গুলজার মামার গরু কেনার গল্প

জুয়েল আশরাফ

মানবকণ্ঠ
- ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ২৪ জুলাই ২০২০, ১৫:১৪

আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু গুলজার মামা। প্রিয় হবার কারণ, মামার ধারণা আমি খুব বুদ্ধিমান একটি ছেলে। মামা আমার কাছে আসেন বুদ্ধির জন্য। মাঝেমধ্যে আমার বুদ্ধির প্রশংসা করতে গিয়ে আমাকে কোলে তুলে নেন। আর বলেন, ‘স্কুলে পড়ুয়া ছেলে তোর মাথায় এত বুদ্ধি!’

আমার বুদ্ধির একটি ছোট্ট উদাহরণ দিই- একবার নানিজান মামাকে কাঁচা বাজারে পাঠিয়েছেন। মামা কোনোদিন বাজার করেননি। মাছ কিভাবে দামাদামি করে কিনতে হয় জানেন না। আমাদের বাসায় করলেন ফোন। আমি বললাম, ‘মামা আপনি প্রথমে মাছের বাজারে গিয়ে খোঁজ করবেন সবচেয়ে ভালো দামাদামি করে মাছ কিনতে পারে কোন লোকটি। তার মাছ কেনা হলে মাছওয়ালাকে বলবেন আমাকেও একই দামে দেন।’ যা হোক, মামা সেদিন মাছ কিনে আনন্দে বাড়ি গেলেন। মামা সব কাজে আমার পরামর্শ নেন। কাল সারারাত মামা ঘুমাতে পারেননি। আজ যাবেন ঈদের গরু কিনতে। সেই আনন্দে মেঝেতে মাথা রেখে পা দুটো খাটের ওপর উঠিয়ে দিয়ে মনের সুখে মামা আবৃত্তি করে যাচ্ছেন- ‘হাট্টিমাটিম টিম, তারা মাঠে পারে ডিম, তাদের খাঁড়া দুটো শিং...।’ নানাজান বিরক্ত মুখে আমাকে বললেন, গাধাটাকে ডাক।

গুলজার মামাকে নানাজান মাঝেমধ্যে গাধা ডাকেন। একসময় আমি খুব আপত্তি করতাম। এই মামাটাকে আমি খুব ভালোবাসি। তাকে কেউ গাধা বললে সহ্য করতে পারি না। অবশ্য মামা বলেছেন, ‘গাধা ডাকলেই কেউ গাধা হয়ে যায় না রে পাগল। ভালোবেসেও অনেকে গাধা ডাকে।’ এরপর নানাজান যতবার ‘গাধা’ বলুক আমার ততবার আনন্দ হয়। আমার প্রিয় মামাটাকে নানাজান ভালোবেসে গাধা ডাকছেন শুনতেই কান আরাম পায়।

নানাজান গরুহাট যেতে পারবেন না। পায়ে কী সমস্যা, গরু কিনে হেঁটে আসতে কষ্ট হবে। এজন্য মামাকেই যেতে হবে। আমি খুশিতে খবরটা দিতে এলাম। বললাম, ‘মামা আমিও যাব তোমার সাথে। আমি কোনোদিন গরুহাট যাইনি।’

মামা বললেন, ‘না রে তুহিন জেদ করিস না। গরুহাট খুব ভিড় হয়। ঠেলাধাক্কা অবস্থা। এছাড়া পায়ে গোবর লাগে। বড় বড় শিংয়ের গরু, কখন গুঁতা মেরে দেবে! তুই বাড়িতেই থাক ভালো থাকবি।’

মামা আমাকে এই সেই বুঝিয়ে চলে গেলেন। গরু আসবে আনন্দে দুপুরে ভাত খেতে পারলাম না। মামা গরু নিয়ে এখনো আসেননি। অপেক্ষায় অপেক্ষায় কখন জানি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুমটা ভাঙল শোরগোলে। নানাজানের চিৎকার চেঁচামেচি শুনতে পেলাম। নানা বলে যাচ্ছেন- ‘গাধাটা দালালের পাল্লায় পড়ে অতগুলো টাকা দিয়ে একটা বাছুর এনেছে।’

ঘটনা বোঝার জন্য বাইরে এসে দেখি, উঠানে লাল রঙের একটি ছোট্ট গরু কাঁঠালগাছটার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা। বাড়ির সবাই গরুর দিকে তাকিয়ে আছে। গুলজার মামাকে দেখতে পেলাম না। নানাজানের রাগের সময় মামা কোথায় গিয়ে লুকান আমার জানা। বাড়ির পেছনে সারি সারি সুপারি বাগানে খুঁজতে এসে দেখি, একটি সুপারি গাছে ঠেস লাগিয়ে মামা দাঁড়িয়ে। দূর থেকে আমাকে দেখা মাত্রই হাতের ইশারা করলেন। আমি এগিয়ে এসে বললাম, ‘মামা কী হয়েছে?’

‘সর্বনাশ হয়ে গেছে রে তুহিন। গরুহাট গিয়ে প্রথমে খুঁজেছি সবচেয়ে ভালো দামাদামি করে গরু কিনতে পারে কোন লোকটি। এক লোকের দেখাদেখি বেপারীকে বললাম আমাকেও একই দামে দেন। কে জানতো আমার আগের গরু কেনা লোকটি যে ওদের দলেরই লোক। এটা ওদের চালাকি, কাস্টমার দেখলে ওরা নিজেরাই ক্রেতা সেজে দামাদামি করে। বুঝি বুঝি আমি সব বুঝি এখন।’

আমি হাই তুলে বললাম, ‘এখন আর বুঝে কী হবে মামা? গরু তো কেনা হয়ে গেছে।’

মামা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘সত্যি ভুল হয়ে গেল। তোকে সাথে নেয়া দরকার ছিল। তোর মতোন বুদ্ধিমান ছেলে সাথে থাকলে বিপদটা আসতো না।’
সাথে সাথে গর্বে আমার বুক টান টান হয়ে উঠল। কেউ আমাকে বুদ্ধিমান বললে আমার খুব আনন্দ হয়। তারপরও আমি ভাবি, ইস! আমি যদি মামার মতো বড় হতাম!

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...