হারিয়ে যাওয়া ডাকটিকিট

বেনজীর আহমেদ সিদ্দিকী


poisha bazar

  • ২০ নভেম্বর ২০২০, ১৬:০১,  আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২০, ১৬:১২

মনে পড়ে সেই দুরন্ত শৈশব-কৈশোরে বাড়িতে আসা চিঠির খামের জন্য প্রতীক্ষার কথা? পাওয়া মাত্রই চোখ চলে যেত চিঠির খামের কোনো এক পাশে আঠা দিয়ে লাগিয়ে রাখা শখ ও স্বপ্নের ডাকটিকিটের ওপর। এরপর কত কায়দা কসরত করে সেই ডাকটিকিট তুলে অ্যালবাম বা খাতার মাঝে সংগ্রহ করে রাখা। স্কুলের ব্যাগে করে ডাকটিকিটের অ্যালবাম নিয়ে বন্ধুদের দেখিয়ে আনন্দিত ও গর্বিত হওয়া। কত আকার, আকৃতি, রঙের বাহার ছিল সেসব ডাকটিকিটের! ডাকটিকিট নিয়ে সেসব আবেগময় ও সোনাঝরা দিনের কথা মনে পড়লে এখনো নিশ্চয়ই ভীষণ স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন সংগ্রাহকরা।

মানুষের নানা ধরনের শখ থাকে। কেউ শখ করে ফুল-ফল, শাক-সবজির বাগান করে, কেউ পশু-পাখি পোষে, কেউ বিভিন্ন জিনিস সংগ্রহ করে। এসবের পাশাপাশি নাচ করা, গান গাওয়া, ছবি আঁকা, বই পড়া, ঘোরাঘুরি এগুলোতো আছেই। শখ হিসেবে মানুষের সংগ্রহ করা জিনিসগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই আছে, যেমন: ম্যাচের বাক্স, পুরনো পত্রিকা ও বইপত্র, বিখ্যাত ব্যাক্তিদের অটোগ্রাফ, কয়েন, পুরনো মূর্তি, বিভিন্ন দেশের পুরনো ঐতিহ্য, ইত্যাদি। তবে এগুলোর মাঝে সবসময়ের জন্য বহুল জনপ্রিয় শখ হচ্ছে ডাকটিকিট সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা। তাই ফিল্যাটেলি বা ডাকটিকিট সংগ্রহকে ‘সংগ্রহ জগতের বৃহত্তম শখ’ বলা হয়।

একসময় যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ডাকযোগে চিঠি-পত্র বিনিময় এবং তখন এই কাজে হরহামেশা ডাকটিকিট ব্যবহৃত হতো। তাই সংগ্রাহকদের অন্যতম আগ্রহ ছিল ডাকটিকিটের প্রতি। কিন্তু বিজ্ঞানের ব্যাপক উন্নতির ফলে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মোবাইল এবং ইন্টারনেট দিনে দিনে আগেকার সেই চিঠি-পত্রের জায়গা নিয়ে নিয়েছে। ফলে এখন আগেরমতো খুব একটা চিঠি-পত্র বিনিময়ের প্রয়োজন পড়ে না। এরই ধারবাহিকতায় চিঠি-পত্রের সাথে সাথে ডাকটিকিট ও এর সংগ্রাহক সংখ্যা আস্তে আস্তে অনেক কমে এসেছে। তবে শখের দুনিয়া থেকে কালের পরিক্রমায় ডাকটিকিট সংগ্রহের রং অনেকখানিই হারিয়ে গেলেও এখনো পৃথিবীর নানা প্রান্ত এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ডাকটিকিট সংগ্রাহকদের দেখা মেলে। তবে কথা না বাড়িয়ে চলুন ডাকটিকিটের রাজ্য থেকে একটু ঘুরে আসি।

ডাকটিকিট এক টুকরো কাগজ যা ডাকমাশুল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নানা বর্ণের এসব ডাকটিকিটগুলোতে বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, ইত্যাদি বিষয় ফুটে ওঠে। সাধারণত চারকোনা বা বক্স আকৃতির হয়ে থাকে তবে ত্রিকোনাকার, গোলাকার, তারা আকৃতিরসহ বিভিন্ন আকৃতির ডাকটিকিট পাওয়া যায়। ডাকটিকিট সাধারণত কাগজের তৈরি হয়ে থাকে, কিন্তু বিশেষ দিবস বা উপলক্ষে সিনথেটিক কাপড়, কাঠের ফাইবার দিয়ে তৈরি ডাকটিকিটের ব্যবহার দেখা যায়।

প্রতিটি দেশের ডাক ব্যবস্থায় ডাকটিকিটের ব্যবহার আছে। তাই প্রতিবছর ডাকটিকিট প্রকাশ পায় এবং বিশেষ বিশেষ দিনকে স্মরণ করে রাখার জন্য ডাকটিকিট প্রকাশ করে থাকে ডাক বিভাগগুলো। ব্রিটেনের রোল্যান্ড হিলকে ডাকটিকিটের জনক বলা হয়। ১৮৪০ সালে তার প্রস্তাবানুসারেই প্রাপকের পরিবর্তে প্রেরক কর্তৃক ডাকমাশুল দেবার রীতি প্রবর্তন করা হয়। পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকিটও প্রকাশিত হয় ১৮৪০ সালে। যুক্তরাজ্যে প্রকাশিত এই ডাকটিকিট দেখতে পুরো কালো রঙের। রঙের কারণে এর নাম হয়েছে বøাক আর ডাকটিকিটের মূল্যমান ১ পেনির হওয়ায় দুটো মিলে পেনি বøাক নামকরণ হয়েছে। ব্রিটেনের রানীর প্রতিকৃতি ছিল সেই ডাকটিকিটে। ১৮৪৩ সালে ব্রিটেনের পরে ব্রাজিল হলো দ্বিতীয় দেশ যেখানে ব্যবহারের জন্য বৈধ আঠা লাগানো ডাকটিকিট চালু হয়। আস্তে আস্তে অন্যান্য দেশগুলোও অভ্যন্তরীণ ডাকের ক্ষেত্রে তা চালু করে। স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন অর্থাৎ ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের ২৯ তারিখ বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়। এ সময় ৮টি ডাকটিকিট প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ডাকটিকিট ছাপানো শুরু করে। ডাকটিকিটগুলো প্রকাশিত হয় লন্ডনের ফরম্যাট ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে। এই ডাকটিকিটগুলোর নকশা প্রণয়ন করেন বিমান মল্লিক।

তবে সেই ১৮৪০ সালের পর থেকে আজ অবধি বিশ্বে এত বিপুল সংখ্যক ও বিবিধ রকমের ডাকটিকিট প্রকাশিত হয়েছে যে কারো পক্ষেই সব সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাই সংগ্রাহককে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যেকোনো ক্যাটাগরির ডাকটিকিটগুলো সে সংগ্রহ করবে। সাধারণত ডাকটিকিট সংগ্রহ করা হয় দেশভিত্তিক ও বিষয়ভিত্তিক। দেশভিত্তিক সংগ্রহের ক্ষেত্রে নিজ দেশের ডাকটিকিটকে অনেকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। বিষয়ভিত্তিক সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংগ্রাহকের আগ্রহ ও ভালো লাগা নির্ভর করে। মৌমাছি, ফুল, পাখি, খেলাধুলা, সেতু, যানবাহন, ব্যক্তিত্ব এ রকম অসংখ্য বিষয়ের মধ্য থেকে পছন্দের বিষয়টি বেছে নেয় অনেকে। ডাকটিকিট সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য একজন সংগ্রাহক অ্যালবাম, টুইজার (চিমটা), মাউন্ট, ম্যাগনিফাইং গøাস, এ রকম অনেক কিছুই ব্যবহার করে থাকেন। তবে সঠিক নিয়মে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ না করলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে ডাকটিকিট।

ডাকমাশুল আদায়ের লক্ষ্যে ডাকটিকিটের জš§ হলেও অল্প কিছুদিনের মাঝেই এর সংগ্রহ অনেক মানুষের শখে পরিণত হয়। দিনে দিনে অনেক রাজা-বাদশারও শখ হয়ে ওঠে ডাকটিকিট সংগ্রহ। তাই তো একে বলা হয়ে থাকে, ‘শখের রাজা, রাজার শখ’। একসময় আমেরিকার ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট, রানি এলিজাবেথ (২), প্রিন্স রেইনিয়ার (৩), চার্লি চ্যাপলিন, ওয়ারেন বাফেট, জন লেনন, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি, টেনিস প্লেয়ার মারিয়া শারাপোভা, দাবার গ্র্যান্ডমাস্টার আনাতোলী কারপোভসহ সারা পৃথিবীর প্রায় ২ কোটি মানুষের প্রধান শখ ছিল ডাকটিকিট সংগ্রহ করা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভুটানে এখনো দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ডাকটিকিট সংগ্রহ বাধ্যতামূলক। এটা তাদের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত এবং ভুটানের রাজস্ব আয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ আসে ডাকটিকিট থেকে।

কতদিন আগে শেষ চিঠি হাতে লিখে খামে ভরে ডাকটিকিট লাগিয়ে কাউকে পাঠিয়েছেন, মনে পড়ে কি? এমনকি অনেক সংগ্রাহকও হয়ত মনে করতে পারবেন না যে, শেষ কবে চিঠির খাম থেকে ডাকটিকিট তুলেছেন! আসলেই বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের এসব মনে পড়ার খুব একটা সুযোগ নেই। তাই শখের রাজা ‘ডাকটিকিট সংগ্রহ’ আমাদের স্মৃতির মণিকোঠায় যত্নে বেঁচে থাকুক।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads