হুমায়ূনবিহীন ৮ বছর


poisha bazar

  • ১৯ জুলাই ২০২০, ১০:১১

এসএম মুন্না : যদি প্রশ্ন করা হয় এই উপমহাদেশের কথার জাদুকর কে, নিশ্চয় অকপটে উত্তর আসবে তার নাম। তিনি আর কেউ নন। সবার পরমপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। বিচিত্র বিষয় নিয়ে লেখা, চরিত্র নির্মাণ, গল্প তৈরি, লাগসই সংলাপ রচনা- এ সবকিছু মিলিয়ে তিনি এক অভিনব ধারা সৃষ্টি করেন, যে শৈলী একান্তই তার নিজস্ব। রসবোধের কারণে তার রচনা খুব সহজেই পাঠকের মন জয় করে নিয়েছে।

আজ রোববার সেই জননন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১২ সালের আজকের এই দিনে তিনি নিউইয়র্কের বেলভ্যু হাসপাতালে ক্যান্সারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। দেখতে দেখতে কেটে গেল জননন্দিত এই কথাশিল্পীর মহাপ্রয়াণের ৮টি বছর। করোনা পরিস্থিতির কারণে সীমিত পরিসরে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা হবে।

‘নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে/রয়েছ নয়নে নয়নে,/হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে/হৃদয়ে রয়েছ গোপনে’- কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গানের এই কটি চরণ খুবই পছন্দ করতেন বাংলা সাহিত্যের বরপুত্র নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। শহীদ পিতা ফয়জুর রহমানের কবরে এপিটাফে চরণ দুইটি খোদাই করেছেন তিনি।

‘লীলাবতী’ নামে হুমায়ূন আহমেদের এক কন্যা জন্ম নিয়েছিল দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের গর্ভে। সন্তানটি জন্মের সময় মারা যায়। এই মেয়ের নামে নাম রেখেছেন দীঘির। তার পাড়ে শান-বাঁধানো ঘাটের পাশে মার্বেল পাথরে লিখে রেখেছেন এপিটাফ, রবীন্দ নাথের লেখা এই চরণ দুইটি। কবিগুরুর কথাগুলোর মতোই তিনি আজ নেই নয়নের সম্মুখে। কিন্তু সবার অলক্ষ্যেই তিনি রয়ে গেছেন নয়নে নয়নে। রবীন্দ নাথের ভাষায় বলতে হয়- ‘বাসনার বশে/মন অবিরত/ধায় দশ-দিশে পাগলেরও মতো/স্থির আঁখি তুমি/মরমে শতত-জাগিছো শয়নে স্বপনে...’।

মাত্র ৬৪ বছরের জীবনে হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যের অঙ্গনে, টেলিভিশন নাটক আর চলচ্চিত্রাঙ্গনে এমন জনপ্রিয়তায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। তার মতো অতুলনীয় পাঠকপ্রিয় ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার, নাট্যকারের শূন্যতা যে কখনো পূরণ হবে না- তা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায়।

অমর একুশের গ্রন্থমেলায় প্রকাশকরা যে বিপুলসংখ্যক বই প্রকাশ করেন, সব বই মিলিয়ে যা বিক্রি হতো, একা হুমায়ূন আহমেদের লেখা বই তার প্রায় সমান বিক্রি হতো। তার মহাপ্রয়াণের ৮টি বছর পরও অব্যাহত রয়েছে। এখনো তার বই কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়েন পাঠক-সাধারণ।

মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর ১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ শিরোনামে ঢাকা থেকে বের হয় একটি উপন্যাস। উপন্যাসটি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটি বাঙালি মধ্যবিত্ত পাঠকদের মন জয় করে নেয়। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের কাছে নতুন এক ধরনের উপন্যাস বলে মনে হয়, কারণ এ ধরনের উপন্যাস তারা আগে কখনো পড়েননি।

‘নন্দিত নরকে’ বইটি রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আহমদ শরীফও বইটির প্রশংসা করে লেখেন, ‘বাংলা সাহিত্যে একজন শক্তিশালী ঔপন্যাসিকের আবির্ভাব ঘটেছে।’ হুমায়ূন আহমেদের শরীরে ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে মরণব্যাধি ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপর তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান।

সেখানে ২০১২ সালের জুলাই মাসের ১৬ তারিখ তিনি চলে যান লাইফ সাপোর্টে। সেখান থেকেই ৮ বছর আগে ১৯ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২৩ জুলাই নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ। তাকে সমাহিত করা হয় তার গড়ে তোলা নন্দনকানন নুহাশ পল্লীর লিচুতলায়। সেখানেই চিরঘুমে শায়িত হয়ে আছেন প্রবাদপ্রতিম কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ।

হুমায়ূন আহমেদের হিমু আর মিসির আলী সিরিজ এদেশে সাহিত্যে এক নতুন ধারা এবং এ দুটি কালজয়ী চরিত্র তাকে বিশেষভাবে অবিস্মরণীয় করে রাখবে। শুধু হাস্যরস আর নিছক মধ্যবিত্তের হাসি-কান্না ধরা পড়েনি তার কলমে, ধরা পড়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাঙালি সমাজ-জীবনের অনেক বড় ঘটনাও।

তার নাটকের টিয়ে পাখির মুখের একটি সংলাপ ‘তুই রাজাকার’ বহু বছর আগে সারা দেশে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দিয়েছিল, যা সেই সময় ছিল দুঃসাহসিক উচ্চারণ। জীবনের অস্তবেলায় ক্যান্সারের সঙ্গে লড়তে লড়তেই লিখে গেছেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের মর্মস্পর্শী ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস ‘দেয়াল’।

দুই শতাধিক গ্রন্থের অমর স্রষ্টা একুশে পদক ও একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিজয়ী এই কুশলী কথাশিল্পী, চলচ্চিত্রকার, গীতিকার সাহিত্যের যে শাখায়ই হাত দিয়েছেন, সেখানেই রেখে গেছেন তার অসামান্য মেধার স্বাক্ষর। জাপান টেলিভিশন ‘এনএইচকে’ তাকে নিয়ে নির্মাণ করে ১৫ মিনিটের তথ্যচিত্র ‘হু ইস হু ইন এশিয়া’।

হুমায়ূন আহমেদ প্রসঙ্গে বলেন সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী ও প্রখ্যাত বাকশিল্পী-অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘তিনি আমাদের মধ্যবিত্তজীবনের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার গল্প তুলে ধরেছেন দৈনন্দিন ভাষায়। দৈনন্দিন বলে সে ভাষা কিন্তু ফেল না নয়। মানুষের আবেগ-অভিমান, হতাশা-বঞ্চনা, মনস্তাস্ত্বিক জটিলতা উঠে এসেছে সে ভাষায় নিখুঁতভাবে। এখানেই তিনি আর দশজন থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলেছেন। সরল ভাষারও যে কী সম্মোহনী শক্তি! কাহিনীর পাশাপাশি তার রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য চরিত্র নির্মাণ। তার গল্প-উপন্যাস-নাটকের চরিত্রগুলোর প্রায় সবাই যেন আমাদের খুব পরিচিত মানুষ। প্রতিদিনের চেনা মানুষই তিনি আমাদের কাছে বিশেষভাবে পরিচয় করিয়ে দেন। ‘বাকের ভাই’ চরিত্রটি ঠিক তেমনি। আমার কাছে এটা একটা অবিস্মরণীয় চরিত্র।’

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। ডাক নাম কাজল। বাবা ফয়জুর রহমান আহমেদ ও মা আয়েশা ফয়েজ। তিন ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। জনপ্রিয় শিশুসাহিত্যিক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল তার ছোটভাই। সবার ছোটভাই আহসান হাবীব নামকরা কার্টুনিস্ট ও রম্যলেখক।

১৯৭৩ সালে প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁর নাতনি গুলতেকিন খানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন হুমায়ূন আহমেদ। হুমায়ূন এবং গুলতেকিন দম্পতির চার ছেলেমেয়ে। তিন মেয়ে নোভা, শীলা ও বিপাশা এবং ছেলে নুহাশ হুমায়ূন। দীর্ঘ ৩২ বছরের দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটিয়ে ২০০৫ সালে ডিভোর্সের মাধ্যমে তারা পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। এরপর তিনি অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির দুই ছেলে-নিষাদ ও নিনিত হুমায়ূন। গাজীপুরের পিরুজালীতে নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন সবুজ ছায়াঘেরা নিসর্গ ‘নুহাশপল্লী’। সেখানেই চিরঘুমে আছেন হুমায়ূন আহমেদ।





ads






Loading...