রশীদ হায়দারের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ

শাফিক আফতাব


poisha bazar

  • ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৫:২৯

রশীদ হায়দার বাংলা কথাসাহিত্যে অনন্য একটি নাম। স্বকীয় মেধা ও স্বতন্ত্র প্রকরণ-পদ্ধতিতে তিনি তার কথাসাহিত্যের ক্যানভাস নির্মাণ করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তার কথাসাহিত্যে ব্যাপক স্থান জুড়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাসের মধ্যে অন্ধ কথামালা ও এক কোন অরণ্যে উপন্যাস দুটি অন্যতম। উত্তরবঙ্গের পাবনা জেলার স্থানিক পরিবেশের আবহে অন্ধ কথামালা উপন্যাসের আখ্যায়ন চিত্রায়ন করা হয়েছে। ঔপন্যাসিক একজন মুক্তিযোদ্ধার সহপাঠীদের নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে বিশ্বাসঘাতক সহপাঠী কর্তৃক অপহৃতের ঘটনা বর্ণনার সমান্তরালে কেন্দ্রীয় চরিত্রের স্মৃতিপটে ভেসে ওঠা ঘটনার বর্ণনা চিত্রিত করেন। একদিকে আসন্ন মৃত্যুর আতঙ্ক একইসঙ্গে সত্য ও সুন্দরের অনুগামী দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত বেলটুর স্মৃতিবিধুরতা এই দুইয়ের মিথস্ক্রিয়ায় উপন্যাসির কাহিনী নির্মিত। মৃত্যু-উন্মুখ বেলাল হোসেনের অতীত- ভাবনা নিজের পারিবারিক পরিচিতি, সহপাঠী মোকছেদ ও হান্নানের সঙ্গে বন্ধু বাৎসল্যতার চিত্র বর্ণিত হয়েছে উপন্যাসের আখ্যানে।

অন্ধ কথামালা উপন্যাসে একাত্তরের যুদ্ধ-দীর্ন-দিনে একজন মুক্তিযোদ্ধার অনিবার্য পরিণতির আলেখ্য যেমন অঙ্কিত তেমনি রাজাকারতন্ত্রের পাশবিক স্বরূপ উন্মোচিত। সহপাঠী মোকছেদ কর্তৃক অপহৃতের মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের রাজাকারদের বিশ্বাসঘাতকার চিত্র তুলে ধরেন। এই দেশীয় দোসররাই যে পাকিস্তানিদের সহায়তা করে নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সেটি উন্মোচিত হয়েছে সহপাঠী মোকছেদের মাধ্যমে।

উপন্যাসের ঘটনা প্রত্যক্ষণে ও স্মৃতিচারণে উভয় রীতিতে মিশ্রভাবে বর্ণিত হয়েছে। ঘটনার বর্ণনায় বিশ্লেষণাত্মক রীতির সমান্তরালে বিবৃত রীতি ব্যবহার করা হয়েছে। উপন্যাসে ব্যক্তিক চেতনা প্রতিভাত; বেলটু নামক এক তরুণের অপহৃতের ঘটনা হলেও রশীদ হায়দার খণ্ডের মধ্যে অখণ্ড সামান্যের মধ্যে সমগ্রের রূপায়ণ করেছেন। ফলে দেয়া দেখা যায় বেলটু নামক একটি তরুণই উপন্যাসের আবেদন থেমে থাকে নি; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পুরো অবলোকন ও চিত্রপট বিধৃত হয়েছে।

অন্ধ কথামালা উপন্যাসে কাহিনীর কোনো বাঁক নেই। টানা বর্ণনার মধ্য দিয়ে উপন্যাসে কাহিনি বর্ণিত। ঔপন্যাসিক কেন্দ্রীয় চরিত্র বেলটুর সঙ্গে সমীকৃত। বেলটুকে দিয়ে সে কথা বলিয়ে নিয়েছে; একদিকে স্মৃতি কল্পনা অন্যদিকে বাস্তব বর্ণনা। যুগপৎভাবে এই যে স্মৃতি-কল্পনা ও বাস্তব চিত্রের বর্ণনা চেতনাপ্রবাহরীতিকে ইঙ্গিত করে। ঔপন্যাসিক অবশ্য বিশুদ্ধ চেতনাপ্রবাহরীতির দিকে ঝুঁকেননি। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির চরিত্রাঙ্কনে যতটুকু প্রয়োজন ততটুকই তিনি চিত্রায়ন করেছেন। অন্ধ কথামালা উপন্যাস মূলত একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধার আত্মকথন ; মৃত্যু- উন্মুখ সময়ের অবলোকন, যুদ্ধকালীন সময়ে একটি সার্থক আলেখ্য। উত্তরবঙ্গেও প্র্ক্ষোপটে রচিত উপন্যাসের মধ্যে নিষিদ্ধ লোবন অন্ধ কথামালা যুদ্ধ-দীর্ণ দিনের কাহিনী, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ঘটনা নিয়ে রচিত উপন্যাসের মধ্যে দ্বিতীয় দিনের কাহিনীর ন্যায় এ কোন অরণ্যে উপন্যাস।

এ কোন অরণ্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক উপন্যাস। এই উপন্যাসের পটভ‚মি উত্তরবঙ্গের পাবনা জেলার কয়েকটি অঞ্চল। ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে প্রান্তিক তৃণমূলের মানুষ যে অংশ নিয়ে বীরত্বের সঙ্গে শত্রুর মোকাবেলা করেছে পরিনামে মুছে গেছে তাদের বীরত্বগাঁথা এবং এক সময় স্বাধীনতাবিরোধীতায়ই হয়েছে ক্ষমতাসীনদের মদদপুষ্ট তারই আলেখ্য এক কোন অরণ্য উপন্যাস। ঔপন্যাসিক উত্তরবঙ্গের প্রেক্ষাপটে পাবনা জেলার কয়েকটি স্থানের স্থানিক পরিচয় সূত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও রাজাকার তন্ত্রের মুখোশ উন্মোচন করেছেন গ্রামীণ এক নিঃস্ব যুবকের মুক্তিযুদ্ধে তার বীরত্বের পরিচয় সূত্রে।

উপন্যাসের কাহিনীবিন্যাসে আমরা ঘটনার সংক্ষিপ্ত সার দেখে নিতে চাই : মুক্তিযোদ্ধা হাতেম আলী হতদরিদ্র এক মানুষ। সহায় সম্বলের মধ্য তার মোটে আছে দুটো গরু একটি গরুর গাড়ী ও একটি ছনে ছাওয়া ঘর দুই বিঘা জমি। মুক্তিযুদ্ধে সে মা-বাবা ভাইবোন সবাইকে হারিয়েছে। এমনকি তার ভালোবাসার বস্তু তাসলিমাকে হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। সবকিছু হারিয়ে হাতেম আলী নিঃস্ব ও রিক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির কয়েকদিন আগে রাজাকার চেয়ারম্যান ও তাছলিমার মাজেদ আলী ও দুলুর বাপ আবেদ আলী পালিয়ে যায়। কিছু স্বাধীনতা অব্যবহিত পর স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিরাই তাদের ক্ষমতা ও দৌরাত্ম্যে জেঁকে বসে। বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধারাই হয়ে যায় অপাঙ্ক্তেয়। হাতেম আলী যুদ্ধকালীন জানতো তার এই বীরত্বগাঁথার মূল্য কেউ দেবে না। অনেকেই জজ ব্যারিস্টার হবে। সরকারের কাছে ফায়দা লুটবে। কিন্তু তার কথা কেউ করবে না। হাতেম জানে যুদ্ধ শেষে তার কথা কথিত শিক্ষিতের সারিতে থাকবে না। মু্িক্তযুদ্ধের বীরত্বগাথার জন্য পাবেনা কোনো স্বীকৃতি। এই কারণে যুদ্ধক্ষেত্রের কাশিপুর নাজিরপুরের মোড়ের পাশে গহীন অরণ্যের একটি গাছে সে নিজের নাম খোদাই করে লিখে রাখে ‘মোঃ হাতেম আলী’।

পরে দুলুর নানার মৃত্যুর সংবাদ শুনে হাতেম আলী দুলুর মা ও দুলুকে নিয়ে যখন তার বাপের বাড়ি মাধবপুরে যাচ্ছে তখন সেই গহীন অরণ্যে হাতেম আলী পথ হারিয়ে ফেলেছে বলে দুলু ও দুলুর মা সন্দেহ করে। কিন্তু হাতেম আলী পথ হারাই নি। কেনোনা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশের যে পথ সে হারাতে পারে না। অর্থাৎ সে ঐ যে বটবৃক্ষের গায়ে লিখে রেখেছিল সেই বটগাছের জন্যই সে পথের দিক পরিবর্তন করে অন্য পথ দিয়ে দুলু ও দুলুর মা নিয়ে আসে। গহীন অরণ্যে রাতের অন্ধকারে তারা সেই বটবৃক্ষ হাতেম আলী পেয়ে যায়। গাছে নাম লেখা দেখে হাতেম আলী আর স্বাভাবিক থাকে না। যুদ্ধদীর্ণ দিনের কল্পনা তাকে সেই মুক্তিযুদ্ধের প্রান্তরে নিয়ে যায়। নিজের নাম টি লেখা আছে দেখে সে নিজেই স্মৃতিভ্রমে আস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। দুলুও তার মা হাতেম আলীর স্বরূপটা তখন বুঝে উঠতে পারে না। মনে করে হাতেম আলীর অস্বাভাবিক আচরণে তাকে মানসিক ভারসাম্যহীন। কিন্ত এই অস্বাভাবিকতা মূলত ভৌতিক কোনো ঘটনা নয় ; দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত একজন নিঃস্ব মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিপটে ভেসে ওঠা যুদ্ধদীর্ণ দিনের আলেখ্য। ঔপন্যাসিক এ কোন অরণ্য নামকরণের মধ্য দিয়ে এই সেই অরণ্য যে অরণ্যে তাঁবু গেড়ে হাতেম আলীরা যুদ্ধ করেছে- সেটি বুঝাতে তার এই নামকরণ। এই উপন্যাসে হাতেম আলীর স্মৃতিপটে মুক্তিসংগ্রামের আলেখ্য চিত্রায়ণের পাশাপাশি উঠে এসেছে রাজাকারদের দৌরাত্ম্য ; মুক্তিযুদ্ধে হাতেম আলীর সবকিছু হারানোর ইতিবৃত্ত।

উপন্যাসের কাহনিবিন্যাসে আমরা ঘটনার সংক্ষিপ্ত সার দেখে নিতে চাই : মুক্তিযোদ্ধা হাতেম আলী হতদরিদ্র এক মানুষ। সহায় সম্বলের মধ্য তার মোটে আছে দুটো গরু একটি গরুর গাড়ি ও একটি ছনে ছাওয়া ঘর দুই বিঘা জমি। মুক্তিযুদ্ধে সে মা-বাবা ভাইবোন সবাইকে হারিয়েছে। এমনকি তার ভালোবাসার বস্তু তাসলিমাকে হানাদার বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। সবকিছু হারিয়ে হাতেম আলী নিঃস্ব ও রিক্ত। বাংলাদেশ স্বাধীনতা প্রাপ্তির কয়েকদিন আগে রাজাকার চেয়ারম্যান ও তাছলিমার মাজেদ আলী ও দুলুর বাপ আবেদ আলী পালিয়ে যায়। কিছু স্বাধীনতা অব্যবহিত পর স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিরাই তাদের ক্ষমতা ও দৌরাত্মে জেঁকে বসে। বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধারাই হয়ে যায় অপাঙ্ক্তেয়। হাতেম আলী যুদ্ধকালীন জানতো তার এই বীরত্বগাথার মূল্য কেউ দেবেনা।

উপন্যাসের আখ্যায়নে লেখক স্মৃতিচারণ ও একই সঙ্গে বাস্তব ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কাহিনি এগিয়ে নিয়েছেন ঔপন্যাসিক। অরণ্যে পথ হারিয়ে ফেলার ঘটনার বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে হাতেম আলীর স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিন; তার যুদ্ধকালীন বীরত্বগাথা। একই সঙ্গে রাজাকার ও শান্তি কমিটি লিডার আজম আলী মেম্বার, শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল ওহাব, মুসলিম লীগ নেতা শামসুল হক ও গ্রামের জোতদার দুলুর বাপ আবেদ আলীও তাছলিমার বাপ মাজের আলী কথা। ঔপন্যাসিক এই উপন্যাসের প্লটবিন্যাস করতে স্মৃতিচারণকৌশল অনুসরণ করেছেন। এই কৌশলটি কথাসাহিত্যিক শওকত আলী অনেক উপন্যাসের অনুসরণ করেছিলেন। যদিও স্মৃতিবিধুরতা উপন্যাসের কলেবর ও আয়তন বৃদ্ধি করেন, কিন্তু অরিরিক্ত স্মৃতিমন্থন উপন্যাসের প্লটকে করে আত্মজীবনীর আলেখ্য। ঔপন্যাসিককে খেয়াল করতে হয় উপন্যাসের স্মৃতিচারণ ঘটনাকে বেশিমাত্রায় ভারাক্রান্ত করলো কি না?

এ কোন অরণ্যে উপন্যাসের প্লটবিন্যাসে আমরা দেখতে পাই এর আয়তন ক্ষুদ্র এবং পটভূমি অনেকটা ছোটগল্পের ন্যায়। ছোটগল্পে যেমন একটিমাত্র চরিত্র কিংবা একাধিক চরিত্রকে গল্পকারগণ প্রাধান্য দেন, এই উপন্যাসে তাই দেয়া হয়েছে। মু্িক্তযুদ্ধের মতোন একটি জাতীয় ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত বা পটভ‚মি নিয়ে ঔপন্যাসিক একটি বিশালায়তন উপন্যাস লিখতে পারতেন। তিন শুধুমাত্র হাতেম আলীর আত্মকথনকে প্রাধান্য দেন। যা ছোটগল্পের বৈশিষ্ট্যকে আরোপ করে। তবে বাস্তবতাকে উৎরে যেতে চাননি। একাত্তরে ও পরবর্তী পর্যায়ে যেমনটি হয়েছিলো, সেটিই তিনি উপন্যাসের কাঠামোতে শিল্পরূপ দানের চেষ্টা করেছেন। বিষয়গতদিক থেকে উপন্যাসের বাস্তবতা পরিলক্ষিত, তবে শিল্পসফতার দিকে প্লটের ক্ষুদ্রত্ব উপন্যাসের ক্যানভাসকে চারদেয়ালে আড়ষ্ট করেছে।

রশীদ হায়দারের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের ঘটনা নিয়ে রচিত হয়েছে। খাঁচায় উপন্যাসটি। এই উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের ঢাকা শহরের অন্তরীণ আলেখ্য। এ উপন্যাসের লেখকের স্বকীয় ও স্বতন্ত্র শিল্পমেধার পরিচয় পাওয়া যায়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads