায়। এখন কালো রাস্তা হওয়ায় সে ভাইয়েরা ঘনঘন তার খবর নেয়। জমি বাগিয়ে নিতে হাত বাড়ায়। হুমকি ধমকিও দিতে থাকে। আবেদ আলি সরল হতে পারে কিন্তু এক কথার মানুষ। তার ঘামে বেড়ে উঠেছে ছেলে ইনতেসার। তার এক কথা- বাবা জায়গা ছাড়বা না। কিসের ভাই তোমার, স্বার্থপর নির্লজ্জ কোথাকার!

বহু বছর আগ থেকে মায়া উঠে গেছে। বিলও গেছে মায়াও উর্বা গেছে। আবেদ আলি গাঁয়ের মানুষ। ফসল ফলায় পেট ভরে খায়। ফলন ভাল কাঁচিতে শান আছে, আর চিন্তা কী! সে গতকাল কাঁচি এবং শরীর শান দিয়ে বাড়ি ফিরেছে।

ময়নাপুর তার বাপ দাদার ভিটে। বিলের কিনারে গাঁয়ের মোড়। মোড়ের পরে তার বাড়ি। বাড়ির দেরাজ থেকে শহরের মাথা দেখা যায়। মোড়ে বশু মিয়ার চায়ের দোকান। হেমন্তকালে দোকানে দাঁড়াবার সুযোগ থাকে না। বিলে বিলে ধানের মৃদু গন্ধ। কৃষকের মুখে মুখে হাসি। ফুরফুরে মন, ক্ষেতে কাঁচি নিয়ে ছুটাছুটি করে কৃষক। ধান কাটতে কাটতে শরীরের হাড় ক্ষয় হয়ে যায় কিন্তু ধানের শীষ দেখলে ক্লান্তি থাকে না। ভাঙাচোরা গালের ভেতর থেকে দাঁত চকচক করে ওঠে। আবেদ আলির ক্ষেত রাস্তার কিনারে। সে ক্ষেতের চারপাশ ঘিরে দেখে কিন্তু মন ভরে না। কারণ ধানের রং ভালো না। ঠা ঠা রৌদ পড়ছে। ঘাম মুছতে মুছতে উঠল রাস্তায় এবং বশু মিয়ার দোকানে বসল। চায়ের কথা বলল- ভাই এক কাপ চা লও। বশু মিয়া হিন্দু রাজার পতনের কাহিনী বলছে। এবং সুদূর ইয়েমেন থেকে ইসলাম প্রচারে এসেছে ধর্মযাজক। কৃষকেরা গল্প শুনতে শুনতে গলার ভিতরে পাউরুটি চিবাচ্ছে। তার গল্প থেমে নেই।

আবেদ আলি চা হাতে দাঁড়িয়ে আছে। বশু মিয়া তাকে বলল- হগার আলি কী খবর? তোমার মুখের গন্ধ গেছে? আমি কেমনে কমু; তুমি টের পাও না। বশু মিয়া নাক চেপে কথা বলছে, তাই বলল- নাক চাপা থাকলে টের পাইব কী কইরা। শুন- দ্রুত চা টান দিয়া বাহির হয়ে যা; আমার কাস্টমার নষ্ট করিছ না। আরেকটা কথা রাস্তি পিরের মাজারে যা, হিয়ানে বড় দীঘি আছে। ওখান থাইক্যা জল খা; তোর দুর্গন্ধ থাকব না। কথাটা আবেদ আলির মনে ধরছে। সে দেরি করল না। কী করবে ঘরে বউ বাহিরে মানুষ। কথা না শুনে উপায় আছে!

আবেদ আলি হাঁটতে লাগল। ঘা ঘেঁষে দাঁড়াল সিএনজি। সে থমকে গেল। বেরিয়ে এলো ইনতেসার। ইনতেসার তার বড় ছেলে। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়ছে। বাবাকে দেখে সে জড়িয়ে ধরল। আবেদ আলি মনে মনে ভয় পেতে লাগল। ছেলে বড় হয়েছে অনেক নামধাম তার। ঘামের টাকায় সে মানুষ হচ্ছে। সে অনেক বড় হোক। সে আশায় বুক বেঁধে মাথার ঘাম পায়ে ফেলছে। কষ্টের টাকায় মানুষ হওয়া যায়। পরের টাকায় সুখ মেলে; শান্তি থাকে না।

মুখের দুর্গন্ধে ছেলের কষ্ট হবে তাই মুখ চেপে কোলাকুলি করল সে। ইনতেসার বলল- বাবা কোথায় যাও? রাস্তি পিরের দীঘিতে যাব। তাই? আরে আমি ওই দীঘির কত গল্প শুনেছি। সেটা নাকি অনেক বড় দীঘি। আমার বহুদিনের ইচ্ছে সেখানে যাব। চল চল। আমিও তোমার সাথে যাব। দু’জনে সিএনজিতে উঠল।

গাড়ি থামল। দু’জনে নেমে পড়ল। সুনসান জায়গা। কেউ কেউ মাজার জিয়ারত করছে কেউ দীঘির চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখছে। আবেদ আলি ঘাটে নেমে জল ঘিলতে লাগল। ইনতেসার বহুদিন এমন দৃশ্য দেখেনি। এসএসসি পাস করে গ্রাম ছেড়েছে সে। তাই গাঁয়ের সুনসান পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করে। এখানকার মানুষের শরীরে গন্ধ থাকলেও প্রাণ বাঁচায় তারা। সে সেল্ফি তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে।

ঘাটের কাছে গিয়ে বলল- বাজান কী সুন্দর দীঘির জল! দীঘির অনেক গল্প শুনেছি। দেশে অনেক দীঘি আছে সব দীঘি কাটার পেছনে আছে অনেক অনেক রূপকথা। বড় বিষয়- পূর্বপুরুষেরা জলের অভাব পূরণ করতে দীঘি কেটে দিত। পাড়া পড়শিরা সে জলে তাদের কাজকর্ম সেরে নিত প্রতিদিন। দীঘিগুলো এখনো সেই ইতিহাস বহন করছে। এখনতো জলের অভাব হয় না; বাঁচার অভাব দেখা দিয়েছে। তাই শেষ ভরসা রাখছে দীঘির একটু জলের ওপর। জলই প্রাণ।

আবেদ আলি কোষ কোষ করে জল পান করতে লাগল। ইনতেসারকে ডেকে বলল- বাবা একটু জল খাও, জেয়ানশক্তি বাড়ব। ইনতেসার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে জল তুলে গলায় হাত রেখে ঢোক গিলতে লাগল। আবেদ আলি গণজামায়েতের সামনে এসে দাঁড়াল। কেউ কিছু বলছে না; তার মানে মুখে গন্ধ নেই। আবেদ আলি আকাশের দিকে তাকিয়ে মুখ খুলে জোরে নিশ্বাস নিতে লাগল। দৌড়ে গেল মাজারের কাছে এবং জেয়ারত করে কান্নাকাটি করতে লাগল।

ইনতেসার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল- বাবা তোমাকে কেমন অস্থির লাগছে? না ইনতেসার। এখন আমি ঠিক আছি। দু’জনে সিএনজিতে উঠল। গাড়ি এসে থামল গাঁয়ের মাথায়। ইনতেসার বাড়ি চলে গেল। বশু মিয়ার দোকানে অনেক লোক। আবেদ আলি এগিয়ে গেল।

বশু মিয়া বলল- গেছিলা? হ ভাই। তুমি আইছ আরই টের পাইছি? কোন গন্ধ নাই। হঠাৎ হাওয়া বইতে লাগল। সবাই নাক-মুখ চেপে ধরল।

চারদিকে তাকিয়ে বলল- আবেদ আলি বাগ.. বাগ...।

আবেদ আলি বাতাসের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল- ওই মিয়ারা নাক ছাড়েন খালের দিকে তাকান। সবাই তার সাহস দেখে হকচকিয়ে গেল এবং খালের দিকে মুখ ফিরাতে ফিরাতে থু থু ফেলতে লাগল। চিটাগুড়ের মতো জল, পোকামাকড়ের বসত, শ্যাওলা পচে ফুলে উঠেছে খাল। তারা নাক চেপে চেপে বাড়ি চলে গেল। আবেদ আলি রাস্তিদীঘির দিকে রওয়া হয়ে গেল।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads