পড়া-লেখার নেশায় নিমজ্জিত থাকি

স.ম. শামসুল আলম

স.ম. শামসুল আলম
স.ম. শামসুল আলম

poisha bazar

  • ১৭ অক্টোবর ২০২০, ১৫:১১

সৃষ্টিশীল একজন মানুষ সৃষ্টির অদম্য নেশায় নিরন্তর সচেষ্ট থাকবে এটাই স্বাভাবিক। লেখালেখির নেশা আরো ভয়ানক এবং ব্যতিক্রম। ভয়ানক এজন্য যে, লেখক যখন লেখেন তার প্রতিটি লেখার ক্ষেত্রে ভয় একটি স্থায়ী-ভাব হিসাবে আসন পেতে বসে। অর্থাৎ তিনি যা লিখতে চান, যা বলতে চান ঠিকঠাক উপস্থাপন করতে পারছেন তো? পাঠকের অভ্যন্তরে কোনো দাগ বা চিহ্ন ফেলতে পারছেন তো? আর ব্যতিক্রম এজন্য যে, পৃথিবীর তাবৎ সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে লেখালেখিটাই আমার কাছে অধিক শ্রমসাধ্য একটি কাজ।

আবার মূল্যের ব্যাপারে দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মূল্যহীন সম্পদ। তখন মনে হতে পারে লেখাগুলো জঞ্জাল। কিন্তু আমি আবিষ্কার করেছি মানসম্মত লেখার একটা না একটা মূল্য আছে। অর্থমূল্য না থাকলেও পাঠকের ভালোবাসা-সম্মান- এই মূল্য আরো বেশি মূল্যবান। আমি অবশ্য লেখার সময় এসব দিকে ভাবাভাবির অবকাশ দিই না। যা মনে আসে, যা লিখতে ইচ্ছে করে লিখে ফেলি। গল্প উপন্যাস কবিতা ছড়া নাটক গান প্রবন্ধ অনুগল্প প্রভৃতি বিষয়ে লিখি। শুধু একটি বিষয়ে অধিক পরিমাণ লিখে প্রতিষ্ঠিত লেখক হয়ে যাব, স্বপ্নও দেখি না। আমাকে অনেকে বলেন শুধু গল্প লিখতে- আমার নাকি গল্পের হাত ভালো। অনেকে বলেন শুধু ছড়া লিখতে, কেউ কেউ বলেন শুধু কিশোর কবিতা লিখতে। সত্যিকার অর্থে আমি কোনো ‘শুধু’র মধ্যে থাকি না। আমি সব বিষয়ে লিখেই আনন্দ পাই। আনন্দ পাওয়াটাই আমার লেখার সার্থকতা। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আমার ৭৩টি বই প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ভালো একটি লেখা সৃষ্টির চিন্তায় এখনো নিমগ্ন থাকি।

করোনার কারণে বেশ কিছুদিন লকডাউন গেল। এই সময়ে ‘সিমেন এনালাইসিস’ নামে একটি দীর্ঘ উপন্যাস এবং ‘বহুরূপী দেবশিশু’ নামে একটি কিশোর উপন্যাস লিখেছি। বেশ কয়েকটি গল্প এবং কিশোরগল্প লিখলাম। এছাড়া ছড়া কবিতা গান অনুগল্প আমার নিয়মিত লেখার অংশ হিসাবে প্রতিনিয়ত লিখছি। আজকাল আরেকটি বিষয় নিয়ে খুব মেতে উঠেছি সেটা হলো- গদ্যগান। গদ্যগান অর্থাৎ গানের মূল প্যাটার্ন ভেঙে নতুন আঙ্গিকে লেখার প্রচেষ্টা। এই গানগুলোর সুরও হবে মূল নিয়মের বাইরে যেটা শ্রোতার কাছে ভিন্নস্বাদে পৌঁছাতে সক্ষম হবে বলে মনে করি। ইতোমধ্যে শতাধিক গদ্যগান লিখেছি। এটা একটা নিরীক্ষাধর্মী কাজ। জানি না আদৌ এর কোনো ভবিষ্যৎ আছে কিনা। তবে ভবিষ্যৎ-ভাবনা করেই গদ্যগান লিখছি। একই সাথে ‘আমার মা’ শিরোনামে উপন্যাসের কাজ ধীর গতিতে এগিয়ে নিচ্ছি।

পড়ার ব্যাপারে বলতে গেলে বলব আমি অতটা সিরিয়াস পাঠক নই। লকডাউনের মধ্যে বেশ কটি বই পড়ে শেষ করেছি। এর মধ্যে বেশির ভাগ বই-ই বর্তমান সময়ের সক্রিয় লেখকদের লেখা। নবীন লেখকও আছেন বেশ কয়েকজন। এছাড়া, অনেক আগে পড়া কিছু পুরনো বইও ঝালাই করে নিচ্ছি আরেকবার। যেমন শামসুদ্দীন আবুল কালামের ‘কাঞ্চনগ্রাম’, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’, অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, সেলিনা হোসেনের ‘মগ্ন চৈতন্যে শিস’ হুমায়ূন আহমেদের ‘লীলাবতী’ ও ‘কে কথা কয়’ প্রভৃতি। বর্তমানে সিথেনে রয়েছে আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ এবং সুস্মিতা ইসলামের ‘আমার দিনগুলো’।

সম্প্রতি যে বইগুলো পড়লাম সেগুলোর কয়েকটি হলো- শেখ মুজিবুর রহমানের ‘আমার দেখা নয়াচীন’ (পূর্বে প্রকাশিত তার দুটি বই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও ‘কারাগারের রোজনামচা’ আগেই পড়েছি), মোজাফফর হোসেনের ‘অতীত একটা ভিন দেশ’, পলাশ মাহবুবের ‘কম বয়সী সন্ধ্যা’, কানিজ পারিজাতের ‘সুলতানা বিবিয়ানা’, মনি হায়দারের ‘গল্প পঞ্চাশ’, মাহবুব আজীজের ‘এইসব কলহাস্য’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘নিঝুম নিশিরাতে’, ফজল হাসান অনূদিত ‘আফ্রিকার শ্রেষ্ঠ গল্প’, ইকবাল খন্দকারের ‘একচোখা গোয়েন্দা’, সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘কয়লতলা ও অন্যান্য গল্প’, হারুন পাশার ‘তিস্তা’, মিল্টন বিশ্বাসের ‘উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু’, স্বকৃত নোমানের ‘বানিয়াশান্তার মেয়ে’ প্রভৃতি।

এছাড়া বর্তমান সময়ের নবীন-প্রবীণ অনেক কবির কাব্যগ্রন্থ এবং শিশুসাহিত্য গ্রন্থ পাঠ করেছি যা আমার নিয়মিত পাঠ্য। কবি ও শিশুসাহিত্যিকের তালিকা অনেক দীর্ঘ। সত্যি বলতে কি, আমি এখানে ডুব দিয়ে থাকি। শুধু নতুন লেখা নয়, পুরনো লেখাও নতুন করে পাঠ করি। কোনো একটি বই পড়তে গিয়ে যদি শুরুতেই ভালো লেগে যায়, এক বসাতে বা এক রাতেই শেষ করে ফেলি। পড়ার নেশা ও লেখার নেশা দুটোই আমাকে সবসময় আচ্ছন্ন করে রাখে। আমি সর্বক্ষণ এই নেশায় নিমজ্জিত থাকি। মাঝে মাঝে নিজেকেই বলি, জীবন তোমার অনেক শেখার বাকি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads