গল্প কারিগর দীলতাজ রহমান

শফিক হাসান

শফিক হাসান

poisha bazar

  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:৫৭

বয়সী বৃক্ষের মতো অনেক উত্থানপতনের আখ্যান তাঁর জানা। ব্যাকরণ মেনে যেহেতু চলে না মানবজীবন, গল্পও অনেক সময় পরিচিত পরিমণ্ডলের বাইরে এসে সৃষ্টি করে বিকল্প পথ। নতুন গতি-সূত্র। বলা হচ্ছে যশস্বী কবি-গাল্পিক দীলতাজ রহমানের কথা। গতকাল, ১৭ সেপ্টেম্বর ছিল তাঁর জন্মদিন।

দীলতাজ রহমানের গল্পপরিধি খুঁজতে গেলে প্রথাবদ্ধ পাঠক কিংবা গবেষককে থমকাতে হবে কিঞ্চিৎ। মেরু-অমেরুকে গুড়িয়ে দিয়ে তিনি সৃষ্টি করেন স্বতন্ত্র শৈলী। কষ্টকল্পনায় বহুদূরের গল্প খুঁড়ে আনেন না; সাদাকালো দৃষ্টিতে অবলোকন করেন পরিপার্শ্ব। তাতেই উঠে আসে জীবনের আলোছায়া, গল্পভ‚গোল। আশ্চর্য ম্যাজিক কাজ করছে তাঁর ইদানীংকার গল্পে। বলছেন, পরিচিত পরিমণ্ডলের কথা, আত্মকথন না হয়ে তা পরিণত হচ্ছে গল্পে! লেখকের কুশল ও গুণপনা থাকলে আপাত তুচ্ছ বিষয়ও যে গল্প হয়ে উঠতে পারে- চাক্ষুষ প্রমাণ দীলতাজ রহমানের রুক্ষ বয়ান। পুতুপুতু লেখার ধাঁচ তাঁর নেই। ঋজু এবং রূঢ় বাস্তবতাকে মূর্ত করে তোলেন নর-নারীর ক্লেদাক্ত ও কণ্টকাকীর্ণ যাপনে। কুসুমকোমল দিক কিংবা প্রতিঘাত-প্রত্যাঘাতের নিস্পৃহ কথক তিনি। নারীর ভাবনায় পুরুষ, পুরুষের ভাবনায় নারীর স্বরূপ কেমন- সালিশি পক্ষ হয়ে তুলে ধরেন ঘটনার পার্শ্বচিত্র।

‘উড়ে যাওয়া মেঘ’ গল্পে লেখেন- ‘সামিয়া পাখির ডানা ঝাপটে জল ঝরানোর মতো পাশার সব কথার রেশ মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে থাকে। সে জেনে গেছে শিল্পীর কোমল সত্তার কদর সাধারণ পুরুষ বোঝে না। শিল্পী হলেও নারীকে মাংসের কদরের ঊর্ধ্বে ওঠাতে পারে না।...’

প্রকৃতির নির্বাচিত সন্তানদের রুচি ও বোধ নানাভাবে আহত হয় বিরূপ প্রতিবেশে। সেই শিল্পী যদি হন নারী- সমস্যা বাড়ে আরো। প্রেমে কিংবা দাম্পত্যে শিল্পীকে যে একাকিত্বই বরণ করে নিতে হয় শেষ পর্যন্ত। এমন দর্শনে ঋদ্ধ গল্পটি। ‘তারান্নুম’ গল্পগ্রন্থের ভ‚মিকা-সূচনায় লেখক বলেন, ‘শিল্পসত্তা আর লড়াকুসত্তা একসাথে চলতে পারে না। তাদের একসাথে থাকতে হলে শিল্পসত্তাটি সততই লড়াকু দ্বারা নির্যাতিত হয়।...’ লেখকের সংগ্রামী চেতনা ও আত্মোপলব্ধিই ভিন্ন প্রেক্ষাপটে ধরা পড়েছে উল্লিখিত গল্পে।

‘প্রতিদান’ গল্পে বিধবা তসিরনের ছেলে জামশেদ আরেকজনের বউকে বিয়ে করে ঘরে তোলার পাঁয়তারা করে। আক্রোশে তসিরন ছেলের উদ্দেশ্যে বলে, ‘গোলামের পুত, ওয়ারে তুই বিয়া করছোস সংসার করতে, না ওয়ার দুধ খাইতে? তর মা তরে দুধ খাওয়াইয়া বড় করে নাই লো গোলামের পুত!...’ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মুখে ভাষাকে নিপুণ ভঙ্গিমায় তুলে আনেন গল্পে। বাক্য প্রয়োগের মুন্সিয়ানা তাকে জীবন-শিল্পী হিসেবেই সনাক্ত করে। ‘মমতাজ’ গল্পে উঁচু ও নিচু শ্রেণির প্রতিনিধিদের অভিন্ন চাতালে এনে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন সাদৃশ্য। পুরুষের আসলে ‘শ্রেণি’ হয় না। অন্তত একটি জায়গায় অভিন্ন চরিত্রের। উচ্চবিত্তের প্রতিনিধিত্বকারী সায়রার মুখ দিয়ে লেখক বলিয়ে নেন- ‘প্রেমহীন সঙ্গম যারা করতে পারে তাদেরকে আমি কখনো মানুষ মনে করি না। অথচ সেই অমানুষের সাথে একঘরে, একবিছানায় থাকতে হয়।...’

যথার্থ লেখকের দৃষ্টি যেমন সুরম্য অট্টালিকায় নিবদ্ধ তেমনি বস্তির গলিঘুপচির অন্ধকারের বাসিন্দাদের জীবনাচরণেও পৌঁছায় সমান গুরুত্বে। আবিষ্কারের প্রবণতাই সৃজনী সত্তাকে করে তোলে অনবদ্য। ‘আব্রুছেঁড়া শীত’ গল্পেও লেখক বয়ান করেছেন প্রান্তিক নারীর ভগ্ন সংসারের। আরেকজনের নতুন বউয়ের সঙ্গে যখন ভেগে যায় আমেনার স্বামী; তারপর “আমেনা আশপাশেই চার বাড়িতে ছুটা কাজ জুটিয়ে নিলো। পরদিন সকালে তার বিয়ের সময় দেয়া ‘সুখে থেকো’ লেখা রঙিন স্যুটকেস থেকে ছোট তালাটি খুলে তা দরজায় মজবুত করে আটকাতে আটকাতে সবাইকে হাঁক ছেড়ে বলে যায়, এই যে বুইনেরা, মাগি আমার জামাইরে নিচে নেউক, ওই নষ্ট জামাইরে আমি আর জায়গা দেবো না! যে আমারে ঘরের বাইর হরলো, মাইনষের বাড়ি কাম করতি বাইদ্দো হরলো। কিন্তু ওই মাগি য্যান তার কাঁথাখান লইয়া যাইতে না পারে, তোমরা কিন্তু হগ্গলে মিইলা এট্টু খিয়াল রাইখো।...”

এভাবেই সংগ্রামী হয়ে ওঠে নিরাশ্রয়, নিরন্ন নারী। বাধা পেয়ে, আঘাত সয়ে ঘুরে দাঁড়ায় আমেনা। দীলতাজ রহমানের গল্পের চরিত্ররা। জীবন যে মূলত যুদ্ধক্ষেত্র, দুর্বলের স্থান পৃথিবীতে নেই- গভীরভাবে দেখিয়ে দেন। পক্ষান্তরে পাঠককে কি ‘স্বাবলম্বী’ হওয়ার ইন্ধন জোগান! শক্তিমান লেখক সহজেই পাঠককে প্রভাবিত করতে পারেন। জ্ঞাতে কিংবা অজ্ঞাতে। গড়ে দিতে পারেন বোধের জ্যামিতি, অনাগত জীবনের কল্পচিত্র।

গল্পমুগ্ধ পাঠক হিসেবে সাহস করে বলি- কোনো একটি গল্পগ্রন্থের মোড়ক থেকে যদি দীলতাজ রহমানের নাম উহ্য রেখে ধারে-ভারে কাটা অন্য লেখকের নাম জুড়িয়ে দেয়া হয়- সাড়া পড়ে যাবে! অন্তত সাহিত্য পুরস্কার দেনেওয়ালারা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হবেন। তবে এমন পরীক্ষা-খেলায় যেমন গৌরব নেই, তেমনি যথার্থ স্বীকৃতি-বঞ্চিতের সাহিত্যকর্মেরও ফায়দা নেই। প্রাপ্তি কিংবা অপ্রাপ্তিতে। অনাগত মহাকালই বলে দেবে কোথায় কার ঠিকুজি, আসনের পুরুত্ব!

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...