মার্কিন কবি লুইস গ্লিকের সাহিত্যে নোবেল অর্জন

শাহীন চৌধুরী ডলি


poisha bazar

  • ১৪ অক্টোবর ২০২০, ২০:১৬

কে পেতে যাচ্ছেন ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার, এই নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা কল্পনা চলছিল। অবশেষে জল্পনার অবসান ঘটল। গত ০৮ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সুইডিস একাডেমি সাহিত্যে পুরস্কার ঘোষণা করলে শেষ হাসি হাসলেন মার্কিন কবি লুইস গ্লিক। সাহিত্যে ১১৭তম লেখক হিসেবে লুইস যাঁদের পেছনে ফেলে নোবেল পুরস্কার জিতে নিলেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কানাডিয়ান লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড এবং জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির মতন ব্যক্তিত্ব। নোবেল কমিটি বলেছে, তাঁর অসামান্য কাব্যকণ্ঠ ও দার্শনিক সৌন্দর্যবোধ ব্যক্তির অস্তিত্বকে সর্বজনীন করে তোলে। তাঁর রচনায় অনেকেই রাইনের মারিয়া রিলকে এবং এমিলি ডিকিনসনের উত্তরাধিকারকে খুঁজে পান। সেদিক থেকে দেখলে লুইস, পশ্চিমি বিশ্বের মূলধারার কবিতা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেননি বলা যায়।

নোবেল পুরস্কার প্রবর্তনের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৬ জন নারী সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। যদিও সাহিত্যে এ পর্যন্ত নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মোট ১১৭ জন। ১৯৯৩ সালে টনি মরিসনের পর সাহিত্যে নোবেল পাওয়া প্রথম আমেরিকান নারী লুইস গ্লিক। এবিসি নিউজে বলা হয়েছে, সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার নিয়ে কয়েকবছর ধরে বিতর্ক চলছে। নোবেল কমিটিতে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার কারণে ২০১৮ সালে সব শাখায় নোবেল দেয়া হলেও সাহিত্যকে বাদ রাখা হয়। সেবার একটি যৌন হয়রানির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান স্থগিত করা হয়েছিল।

২০১৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান পোল্যান্ডের লেখক ওলগা তোকারচুক, ২০১৯ সালে পান অস্ট্রিয়ার সাহিত্যিক পিটার হান্ড। গত বছর একসঙ্গে দুই বছরের পুরস্কার দেওয়া হয়। পিটার হান্ডের বিরুদ্ধে সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, তিনি ১৯৯০ এর দশকের যুগোসøাভ যুদ্ধে সার্বদের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের জন্য কুখ্যাত সার্ব নেতা সেøাবোদান মিলোসেভিচের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই নিয়ে বিশ্ব সাহিত্য অঙ্গন তপ্ত হয়ে উঠেছিল। নোবেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, শুধুই সাহিত্যিক মানদণ্ডে হান্ডকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। এসব বিভিন্ন কারণে এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রদান নিয়ে কর্তৃপক্ষ সচেতন ছিলেন। প্রতিবছর ১০ ডিসেম্বর সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই বছর করোনা পরিস্থিতির কারণে সে অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। তার বদলে নোবেল বিজয়ীরা নিজ দেশে বসে ওয়েবিনারে অংশ নিবেন নোবেল পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। আগামী বছরের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তাদের স্টকহোমে আমন্ত্রণ জানানো হবে।

এবার সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে লুইস গ্লিকের নাম শুরুতে আলোচনায় তেমনভাবে ছিল না। সুইডিশ একাডেমির নোবেল কমিটির প্রধান অ্যান্ডার্স ওলসন বলেছেন, লুইস যে খুব পরিচিত তা নয়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে। লুইসের লেখা বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ কম হয়েছে। এই কথার সাথে সাথে ওলসন খেদ প্রকাশ করেছেন। ৮ অক্টোবর নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য লুইস গ্লিকের নাম ঘোষণা করার আগে তাঁর সাথে যোগাযোগ করেছিল রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি। বৃহস্পতিবার পুরস্কার ঘোষণার সময় এ নিয়ে কথা বলেন সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ম্যাটস মালম। তিনি বলেন, পুরস্কার ঘোষণার আগে লুইস গ্লিকের সাথে কথা হয়। তিনি নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার খবর শুনেই আনন্দের সাথে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

লুইস গ্লিকের জন্ম ১৯৪৩ সালে, নিউইয়র্কে। বাবা ব্যবসায়ী ড্যানিয়েল গ্লিক ও মা গৃহকর্মী বিট্রিস গ্লিকের জীবিত দুই কন্যার মধ্যে প্রথম সন্তান লুইস গ্লিক। লুইসের বাবা লেখক হতে চেয়েছিলেন তবে তিনি নিজেকে ব্যবসার সাথে যুক্ত করেন। ওয়েলসলে কলেজের স্নাতক ছিলেন লুইসের মা। ছোটবেলা থেকেই লুইস গ্লিক তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে গ্রিক পুরাণ এবং জোয়ান অফ আর্কের কিংবদন্তি ক্লাসিক গল্পের শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি খুব অল্প বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করেন। কিশোরী লুইস এনোরেক্সিয়া নার্ভোসার শিকার হন।নিউইয়র্কের জর্জ ডব্লিউ হিউলেট স্কুলে পড়াকালীন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে চিকিৎসা নেওয়া শুরু করেন। তাঁর পুনর্বাসনের জন্য কয়েক মাস পরেই স্কুল থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে তিনি ১৯৬১ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তী সাত বছর তাঁকে সুস্থতার জন্য থেরাপি নিতে হয়েছিল। অসুস্থতার জন্য তিনি পুরোদস্তুর ছাত্র হিসেবে কলেজে ভর্তি হননি। পরিবর্তে তিনি সারা লরেন্স কলেজে একটি কবিতার ক্লাস বেছে নিয়েছিলেন। ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ জেনারেল এডুকেশনের কবিতা কর্মশালায় ভর্তি হন। সেখানে থাকাকালীন সময়ে তিনি লনি অ্যাডামস এবং স্ট্যানলি কুনিটসের কাছে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি এই শিক্ষকদের একজন কবি হিসেবে তাঁর বিকাশে উল্লেখযোগ্য মর্যাদা দিয়েছেন।

৭৭ বছর বয়সে লুইস গ্লিক নোবেল পুরস্কার অর্জন করলেন। প্রথম কবিতার বই ‘ফাস্টবর্ন’ ১৯৬৮ সালে প্রকাশের মাধ্যমে কবি হিসেবে তাঁর অভিষেক হয়। এর পরপরই অল্প সময়ে মার্কিন সাহিত্য জগতে কবি হিসেবে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। মার্কিন সাহিত্য জগতে কবি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করতে সক্ষম হন। লুইস গ্লিক ক্যামব্রিজে বসবাস করেন। লেখালেখির পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতার সাথে যুক্ত আছেন। ইংরেজির অধ্যাপক লুইস গ্লিক শিক্ষকতা করেন কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে।

নোবেল জয়ের আগে তিনি ১৯৯৩ সালে দ্য ওয়াইল্ড আইরিস কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছিলেন পুলিৎজার প্রাইজ, ২০১৪ সালে ফেইসফুথ অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট কাব্যসংকলনের জন্য জাতীয় পুস্তক পুরস্কার, জাতীয় বই সমালোচক সার্কেল পুরস্কার, বলিঞ্জেন পুরস্কার। এ ছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কিছু মর্যাদাবান পুরস্কার জিতেছেন। ২০০৩-২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ী কবি ছিলেন। লুইসকে প্রায়শই একজন আত্মজীবনীমূলক কবি হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তাকে নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লুইসের কবিতায় মানবিক হতে চাওয়ার যন্ত্রণাদায়ক বাস্তবতার কথা উঠে আসে। তিনি এমন অজস্র কবিতা লিখেছেন যার উপজীব্য বিষয়, শৈশব, মৃত্যু এবং পারিবারিক জীবন। গ্রিক পুরাণ ও পৌরাণিক চরিত্রের সাথে তাঁর কবিতার যোগসূত্র ঘটেছে। লুইস নিজেকে কোন বিশেষ বিশেষ অভিধায় দেখতে চান না। এমনকি নিজেকে ফেমনিস্ট বলতেও তিনি নারাজ। বরং জীবন ও মৃত্যুর শাশ্বত রহস্য আর প্রকৃতির অনিঃশেষ রহস্যময়তাকেই তিনি তাঁর কাব্যে খুঁজে চলেন।

১৯৮৫ সালে লুইসের কাব্যসংকলন দ্যা ট্রায়াম্ফ অব অ্যাকিলিস এবং ১৯৯০ সালে অ্যারার‌্যাট প্রকাশিত হওয়ার পর দেশ-বিদেশে তাঁর পাঠক বাড়তে থাকে। অ্যারার‌্যাটে তাঁর কাব্য ভাষায় তিনটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পারিবারিক জীবন, নিরাভরণ বৌদ্ধিক বিভা এবং কবিতার জাল বুননে সূক্ষ্ম কারুকাজ। লুইস নিজেও স্বীকার করেছেন, ওই কবিতাগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি আবিষ্কার করেছেন, সাধারণ ভাষাকেও কিভাবে কাব্যিক করে তোলা যায়। লুইস যখন তাঁর প্রবন্ধে এলিয়টের জরুরি স্বরভঙ্গি নিয়ে কথা বলেন, কিটসের লেখায় নিজেকে পড়ার শিল্পের কথা বলেন, তাতে যেন তাঁর নিজের কবিতা পড়সষবশযড়শক ভিন্নপাঠ পাওয়া যায়।

গত সাতাশ বছর পর মার্কিনী হিসেবে আবারও সাহিত্যে নোবেল জিতলেন লুইস গ্লিক। এর আগে সর্বশেষ মার্কিনী হিসেবে ১৯৯৩ সালে টনি মরিসন সাহিত্যে নোবেল জিতেছিলেন। নোবেল পুরস্কারের ইতিহাসে তিনি ১৬তম নারী নোবেল বিজয়িনী। ২০১১ সালে কবি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল জিতেছিলেন সুইডিশ লেখক টমাস ট্রান্সট্রিমার। এই বছর নোবেল পুরস্কারের মূল্য ১০ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার। পূর্বের ১১৬ জন সাহিত্য নোবেলজয়ীর মধ্যে ১৫ জন নারী ছিলেন এবং সর্বশেষ কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান লেখক ছিলেন ওলে সোয়ঙ্কা (১৯৮৬ সাল)।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads