দুই পরিবার

বাসুদেব খাস্তগীর


poisha bazar

  • ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১৫:১৬

গ্রামের নাম জলিলপুর। একাত্তরের সেই উত্তাল দিনের বাংলা সনের অগ্রহায়ণ মাস। চারিদিকে যুদ্ধের সমারোহ, অস্ত্রের ঝনঝনানি। দেশ মাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত আছে মুক্তিযোদ্ধারা। পাক বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য এ দেশীয় কিছু মানুষ সৃষ্টি করেছে রাজাকার আলবদর বাহিনী। পাড়ায় গড়ে উঠেছে মুক্তি বাহিনী, গোপনে কেউ কেউ গড়ছে স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার আলবদর বাহিনী। জলিলপুর গ্রামের দুই পরিবারের দ্বন্দ্ব বহু পুরানো।

এক পরিবার জামসেদ চৌধুরী পরিবার, আরেক পরিবার খোরশেদ সিকদার পরিবার। সবাই বলে চৌধুরী পরিবার আর সিকদার পরিবার। জায়গাজমি নিয়ে মামলা মোকদ্দমা, নেতৃত্ব নিয়ে দ্ব›দ্ব যেনো দুই পরিবারে বংশ পরম্পরায়। সব কিছুতেই দুই পরিবারের দুই মেরুতে অবস্থান। একাত্তরে স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয় চৌধুরী পরিবার। এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা খাওয়া আশ্রয় দেয়াসহ নানা কর্মকাণ্ডে চৌধুরীদের কাচারি ঘর আলোচিত হয়ে ওঠে।

যেহেতু চৌধুরী পরিবার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সিকদার পরিবার বিপক্ষে অবস্থান নেবে স্বাভাবিক। তবে সিকদার পরিবার যে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে তা প্রকাশ্যে নয়। লোকে মুখে প্রচলিত আছে তারা ভিতরে ভিতরে রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলতে সক্রিয়। সেদিন জামসেদ চৌধুরী কাজের লোক মফিজকে ডেকে বলে, ‘শোন মফিজ তুই বাড়ির গরু ছাগলের দেখভাল করিস, সাথে সাথে চারিদিকে খেয়াল রাখবি কে কোথায় কী করছে?’ -‘কেন হুজুর?’ -‘দেশের পরিস্থিতি খারাপ, শুনছি সিকদার পরিবার রাজাকার বাহিনী গঠন করছে, তুই তো ওই দিকে গরু ছাগলের পাল নিয়ে যাস, নজর রাখবি ওদিকে।’-‘জ্বি আচ্ছা।’ বলেই সে গরু ছাগলের পাল নিয়ে নদীর ক‚লে চলে গেলো।

জামালপুর গ্রাম অনেক বড় গ্রাম। দুই বাড়ির দূরত্ব প্রায় এক কিলোমিটার। চৌধুরী বাড়িতে বিকেলে পড়তে আসে পাশের গ্রামের ছেলে রাকিব। সে দশম শ্রেণিতে পড়ে। অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু একবারে হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। কাচারিতে পড়ান পাড়ার মাস্টার নোমান স্যার। সেদিন বিকেলে রাকিব পড়তে এসেছে। কিন্তু স্যার তখনও আসে নি। চৌধুরী সাহেব হতচকিত হয়ে কাচারিতে ঢুকলেন।- ‘কী রে মাস্টার আসে নাই?’ রাকিব সালাম দিয়ে বলে ‘না আংকেল।’ বেশ চিন্তিত তিনি।

এমন সময় কাজের লোক মফিজ বলে, ‘হুজুর আপনাকে বেশ চিন্তিত মনে হচ্ছে? কিছু হয়েছে হুজুর?’-‘তুই এখনও গরু ছাগলের পাল নিয়ে যাস নি?’-‘এই বের হচ্ছি হুজুর।’-‘শোন একটা খবর আসছে কানে, আজকে নাকি সিকদার বাড়িতে রাজাকারদের বৈঠক হচ্ছে।’ মফিজ বলে ‘বলেন কি হুজুর ?’

চৌধুরী সাহেব বলেন-‘কী করা যায় বলতো?’ বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে চৌধুরী সাহেব বললেন,‘মাথায় বুদ্ধি একটা আসছে মফিজ, কিন্তু সে সাহসী ছেলে কই পাই ? তোকে তো ওরা চিনে ফেলবে।’-‘বুদ্ধিটা কী হুজুর বলেন ? দেখি কী করা যায়।’

চৌধুরী সাহেব বলেন,‘তুই যখন গরু ছাগলের পাল নিয়ে নদী ক‚লে যাবি, তখন দুটি ছাগল সিকদার বাড়ির দিকে ছেড়ে দিতে হবে।’ ‘তারপর কী হবে?’ কৌতূহলী প্রশ্ন মফিজের।-‘এর পর ছাগল দুটো সিকদার বাড়ির বাগান বাড়িতে ঢুকলে ছাগল খোঁজার অজুহাতে সিকদার বাড়িতে ঢুকে কোন বৈঠক হচ্ছে কীনা কৌশলে দেখে আসা যাবে।’-‘বুদ্ধিতো মন্দ না, কিন্তু আমাকে তো চিনে ফেলবে সিকদার সাহেব।’ তাই তো বলি ‘তুই অনেক বছর ধরে আমার বাড়িতে আছিস।’

শুনেই রাকিব বলে ‘আংকেল আপনাদের কথা আমি শুনছি, আমি পারবো। আমাকে চিনবে না’।-‘বলিস কী তুই ছোট্ট ছেলে, অত ঝুঁকিতে তোকে ফেলা দেয়া ঠিক হবে না।’ -‘না আমি পারবো। স্কুলে আমি কতো নাটকে অভিনয় করেছি। আমি ঠিকই পারবো।’ রাকিবকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, দেশপ্রেম এগুলো নিয়ে অনেক কথা বলে নোমান স্যার। তার ভালোই লাগে। নোমান স্যারও মুক্তিযোদ্ধা, গোপনে গোপনে কাজ করেন। রাকিবের দৃঢ় প্রত্যয়ে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত, রাকিবেই কাজটা করবে। মফিজ গরু এবং ছাগলের পাল নিয়ে বের হলো। নদীর ক‚লে গিয়ে দুটি ছাগল সিকদার বাড়ি অভিমুখে ছেড়ে দিলো মফিজ। আর রাকিবকে দেখিয়ে দিলো সিকদার বাড়ি। বাড়ির আঙিনায় বিশাল বাগান ঠিক চৌধুরী বাড়ির মতো। ঘণ্টা খানেক পর একটু সন্ধ্যা নামে এমন সময় রাকিব ছাগল খোঁজার ভানে সিকদার বাড়ি উপস্থিত।

বাড়ির উঠোনে পৌঁছতেই লম্বা আকৃতির বিশাল দেহের এক লোক বলে ‘এই তুই কে ? বাড়িতে ঢুকেছিস?’ রাকিব ভাবে ইনিই হয়তো সিকদার সাহেব।-‘হুজুর আমি আমার ছাগলের খোঁজে এসেছি, নদী পাড়ে ছাগল নিয়ে বের হয়েছিলাম, কোন ফাঁকে যে ছাগলগুলো আমার চোখ ফাঁকি দিয়ে কোন দিকে গেলো?’

‘বেয়াদব কোথাকার। তোর ছাগল ? দেখ আমার বাগান খেয়ে কী করেছে তোর ছাগল।’

হঠাৎ উঠোনের কোণে দেখে একটা ছাগল, পাশে বেশ কিছু লোক। দৌড়ে গিয়ে দেখে একটাকে জবাই করা হয়েছে, আরেকটা জবাই করার প্রস্তুতি চলছে। সিকদার সাহেব বলে, ‘এই তোমার ছাগল? চলে যাও এগুলো দিয়ে রাতে দাওয়াত হবে। বিদেশী মেহমান আসবে, ওদের আবার ছাগলের গোশতো খুব পছন্দ।’ রাকিব অঝোর ধারায় কেঁদে ফেলে। বলে ‘আমরা গরিব মানুষ, আমাদের সব আশা ভরসা শেষ করে দিলেন হুজুর।’ বলতেই কাঁদতে থাকে রাকিব।

তার সামনেই আরেকটি জবাই করা হয়। রাকিব দেখে ভেতরে তিন চারজন লোক পান চিবুচ্ছে, আর হাসছে। বিষণ্ণ চিত্তে রাকিব বাড়ি ফেরে। সন্ধে গড়িয়ে রাত হয়ে এলো। চৌধুরী সাহেব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। বাড়িতে ইতিমধ্যে উপস্থিত হয়েছেন নোমান স্যার, উপস্থিত আরো বেশ কিছু লোক। রাকিব উপস্থিত হতেই সবাই এগিয়ে এসে বলে ‘তোর কোন অসুবিধে হয়নি তো? তোকে তে নিষেধই করছিলাম।’ বলেন চৌধুরী সাহেব।

রাকিব বলে, ‘আংকেল, ছাগল দুটো ওরা জবাই করে রাতে দাওয়াত খাওয়াচ্ছে, সেখানে নাকি রাতে বিদেশী মেহমান আসবে।’ চৌধুরী সাহেব বলেন, ‘ছাগলের জান যখন গেছে তোদেরও যাবে।’ রাকিবকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হলো। রাতে খবর দেয়া হলো মুক্তিযোদ্ধাদের। সবাই সংগঠিত হয়ে রাতে সিকদার বাড়িতে আক্রমণ। অনেকেই হতাহত। পরের দিন পত্রিকায় এ অপারেশন শিরোনাম হয়ে আসে। সিকদার সাহেব আহত হয়ে হাসপাতালে। মনে মনে ভাবেন ‘এত সতর্ক থাকার পরও কোথা থেকে যে কী হয়ে গেলো!’

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads