গোয়েন্দাদের গোয়েন্দাগিরি

অরুণ কুমার বিশ্বাস

অরুণ কুমার বিশ্বাস

poisha bazar

  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:১৫

কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস। কে এই শার্লক হোমস? টুকটাক গোয়েন্দা গল্প পড়েন, অথচ শার্লক হোমসের নাম শোনেননি, এমন পাঠক খুঁজে পাওয়া সত্যি বিরল। ব্রিটিশ লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েল (১৮৫৯-১৯৩০) এর লেখা ‘অ্যা স্টাডি ইন স্কারলেট’ গল্পে সর্বপ্রথম বিশ্বখ্যাত প্রাইভেট গোয়েন্দা শার্লক হোমসকে দেখা যায়, লেখক নিজেই যাকে একজন ‘কনসালটেটিভ গোয়েন্দা’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। গোয়েন্দা শার্লক হোমস মূলত তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, ফরেনসিক সায়েন্স বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও ঘটনার যৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে আপাতচোখে একেবারেই ক্লু-লেস ঘটনার সঠিক সমাধান দিয়ে থাকেন।

তিনি কোথায় থাকেন? ২২১/বি, বেকার স্ট্রিট, লন্ডনে আড়াইতলা বাড়ির দোতলায় থাকতেন তিনি। মিসেস হাডসন ছিলেন তার বাড়িওয়ালি। তার বন্ধু, সহযোগী ও পরবর্তীতে তার বায়োগ্রাফার ডা. ওয়াটসন বলতে গেলে জীবনের বেশির ভাগ সময় কাটান শার্লক হোমসের সঙ্গে রিজেন্টস পার্ক-লাগোয় এই বাড়িতে। ডা. জন ওয়াটসনের বিয়ের পূর্বে এবং তার স্ত্রী বিয়োগের পরেও মিসেস হাডসনের বাড়িতেই শার্লক হোমসের সাথে ভাড়া থাকতেন। ওয়াটসনের এক প্রশ্নের উত্তরে হোমস বলেন, যেকোনো ঘটনার ডিটেকশন মানেই বিজ্ঞানমনস্ক পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা, আবেগ কিংবা রোম্যান্টিসিজমের কোনো জায়গা সেখানে নেই। মনে রেখ বন্ধু, নিছক চেয়ে থাকার নাম দেখা নয়। সাধারণ মানুষ যা দেখে, আমি তারচে অনেকটা বেশি দেখি ও বোঝার চেষ্টা করি। তফাৎটা এখানেই।

মজার ব্যাপার হল এই, কোনান ডয়েল তার গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমসকে প্রথম জনসমক্ষে আনেন ১৮৮৭ সালে, যখন কিনা তার বয়স মধ্যগগনে। শার্লক হোমস দীর্ঘ তেইশ বছর গোয়েন্দাগিরি করেন। তার মক্কেল বা ক্লায়েন্টের মধ্যে যেমন প্রভ‚ত ক্ষমতাধর মনার্ক বা রাজপরিবারের সদস্যরা ছিলেন, তেমনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত মানুষজন, শিল্পপতি বা একেবারেই গরিব পনব্রোকার কিংবা মামুলি গাভার্নেস। এমন কি তার ভাই মাইক্রফ্ট হোমস, যিনি কিনা উঁচুমাপের একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন, তিনিও একটি দলিলচুরির কেসে শার্লক হোমসের সাহায্য নিয়েছিলেন। সেই অর্থে মি. হোমসের মক্কেলদের ক্ষেত্রে যেমন বিষয়বৈচিত্র ছিল, তেমনি দেখা যায় পেশাগত তারতম্যও।

ছ’ফুট তিন ইঞ্চি হাইট, চৌকো মুখমণ্ডল, প্রায়শ কালো বা ছাইরঙ ওভারকোটে পরিদৃশ্যমান, সঙ্গীত ও ভায়োলিনে আসক্ত এই প্রাইভেট গোয়েন্দার পড়ালেখা প্রচুর। তিনি তার মক্কেলকে দেখেই বলে দিতে পারেন তিনি ঠিক কোন পেশায় রয়েছেন। এমনকি, মিসেস হাডসনের বাসার নিচে সিঁড়িতে জুতোর শব্দ শুনেও তিনি বুঝতে পারতেন মক্কেল ঠিক কী রকম বিপদে পড়েছেন! তাকে প্রধান চরিত্র করে লেখা কোনান ডয়েলের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস অ্যা স্টাডি ইন স্কারলেট, দ্য সাইন অফ ফোর, দ্য হাউন্ড অফ বাস্কারভিলস, দ্য ভ্যালি অফ ফিয়ার। ছোটোগল্পের মধ্যে রয়েছে দ্য অ্যাডভেঞ্চারস অফ শার্লক হোমস, দ্য মেমরিজ অফ শার্লক হোমস, দ্য রিটার্ন অফ শার্লক হোমস, হিজ লাস্ট বো এবং দ্য কেসবুক অফ শার্লক হোমস। বলা বাহুল্য, তার প্রতিটি গল্প বা উপন্যাস কিন্তু হোমসের সহযোগী ও বন্ধু ডা. জন ওয়াটসনের বয়ানে লেখা হয়েছে। হোমস নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ডা. ওয়াটসনের মতো বিশ্বস্ত থেকে আর কেউ তাঁর কাহিনী লিখতে পারতেন না।

এখানে উল্লেখ্য যে, ইংল্যান্ডের পুলিশ হেডকোয়াটার্স দ্য স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড অনেক কেসেই শার্লক হোমসের সাহায্য নিয়েছেন। কিন্তু তাই বলে মি. হোমস পুলিশের প্রতি বিরূপভাব বা তুচ্ছার্থক কোনো ইঙ্গিত কখনো করেননি, বরং পুলিশ ইন্সপেক্টর বারটন, স্যাম ব্রাউন, পিটার, গ্রেগরি, হিল বা ফরেস্টার সাহেবের সাথে একাত্ম হয়ে কাজ করেছেন। হোমস প্রায়ই বলতেন, খেলাটা মগজের। তাই এই খেলায় কেউ কারো প্রতিপক্ষ নয়। যার মগজ যত শাণিত, সে তত চৌকস গোয়েন্দার মর্যাদা পাবে। তবে পুলিশের সাথে তার গোয়েন্দাগিরির মূল পার্থক্য এই, শুরুতেই তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে সন্দেহের তালিকায় না নিয়ে বরং ঘটনার আনুপূর্বিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে তারপর রিট্রোডাকশন বা সবচে সহজ ও সম্ভব ব্যাখ্যাটিকে গ্রহণ করে সেই মতো তদন্তকার্য পরিচালনা করতেন।

কোনো কোনো সময় কব্জির মোচড়ে গুগলি বল ছোড়ার মতো প্রকৃত অপরাধীকে কিছু বুঝতে না দিয়ে তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন হোমস এবং একটু একটু করে পানি থেকে জাল গুটিয়ে নেন। আন্দাজে ঢিল ছোড়া শার্লক হোমস মোটেও পছন্দ করতেন না। তার বক্তব্য এই, না বুঝলে বোঝার চেষ্টা করো, কিন্তু তদন্তকে ভুলপথে পরিচালিত করো না। তাতে গোয়েন্দার নিজের উপরেই আস্থা উঠে যায়। সবচে বড় কথা, হোমসের পড়াশুনা ছিল প্রচুর। তিনি সামান্য রশির নট বা গিঁট দেখেই বুঝতে পারতেন, সম্ভাব্য অপরাধীটি কে। কালপ্রিট মামুলি কেউ, নাকি নৌবাহিনীর সদস্য! কখনো কখনো তিনি ‘ডাক টেস্টে’র সাহায্য নিতেন। অর্থাৎ কিছু একটা দেখতে হাঁসের মতো, সাঁতার কাটে হাঁসের মতো, ডাকেও হাঁসের মতো, তার মানে ওটা হাঁসই হবে। অর্থাৎ বিষয়ের অভ্যাসগত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে হোমস আসল অপরাধীকে শনাক্ত করতেন। এতে অবশ্য খুব সতর্ক পর্যবেক্ষণের দরকার হয়, কারণ অনেক সময় আমরা যা দেখি বা বুঝি তা সত্যি নাও হতে পারে। যারা অপরাধী, প্রায়শ তারা নিজের চেহারা ও চরিত্র লুকিয়ে রাখতে পারে। (চলবে)

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...