রুবাইয়াত ও তার ঘুঘু

বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী


poisha bazar

  • ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১৫:২৩

দুষ্টুমি করে সারাবেলা কাটে ছোট্ট খোকা রুবাইয়াতের। কখনো পাটখড়ির আগায় গাছের আঠা মাখিয়ে ফড়িং-প্রজাপতির পিছু পিছু দৌড়ে, কখনো নীল-সাদা আকাশে ঘুড়ি উড়িয়ে, কখনো সবুজ ধান ক্ষেতের পাশ দিয়ে বয়ে চলা খালের পানিতে গামছা দিয়ে ছোট্ট খলিসা, ডানকিনা, তিতপুঁটি ধরে আবার কখনো এ বাগান থেকে ও বাগানে হরেক রঙয়ের পাখি দেখে। যদিও মা সারাদিন চোখে চোখে রাখে দুষ্টু-মিষ্টি রুবাইয়াতকে, কিন্তু সুযোগ পেলেই সে পাখির মতো ফুড়ুৎ করে উড়ে বেড়ায় তার নিজের স্বপ্নরাজ্যে।

এভাবেই একদিন সে বাড়ির পিছনে বাগানের ঘাসের উপর বসে আনমনে পাখির কিচিরমিচির ডাক শুনছিল ও গাছের পাতার মাঝে পাখিদের খুনসুটি দেখছিল। হঠাৎ করে গাছের ঝোপ থেকে তার সামনে টুপ করে পড়ল একটি তুলতুলে সুন্দর ঘুঘু পাখির বাচ্চা। গাছ থেকে পড়েই বাচ্চাটি অজ্ঞান হয়ে গেল। রুবাইয়াত এদিক ওদিক তাকিয়ে ভীষণ ভয় ও চিন্তার মাঝে পড়ে গেল। এই ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে সে কি করবে? এই বাচ্চাটাকেতো ওর বাসাতেও সে ফিরিয়ে দিতে পারছে না আবার বাড়িতে নিয়ে গেলে নির্ঘাত মায়ের বকুনি হজম করতে হবে। নানা কিছু ভাবতে ভাবতে সে ঘুঘু পাখির বাচ্চাকে বড় একটা কচু পাতার মাঝে লুকিয়ে বাড়িতে নিয়ে এল। এরপর সে টিউবয়েলের কাছে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাটির মাথায় পানি দিল, ঠোঁট ফাকা করে পানি পান করাল ও ফুঁ দিতে লাগল। এভাবে কিছুক্ষণ শুশ্রুষার পর ঘুঘু পাখির বাচ্চাটি খানিকটা চোখ মেলে তাকাল। রুবাইয়াত বাচ্চাটিকে মাটিতে নামিয়ে দিয়েই বুঝতে পারল এর একটি পা মচকে গেছে। তখন সে দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে একটুকরো ব্যান্ডেজ ও ওষুধ দিয়ে পাখির বাচ্চাটার পা বেঁধে দিল।

এদিকে রুবাইয়াতের মনে তখনও চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, এই বাচ্চা পাখিকে কি সে পুষবে না ঐ বাগানে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে? অনেক ভেবে চিন্তে সে দুরু দুরু বুকে পাখির বাচ্চাটিকে নিয়ে মায়ের কাছে গেল। মা রুবাইয়াতের এসব কান্ড শুনে হেসেই ফেলল। এরপর মা সুন্দর করে পাখির বাচ্চাটির জন্য বাঁশের কঞ্চি, খড় ও নারকেলের পাতা দিয়ে একটা থাকার বাসা বানিয়ে দিলেন। রুবাইয়াত এই পাখির বাসা পেয়ে তখন খুশিতে আটখানা। নাচতে নাচতে সে পাখির বাচ্চা ও বাসাটি নিয়ে নিজের ঘরের সামনে চলে এলো। এরপর ঘরের খাটের স্ট্যান্ডের সাথে দড়ি দিয়ে বাসাসহ বাচ্চাটিকে ঝুলিয়ে রাখল, যাতে সে সবসময় চোখে চোখে রাখতে পারে।
রুবাইয়াতের এখন সারাদিনের ধ্যান-জ্ঞান পাখির বাচ্চাকে ঘিরেই। সারাদিন সে বাচ্চাটির সাথে কথা বলে, খেতে দেয়, খেলা করে, কখনো হাতে নিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়ায়। রুবাইয়াতের পিছনে তখন থাকে ছোট বাচ্চাদের দল। রুবাইয়াত নেতার মতো পাখির বাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের দলটাকে নেতৃত্ব দিতে দিতে এগোতে থাকে। পাড়াময় ছড়িয়ে পড়ে রুবাইয়াত ও তার আদুরে ঘুঘু পাখির গল্প।

এভাবে দেখতে দেখতে হ্যান্স এন্ডারসনের রূপকথার গল্পের মতো ঘুঘু পাখির বাচ্চাটিও দ্রুত বড় হয়ে উঠতে লাগল। তখন পাখিটির শরীরে সুন্দর পালক, গলার নিচে সুন্দর মালা, লেজে সাদা ও খয়েরি পালকের বর্ণিল সমারোহ। একদিন পাখিটি উড়তেও শিখে গেল। ফুড়ুৎ ফুড়ুৎ করে খাচার এ মাথা থেকে ও মাথায় ওড়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। আকাশ ফুড়ে ওঠা ভোরের সোনালি আলো ফোটার সাথে সাথে পাখিটা যখন গলা ফুলিয়ে ঘু ঘু করে ডাকে, কতো সুমধুর লাগে শুনতে। দূর থেকে এই ডাক শুনে রুবাইয়াতদের বাড়িতে পাখ-পাখালিরা হাজির হয়। তাদের সবার ডাকাডাকিতে বাড়ির চারপাশে চমৎকার এক আবহ তৈরি হয়। রুবাইয়াতদের পাশের বাড়ির বিড়ালটা মাঝে মাঝে ঘুঘু পাখিটাকে বিরক্ত করে। তাই দেখে রুবাইয়াত বিড়ালটাকে মিষ্টি করে বকুনি দিয়ে দেয়।

ঘোরলাগা এক বিকেলে রুবাইয়াতের ভীষণ ইচ্ছে হলো পাখিটিকে বাড়ির পিছনের গহীন বনের মাঝে ছেড়ে দিয়ে আসবে। সে মায়ের কাছে শুনেছিল পাখিরা বনেই সুন্দর এবং বদ্ধ জীবন ভালোবাসে না বরং ডানা মেলে মুক্ত প্রকৃতিতে উড়ে বেড়াতে ভীষণ পছন্দ করে। যেই ভাবা সেই কাজ, তাই সে খাচা নিয়ে হাটা দিল বাড়ির পেছনের দিকে। একটি বেশ বুড়ো আমগাছের পাশে এসে সে দাঁড়াল। আনমনে কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে খাঁচার দরজা খুলে দিল। ঘুঘু পাখিটি খাঁচার মাঝে এদিক ওদিক হেঁটে খানিক বাদেই উড়ে গেল আমগাছের ঝোপের মাঝে। পাখিটিকে প্রকৃতির মাঝে মুক্ত করে দিয়ে রুবাইয়াত বেশ দুঃখী মনে চোখে জল নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। এরপর দুই-তিন দিন কেটে গেল। রুবাইয়াতের খাওয়া-দাওয়াতে তেমন মন নেই, সারাদিন খুব একা একা মন খারাপ করে ঘরের এক কোনে বসে থাকে। দুষ্টু-চঞ্চল ছেলেটা কেমন যেন মিইয়ে গেল।

তা দেখে মায়েরও ভীষণ মন খারাপ হয়। মা রুবাইয়াতের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বোঝাতে লাগল, রুবাইয়াতের প্রিয় পুডিং বানিয়ে দিল কিন্তু তাতেও তার মন ভালো হলো না। এরই মাঝে একদিন অলস দুপুরে ঘরের পাশ থেকে সেই সুপরিচিত ঘু ঘু ডাক ভেসে আসতে লাগল। প্র?থমে মা ও রুবাইয়াত মনের ভুল ভেবে বসে রইল। কিন্তু ধীরে ধীরে ডাকের তীব্রতা বেড়েই চলল। ঘরের পাশের পেয়ারা গাছের কাছে গিয়ে আনন্দে রুবাইয়াত একটা গগনবিদারী চীৎকার দিল, আজ যে তার সেই ছেড়ে দেয়া ঘুঘু পাখিটা ফিরে এসেছে। অনেকদিন পর মহা আনন্দে আজ রুবাইয়াত মায়ের পরম মমতামাখা হাতে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাত দিয়ে রুই মাছ ভাজা, হাঁসের ডিম ভুনা ও ডাল পেটপুরে খেয়ে নিজের ভালোবাসার ঘুঘু পাখিকে নিয়ে ঘুমুতে গেল।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads