গল্প

নাহিদ বিষয়ক কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন

দেওয়ান শামসুর রকিব


poisha bazar

  • ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৬:১২

করোনাকালীন সময়ে বাসা বদল একটা ঝামেলার কাজ। রশিদ হাসান বাড়ি বদল করতে না চাইলেও বদলাতে হলো। প্রায় দুমাস হয় বড়ভাই নাহিদ হাসান মারা গিয়েছেন। মানুষের মৃত্যু, জন্মের পর থেকে অপেক্ষায় থাকে। সেই মৃত্যু বেশি বয়সকালে হলে মানুষ সামলে নেয় বা মেনে নেয়। দুঃখবোধ বা আফসোস কম হয় কিন্তু যুবক বয়সের মৃত্যু মেনে নিতে কষ্ট হয়। সকলেই তা সহজে মানতেও পারে না।

নাহিদ হাসানের মৃত্যুর পর মা জাহানারা আরো বেশি চুপ চাপ হয়ে গেলেন। মার সাথে রশিদের খুব যে কথা হতো তাও নয়! আর বিগত দুই বছরে মা-ছেলের কথা তো ছিলো নাহিদ হাসানকে ঘিরে। মনোচিকিৎসক, ঔষধ আর ভাইয়ের সুস্থতা এই আলোচনা মধ্যে পার হয়েছে বছর জুড়ে।

নাহিদ গভীর দুশ্চিন্তা, মানসিক অবসাদের ভেতরে ছিলেন। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথমবার মতো একনামকরা নিউরো চিকিৎসাকের কাছে দেখাতে নিয়ে গেলে তিনি জানান নাহিদের এই মানসিক সমস্যার কথা। সেই সময় নাহিদের ঘুম হচ্ছিলো না, খেতে ইচ্ছা করত না, জীবনে কোনো কিছুই ভালো লাগত না তার। সব সময়ে ভীত ছিলেন তিনি, বেঁচে থাকার ইচ্ছেও হারিয়ে ফেলেছিলেন। বলছিলেন ওই চিকিৎসক। খুব ভালো একজন মনোচিকিৎসক দেখাতে বলেন তিনি। বন্ধু ও পরিচিত জনদের সাথে আলোচনা করে ডাক্তার আফসার আলীর খোঁজ পান রশিদ হাসান। সাইকিয়াট্রিস্ট হিসেবে খুব নাম-ডাক তার। টিভিতে প্রায়ই রির্পোটিং বা টকশোতে দেখা যায় এই সংক্রান্তবিষয় আসয়ে।

তার ছিমছাম সুন্দর চেম্বারে নাহিদ হাসানসহ রশিদ উপস্থিত হন কোন এক সন্ধ্যায়। প্রথম পরিচয়ে খুব ভালো লেগেছিল রশিদের। নাহিদকে সময় নিয়ে যত্নে সহকারে দেখলেন তিনি। বাইপোলার ডিসঅর্ডার-এ ভুগছেন নাহিদ জানালেন ডাক্তার আলী। গত বছর নভেম্বর মাসে নাহিদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কদিনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভয় আর অবসাদ থেকে ডিলিউশন, হ্যালুসিনেশন, ইনসমনিয়া নানাবিধ উপসর্গ দেখা যাচ্ছিল তখন। এ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবনতা দেখা দিতে পারে জানিয়েছিলো ডাক্তার আলী। পুরো ব্যাপারটা শুনে নিজের মধ্যে রেখে ছিলো রশিদ, মাকে এতকথা বলা হয়নি বা বলতে ইচ্ছে ছিলো না রশিদের। রশিদ চাইছিলো, দ্রæত কেউ তাকে সুস্থ করে দিক। তা কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। কোনো কারণ ছাড়াই বিষন্ন থাকতেন নাহিদ।

নানান উপর্সগগুলো পর্যায়ক্রমে বারতে থাকায় মা আর রশিদ পালাক্রমে থাকতে হতো নাহিদের কাছে। এক সময় মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করার কথা ভেবেছিলো রশিদ কিন্তু মার নিষেধের কারণে আর হয়নি। শেষ সময়টা মাই সামলেছেন নাহিদের পাগলামি।

পাগলামি বলতে সে এক করুন আর্তনাদ। আর্তনাদের অস্ফুতস্বর জড়োসড়ো আর ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতেন খাটের এক কোনে। মাকে নয়তো রশিদকে অনেক সময় জরিয়ে থাকতেন। আবার চলে যেতে বলতেন। অবসাধে দেয়ালের দিকে নয়তো সিলিং এর দিকে ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকতেন। ডাক্তারের কথায় নজরদারি ছিলো সব সময়। কারণ যে কোন সময় আত্মহত্যা করে বসতে পারে! নানান উপসর্গের আক্রান্ত এই লোকটি কিভাবে আত্মহত্যা করবে? ভাবনার জায়গাটা কোথায়? একা একা ভেবে কথার কোন উত্তর পেতে না রশিদ।

অত্মহত্যা করতে আর হয়নি নাহিদকে, সকালে মৃত অবস্থায় আবিষ্কার করেন মা। ঘুম থেকে ডেকে আনেন রশিদকে। দুজনেই মৃত লাশ নিয়ে কতক্ষণ বসে থাকেন ভাবলেশহীন ভাবে! কি করবেন? কি করা উচিত? দুজনেই বুঝতে পারছেনা যেন। অবশেষে ডাক্তার আলীকে ফোনে জানান রশিদ।

ডাক্তারি সাটিফিকেটের মাধ্যমে জানা গেল হার্ট অ্যাটাকের মারা গেছেন রশিদ। মুলতঃ নাহিদের মৃত্যুর পর বাসার নিঃশব্দতা ভীড় করে আছে যেন। মা তার রুমে থাকেন বেশিরভাগ সময়। মার ব্যাপারটি বুঝতে পারে রশিদ। বিবাহিত জীবনে দীর্ঘ সাত বছর অপেক্ষার পর জন্ম নেয় নাহিদ। এই সময়টা প্রচন্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়েছিল জাহানারাকে। প্রথম সন্তান তাও আবার ছেলে, খুশিতে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিলেন নাহিদের বাবা নাজমুল হাসান। প্রচন্ড ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র ছিলেন নাহিদ। বুয়েটে থেকে পাশ করে ডক্টরেট করার জন্য বিশ্বের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালর্ফোনিয়ায় পড়ার চান্স পেয়েছিলো নাহিদ হাসান। সেই সময় বাবার হঠাৎ মৃত্যু সবকিছু উলটপালট করে দেয়। গবেষণা ধর্মী একটি ফার্মে চাকরি নিতে হয় নাহিদকে। সেখানে কাজে করতে গিয়ে ভালো না লাগায় ছেড়ে দেন। কিছুদিন পরে একটি প্রাইভেট ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে চাকরি নেন। ভালোই কাটছিলো কিন্তু হঠাৎই আস্তে আস্তে মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে থাকেন নাহিদ। কেন, কিভাবে শত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার আগেই দু'বছরের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের মাধ্যমে নাহিদের জীবনাবসান ঘটে।

দুই.

সেই ভাড়া বাড়িতে আর থাকা যাচ্ছিলনা কারণে অকারণে নাহিদের রুমটি গভীর শূন্যতার নিমজ্জিত করতে থাকে রশিদকে আর বিশেষ কর মা জাহানারাকে। এক সময় পরিচিত বাসাটা এক নিমিষে অন্ধক‚প হয়ে যায়। মার নিস্তদ্ধতা আরো বেশি করুণ আর ব্যথাময় হয়ে উঠছিলো যেন।
-মা, বাসাটা বরং ছেড়ে দেই, আমার আর ভাল্লাগছে না? হঠাৎই বলে ফেললো রশিদ সকালের নাস্তা খেতে খেতে।
মা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন-তুই যা ভালো মনে করিস।
রশিদ আর দেরি করেনি, অফিস কলিগের সহায়তায় উত্তরায় ১৪ নং সেক্টর বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলে আসে। নতুন করে বাসা সাজাতে গিয়ে নাহিদের জিনিসপত্র একটি আলমারিতে তালাবদ্ধ করে রাখা হয় ফলে নাহিদের উপস্থিতি সেভাবে আর বিচলিত করেনা।

মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করার কারণে করোনাকালীন সময়ে ঘরে বসেই অফিস করতে হচ্ছে রশিদকে। ফলে খুব বেশি বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই তার। তারপরও শরীর ঠিক রাখার জন্য সেক্টরের পার্কে প্রতিদিন সময় করো হাঁটতে আসে রশিদ। উত্তরার সেক্টরগুলোতে এটাই ভালো দিক বসবাসকারীদের বেড়ানো, খেলা আর হাঁটার জন্য পার্ক ও মাঠের ব্যবস্থা রাখা আছে। বাজার বা মার্কেট হাটা পথ বা রিক্সা দূরত্ব। এছাড়া বিপনি-বিতান, ফুড শপ, ঔষধ সবই কাছাকাছি খুব সহজে পাওয়া যায়।
মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। জীবন্ত নাহিদ চলে আসা সম্ভব না হলে আবারও নাহিদের ভাবনা চলে আসে পার্সেলের মাধ্যমে।

নাহিদের ভার্সিটি থেকে ফোন, পরে পার্সেলের প্রাপ্তি একটি ডায়েরি। নাহিদের ডেক্সটি নতুন নিয়োগ প্রাপ্ত প্রফেসর ডায়েরিটা দেখতে পান এবং হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্টকে পৌঁছে দেন, সেখান থেকে আজ রশিদের হাতে। মাকে আর ডায়েরি বিষয়টি জানায়নি রশিদ। মা ক্রমান্বয়ে নাহিদের কথা আর বলছে না, রশিদ লক্ষ্য করেছে। ফলে বিষয়টি নিজের মধ্যে রাখে রশিদ।

ডায়েরি পাতা উল্টে খালি পৃষ্ঠা ও ছেড়া পাতা পায় রশিদ। পুরোটাই খালি তা নয়, কবিতার কিছু লাইন কয়েকটি পাতায় দেখতে পায় রশিদ। এই কবিতা অংশগুলো কার রশিদের জানা নেই, রশিদ খুব কবিতা ভক্ত ছিল তাতো নয়!

"অবশেষে জেনেছি মানুষ একা! জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছেও ভীষণ অচেনা ও একা! দৃশ্যের বিপরীত সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনোদিন।"
মাঝের অনেক পেজ ছেড়া। আরো একটি পৃষ্ঠায়-"সকল লোকের মাঝে ব’সে/ আমার নিজের মুদ্রাদোষে/ আমি একা হতেছি আলাদা?আমার চোখেই শুধু ধাঁধা? আমার পথেই শুধু বাধা?"

মাঝে আবারও খালি পৃষ্ঠা, আরে জায়গায় লেখা-
"যদি ভালোবাসা পাই/ আবার শুধরে নেব/ জীবনের ভুলগুলি/ যদি ভালোবাসা পাই/ ব্যাপক দীর্ঘপথে
/ তুলে নেব ঝোলাঝুলি/ যদি ভালোবাসা পাই/ শীতের রাতের শেষে/ মখমল দিন পাবো/ যদি ভালোবাসা পাই/ পাহাড় ডিঙাবো আর/ সমুদ্র সাঁতরাবো"

ডায়েরির শেষ দিকে লেখা-
এতটা অপমান আমাকে না করলেও পারতো। ভালোবেসেছি, কোন অপরাধ করিনি।
এটা কি কোন কবিতাংশ না কাউকে সত্যি ভালোবেসেছিলো নাহিদ, যার অপমানের কারণে মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে হয়েছে তাকে?
এ প্রশ্নের উত্তর সে কোথায় পাবে? ডায়েরি ধরে ভাবনার মধ্যে ডুবে বসে থাকে রশিদ।।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads