খেলারাম খেলে যা ও বাবর আলীর যৌনযাপন

মোস্তফা মনন

খেলারাম খেলে যা ও মোস্তফা মনন
খেলারাম খেলে যা ও মোস্তফা মনন

poisha bazar

  • ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৫:৫৪,  আপডেট: ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৬:১৮

বাবর আলী আধুনিক দেবতা। সে আমাদের যৌনদেবতা। আমাদের ভারতীয় দেব-দেবীদের দেখলে প্রথমে যৌনতার কথা মনে আসে, আসতে বাধ্য। তাদের ভঙ্গি সেই কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন মনে হতে থাকে, যে যত বড় রতি খেলোয়াড়, সে তত বড় দেবতা।

সৈয়দ শামসুল হক, তাঁর আলোচিত উপন্যাস “খেলারাম খেলে যা।” এই উপন্যাসের বড় খেলোয়াড় বাবর আলী। বাঙলা সাহিত্যে তিনি আদিম রসের বড় খেলোয়ার। আমাদের দেবতা। মহাভারতের রচয়িতা ব্যাস যৌবনে নদী পার হবার সময় কিশোরী মাঝিকে বলেছিল- “আমাকে রতি দাও। আমি বর দিব।” বাবর আলী রতি চাইতেন, বর দিতে পারতেন না।

আমাদের সভ্যতা যৌনতার সভ্যতা। যৌনতাকেন্দ্রীক নগরায়নের ফলে সমাজের উৎপত্তি, সম্পদের উপর ব্যাক্তির অধিকার। এর পেছনে যৌনতাই প্রধান। মিশেল ফুকো তার দি হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি বইয়ের ‘আমরা অন্য ভিক্টরীয়’ অধ্যায়ে বলেছেন, “তবে ভিক্টোরীয় মধ্যবিত্তে একঘেঁয়েমি রাত এই উজ্জ্বল দিনের ওপর শিগগির অন্ধকার ডেকে আনে। যৌনতাকে তখন সর্তকতার সঙ্গে বন্দি করা হয়। এটি বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। বিবাহিত দম্পতি এর হেফাজতের দায়িত্ব নেয়। যৌনতাকে সন্তান উৎপাদনের একমাত্র কর্মকান্ড হিসেবে গ্রহণ করা হয়।”

ইতিহাসের এই বন্দিকাল থেকেই বাবর আলীর জন্ম। তখন থেকে বাবার আলীর আর্বিভাব ঘটে। যৌনতা ব্যাক্তিক নয়। যৌনতা সামাজিক। যৌনতা সমাজের অংশ, সমাজের অংগ। আমাদের সংস্কৃতির আর পাঁচটা গুরুত্বপূর্ন উপাদানের মতো আরেকটা উপাদান। আমরা আদতে এখানেই দ্বিধা বিভক্ত; যৌনতা ব্যক্তিক না সামাজিক?

যারা “খেলারাম খেলে যা” পড়েছেন, আমার মতো তারাও নিশ্চয় যৌনতার পেছনেই দৌড়াবেন, বাবর আলীর সাথে। অপেক্ষায় থাকবেন বাবর আলী মহা ঘটনাটা কখন ঘটাবে। এতো দেরি করছেন কেন? এতো সময় নিচ্ছে কেন? কেন ঘটাচ্ছেন না? এসব অভিমান আর জিদ বুকে চেপে পৃষ্টার পর পৃষ্টা পড়বেন আর দৌড়াবেন- বাবর আলী কী করে! আবার এও জানতে চাইতে ইচ্ছে করবে, কেন লতিফা, বাবলী, জাহেদা’রা বাবর আলীর কাছে বার বার আসে?

আমি খুঁজতে চাই, বাবার আলী কেন ছোটে? ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ, ঢাকা হতে রংপুর। এই ছুটে চলা শুধুই কী যৌনতার জন্য? যদি উত্তর হয় হ্যা। তাহলে বলবো কেন? এবং কেন একজন মানুষকে এভাবে যৌনতার পেছনে এতো সময় দিতে হবে? এতো পরিকল্পনা করতে হবে? কেন জাহেদাকে সফর সঙ্গী করে রংপুর নিয়ে যেতে হবে- সেই মাহেন্দ্রক্ষণের আশায়?

এখানেই সামাজিকতার প্রশ্ন। সামাজিক কাঠামো নতুন করে বিন্যাসের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। একাত্তরে দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। এর পরপর আমাদের রাষ্ট্রের সামাজিক কাঠামো বিনির্মাণকালে সৈয়দ হক “খেলারাম খেলে যা” দিয়ে একটা সংবাদ দেবার চেষ্টা করেছেন। নগরের যে গলি দিয়ে বাবর আলী বেড়ে ওঠে, সে গলির মুখে ল্যাম্পপোষ্ট আছে কি না? সৈয়দ হক আমাদের দ্বিধায় ফেলেছেন। আমরা বাবর আলীকে নিয়ে কী করবো!

ময়মনসিংহে যায় বাবার আলী। একাকী। সেখানে লতিফা আছে। কোন আগপিছ না ভেবে সোজা লতিফার বাসায়। লতিফা বাবর আলীর অংশ। মাঝ রাতে যখন লতিফা বাবর আলী রুমে এসে দাঁড়ায় “তখন চোখ মেলে তাকাল বাবর। দেখলো অন্ধকারে তার কোলের কাছে মৃদু সুগন্ধ ছড়ান একতাল সাদা। স্পর্শ করতেই মনে হল তা কোমল এবং উষ্ণ”। লতিফার সাথে নিরব কথনের পর, লতিফা তাকে ছেড়ে যাযার সময় কাতর বাবার আলী নিদ্বিধায় বলতে পারে “না কেন? আমি এর জন্য মরে যাচ্ছি।” গুল্ম লতিকার নেশায়। মহেজোন্দারোর ব্রোঞ্জের মূর্তীর নাভীর নিচের সেই লতিকা’র জন্য? যৌনতা মানুষকে ঠকায় না, কাতর করে। বাবর আলী কাতর হয়েছে। এই কাতরতা কখনো শঠতা হতে পারে না। বাবর আলীর শঠতা করেনি। তাকে দোষ দেওয়ার কিছু নেই। আদতে আমরা সবাই মরে যাচ্ছি। পুরুষ মরছে, নারী মরছে, কিশোর মরছে, কিশোরী মরছে। আমরা সবাই এর জন্য মরে যাচ্ছি, শুধু মরে যাচ্ছি। কেন মরে যাচ্ছি?

গত শতকের বড় দার্শনীক মিশেল ফুকো’র কাছে যেতে চাই। তিনি- ‘আমরা অন্য ভিক্টরীয়’ গ্রন্থে বলেছেন, “যৌনতা দমিত নয়। বরং অবদমনের কারণ যৌনতা ও ক্ষমতার মধ্যে ঐ সম্পর্ক বিশেষভাবে চিহ্নিত নয়। ফলে বিষয়টি একটি শ্লেষার্থে পরিণত হয়। এটি কেবল সুনির্দিষ্টভাবে গৃহীত একটি যুক্তির পাল্টা যুক্তি দ্বারা পরিচালিত নয়। এটি সামগ্রিক অর্থনীতি ও অসংলগ্ন স্বার্থসমূহ যা এই বির্তর্কের মূলে রয়েছে।”

সমাধানে পৌঁছতে পারলাম না। ফুকো দুটো শব্দ নিয়ে এসেছেন-“সামগ্রীক অর্থনীতি” ও “অসংলগ্ন স্বার্থসমূহ''। যৌনতা প্রকাশ-দমন-অবদমন। পুরো বিষয়টা সামগ্রীক অর্থনীতির সাথে জড়িত। আর অসংলগ্ন স্বার্থসমূহ সামাজিক বিধি নিষেধের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়।

যৌনতা সামাজিক না ব্যক্তিক? যৌনতা যতটা ব্যাক্তিক ততটাই সামাজিক এবং সাস্কৃতিক। বলতে চাই, যৌনতা আমাদের সংস্কৃতির অংশ। ভারতীয় প্রাচীন সমাজে যৌনতা একটা বিশেষ মর্যাদা নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ছিল। যৌন চর্চা ছিল সমাজের অংশ। সিন্ধু সভ্যতায় মহেজোন্দারোতে যে ব্রোঞ্জের মূর্তি পাওয়া গেছে, সেখানে দেখা যায়- নৃত্যরত বস্ত্রহীন মূর্তিটির যৌনাঙ্গ দিয়ে লতা বের হচ্ছে। তার মানে যৌনাঙ্গ অতি পূজনীয় বিষয়।

পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মে যৌনতা বিষয়ক দেব-দেবীর উপস্থিতি রয়েছে। গ্রীক যৌন দেবী আফ্রোদিতি, ভারতীয় হিন্দু পুরাণে শীব- শীবের লিঙ্গ, অতি পূজনীয়। বিশেষ মর্যাদার আসনে তারা অধিষ্ঠিত। প্রায় নব মিথ আর পুরাণ যৌনবন্দনায় মত্ত।

তাইতো বাবর আলীরা ছোটে প্রাচীন নগরে, প্রাচীন সভ্যতায়। বাবর আলী কোথায় ছোটে? সে ছুটে বেড়ায়। যতটা না কামনায়, তার বেশি অন্মেষণ। কীসের অন্মেষণ, জানে না বাবর আলী। তারপরও সে অন্মেষনে আছে। থাকবে। এই অন্মেষণ অন্মেষন খেলা এক ধরনের চতুরতা। কিছুটা বুদ্ধিদৃপ্তও। বাবর আলী নিজেকে চতুর ও বুদ্ধিমান ভাবে। নিজেকে সেই ভাবে সে জাহিরও করে মাঝে মাঝে। চলনে সে চতুর আর ভাবনায় বুদ্ধিদৃপ্ত। কিছুটা দক্ষ জাদুকরের মতো। সে জানায়, “আমি জীবনের যাদুকর এক নির্বোধ পৃথিবীতে”।

বাবর আলীকে আমাদের চিনতে সমস্যা হচ্ছে। একটু হচ্ছে মনে হয়। সে বহুগামী এবং বহুমাত্রিক। তার একাধীক শয্যাসঙ্গী আছে। সমাজে সে বিবিধ পরিচয়ে পরিচিত। টেলিভিশন উপস্থাপক, ব্যবসায়ী এবং ভালো বক্তা। সেলিব্রেটি তখমা তার গায়ে ঝিরঝির করে বইছে। এই এতো কিছুর মধ্যেও বাবর আলীকে চিনতে হবে। চিনতে দেরী হওয়া আমাদের সমাজের জন্য শুভলক্ষন না। তাকে চিনতে হবে, জানতে হবে। তারপর বাবর আলী নিয়ে আমাদের মাথাব্যাথা থাকবে না। তখন বাবর আলী আমাদের সমাজের একজন হবে, সংস্কৃতির একজন হবে।

সংস্কৃতির অংশ হওয়া মানে কিন্তু এই না যে, আমরা সবাই বাবর আলী হবো। বিকাশমান সংস্কৃতি আরো উন্নত হলে আমরা তখন বাবর আলী নিয়ে ব্যস্থ হবো না। তখন সাহিত্যে আলোচনায় বাবর আলীরা স্থান পাবে না। যেমন পায় না একজন ভিক্ষুক রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছে। ফুকো মনে করেন, “আমাদের কালের বিদ্যমান ডিসকোর্স যার সঙ্গে যৌনতা, সত্যপ্রকাশ, আন্তর্জাতিক আইনের বিপর্যয়, নতুন দিনের আগমন ঘোষনা এবং একটি সুনির্দিষ্ট পরিতৃপ্তবোধ এক সূত্রে বাঁধা।” এখানে বলা ভালো, যৌনতার পর সত্য প্রকাশ শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে। বাবর আলী যা অনায়েসে তা প্রকাশ করতে পারে। একটা বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে নতুন দিনের আগমন হবে। নতুন দিন হলো নতুন সমাজ। সংযোজিত, বিনির্মিত সংস্কৃতি।

“গত মার্চে আটত্রিশ পেরিয়ে উনচল্লিশে, চুল উঠতে শুরু করেছে কিছু কিছু। পরাজিত সৈন্যদলের মত কপাল থেকে ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে তারা।” বাবর আলীকে এভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক। এখানে দু’টো শব্দ গুরুত্বপূর্ণ। পরাজিত এবং পিছিয়ে পরা। বাবার আলীর চরিত্রের সার্বিকতায় এই দুটো শব্দ জড়িয়ে আছে। আমরা পরাজিত এবং পিছিয়ে আছি। প্রয়োজন সংযোজিত ও বিনির্মিত সংস্কৃতি।

এই সমাজ যৌনতাকে সমাজ থেকে আড়াল করার যাবতীয় আয়োজন করেছে, করছে। সেখানে বাবরের স্থান নাই। বাবর আলী যৌনতার প্রশ্নে অবদমিত হতে চায় নাই। সে প্রকাশ করতে চেয়েছে সহজাত ভাবে। নিজের মতো করে। এখানে বাবর আলীকে চেনা যায়। যৌনতা প্রশ্নে সমাজ ও সংস্কৃতি একে অপরের সাথে নিবির ভাবে জড়িত। ফুকো ঘোষনা দেন- “অবদমিত যৌনতার ধরন কেবল তাত্ত্বিক বিষয় নয়।” এটা অনেক বেশি সামাজিক, ব্যবহারিক। এই ব্যবহারিক জীবন ভালোবাসাময়। বাবর আলী ভালোবাসতে জানে। সে তার সঙ্গীদের গভীর ভাবে ভালোবাসতো। শুধু যদি কাম-বাসনা থাকতো তাহলে যখন জাহেদারা বাবরের খালি বাসায় যেতো তখনই সে রতিবিনিময় করতো। এটা বাবরের কাছে কঠিন কিছু না। বাবর সহজ হতে চেয়েছে,স্বাভাবিক থাকতে চেয়েছে, আরোপিত জীবনে থেকে সে মুক্তি চেয়েছে, মুক্ত হয়েছো। রংপুর ভ্রমণে গাড়ি চালাতে চালাতে জাহেদাকে সে বলে “আসলে কী জানো, জীবনে সিরিয়াস হয়ে দেখেছি, কিছু পাইনি। আবার সেই খোলসটা ছেড়ে ফেললাম, দেখি সব আমার হাতে।”

এখানে বাবর খোলস ছাড়ার বিষয় স্পস্ট করেছেন। যা তিনি নিজে না, তা তো ছাড়তেই হবে। ছেড়েছেন ও। এখন যে বাবরকে আমরা দেখতে পাই, এটাই আসল বাবর। এটাই তার স্বকীয়তা। রংপুরে এক সাহিত্য সন্ধ্যা চলাকালে জাহেদাকে বাবর নিচু গলায় বলে চললো “স্বপ্ন আর বাস্তবের কোন তফাৎ নেই। একটা বাঘ মনে করো হরিনকে দেখতে পেয়েছে। সে স্বপ্ন দেখলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার উপর, এবং তক্ষুণি ঝাঁপিয়ে পড়ল সে। দু’য়ের মধ্যে এক পলকেরও কম ব্যবধান। আসলে স্বপ্ন হচ্ছে ভবিষ্যত। কিন্তু ভবিষ্যত আসলে বর্তমানেরই সম্প্রসারণ।

বাবর আলী যুক্তিবাদী। প্রতিপক্ষকে সে সময় মতো যুক্তি দিয়ে কাবু করে। বড় খেলোয়াড়েরা সুযোগের আশায় বসে থাকে না, সুযোগ তৈরী করে নেয়। জাহেদাকে সে বলে “ সীতাকে যে চায়, রক্ত মাংসের সীতা। সীতার স্মৃতি নয়, প্রতিকৃতি নয়; যে সীতা জীবন্ত, যে সীতা বর্তমান। আমাদের একটা দোষ কি জানো? আমরা স্বাভাবিকতাকে ভয় পাই। শরীরকে ভয় পাই। ইচ্ছাকে ভয় পাই। আমরা আমাদের কামনাকে নিয়ে বিব্রত। বুকে হাত দিয়ে ক’টা লোক বলতে পারবে কোনো সুন্দরী মেয়ে দেখে তার ইচ্ছা হয়নি?
বারবর আলী আবার খোলস থেকে বের হয়। এখাসে সে স্পষ্ট করে নিজেকে জাহেদারর সামনে তুলে ধরে। বুঝায়- ন্যায় অন্যায়ের সামাজিক মাপকাঠি সমাজের হাতে, মানুষের হাতে না। এই সমাজ শাসকগোষ্ঠির তৈরী সমাজ। এই সমাজকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা হয়। মানুষের ভালোবাসা আর চাহিদার মূল্য বাঁধা। এখানে জড়িত পাপ আর অপাপের কথা। মিশেল ফুকো এখানেও সরব “যৌনতা একদা পাপে পরিণত হওয়ার কারণে আজকের আমরা আমাদের এমন অপরাধী করে তুলবো? কোন পথ সমূহ আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে? খুব স্বাভাবিক প্রশ্ন, আমরা কেন আমাদের যৌনতার সংশ্লিষ্টতার জন্য দায়ী? এ অবস্থার মধ্যে আমরা কিভাবে একটি সভ্যতার দিকে এগিয়েছি? তবে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার শেষ হয়নি।”

ক্ষমতার অপব্যবহারের সাথে শাসন ব্যবস্থা আর শাসক শ্রেণি জড়িত। শাসন আর শাসক এই দু’য়ের মধ্যে সমাজ সংস্কার আর সংস্কৃতি এসে যায়। আমরা আবার আগের কথায় আসতে পারি। যৌন সংস্কৃতি। সমাজের উন্নত চিন্তার উন্নত সংস্করন। ফুকো বলেন- “আমাদের উচিত আধুনিক যৌন-দমনমূলক এই ডিসকোর্সে এসব ভালো ভাবে তুলে ধরা।”

তারপরও বাবর আলী জটিলতায় ফেলে আমাদের। সে এগিয়ে যায় তার নিজের মতো। একেবারেই তার নিজের মতো। এই এগিয়ে যাওয়ায় আমরা বিপাকে পড়ি। বিপাকে পরি বিধায় তাকে পড়তে পারি না। তার মনবেদনা, বুঝতে পারি না। মনবাসনা অনুভব করতে পারি না। তাইতো বাবর আলী খেলে যায়। এই খেলাটা নিজের সাথে নিজের। নিজের সাথে সমাজের, নিজের সাথে রাষ্ট্রের। এ এক অদ্ভুত খেলা। রাম যেমন রক্তে মাংসের সীতাকে চায়- বাবর আলী তেমন বাবলী, জাহেদা, লতিফাদের চায়। ভালোবেসে চায়।

বাবর আলী নিজে ম্যাজিক লাইট। চব্বিশ ঘন্টায় এই ম্যাজিক লাইট দু’বার দেখা যায়। একবার ভোরে আরেক বার সন্ধ্যায়। বাবর আলীর মতে- “চরিত্র বলে বলে যা আমরা জাহির করি আসলে তা কতটা খাঁটি সত্য সেটা বিবেচনার বিষয়। আমারতো মনে হয়, সব মানুষেরই দু’টো চেহারা। একটা তার নিজের, আরেকটা সে তোলে অপরের জন্যে।” বাবর আলীকে এখানেই আরেক বার চেনা যায়। খুব স্পষ্ট করেই সে ধরা দেয় কৌশলে। একসাথে বেড়ে ওঠা দু’টো স্বত্তা।

এটা কি ব্যাধি? এই ব্যাধি কার? বাবর আলীর? বাবর আলীর যৌনতা? সমাজের না সমাজের স্বীকৃতির? সমাজ কী স্বীকৃতি দিবে যৌনতাকে! যৌনতা পাপ। যৌনতা গোপন বিষয়। যৌনতা ভাইরাস। সংক্রামক। ফুকো ঘোষণা দিলেন- “নিঃসন্দেহে যৌনতা একটি বিজ্ঞান।” আবার যৌনদাসী বা যৌন জিহাদ এই বিষয় দু’টো ধর্মরাষ্ট্রে প্রচলিত। সে আলোকে বাবর আলী কোথায়? আমরা বাবার আলীকে খুঁজছি। বাবর আলীকে ফেলবো কোথায়? রাখবো কোথায়? বাবার আলী পাপী? বাবর আলী যৌনতা বিষয়ক বিজ্ঞানের ছাত্র? বাবর আলী কি দ্বৈতস্বত্তা বহন করে? বাবর আলী ভুল সময়ে এসেছে। বাবর আলী যা করতে চেয়েছে, যা বলতে চেয়েছে, তা সহজ ভাবে চেয়েছে। আমরা তাকে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত না। এই সমাজ প্রস্তুত না।

নোট : ১. বাবর আলীর সকল উদ্বৃতি “খেলারাম খেলে যা” বিদ্যা প্রকাশ, অষ্টম প্রকাশ, ফ্রেব্রুয়ারি, ২০০৬ থেকে নেওয়া।
২. মিশেল ফুকোর উদ্বৃতি নেওয়া হয়েছে, মিশেল ফুকো পাঠ ও বিবেচনা, সম্পাদনা পারভেজ হোসেন। প্রথম প্রকাশ, ফ্রেব্রুয়ারি, ২০০৭ এর মধ্যে দি হিস্ট্রি অব সেক্সুয়ালিটি গ্রন্থের ‘আমরা অন্য ভিক্টোরীয়’ অধ্যায়ে মজিদ মাহমুদের অনুবাদ থেকে।

লেখক- মোস্তফা মনন : লেখক, সমালোচক ও নাট্য নির্মাতা

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads