আষাঢ়স্য দিনে

দীপংকর গৌতম

দীপংকর গৌতম
আষাঢ়স্য দিনে - দীপংকর গৌতম

poisha bazar

  • ২৭ জুন ২০২০, ১৪:৩৭

প্রকৃতি চেতনা সব সময়ই মানসলোকে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ। ফলে ঋতু বৈচিত্র্যের প্রভাবটা এখানে একটু বেশি দৃষ্টিগোচর হয়। প্রাচীনকাল থেকেই বর্ষাবন্দনা বাঙালি কবিকুলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিরহে নিমজ্জিত কবি লিখেছেন-

এ ঘোর রজনী মেঘের ঘটা/ কেমনে আইলো বাটে।/ আঙিনার মাঝে বধূয়া ভিজিছে/ দেখিয়া পরাণ ফাটে
(চণ্ডীদাস)

একইভাবে দেখি প্রাচীন আরেক কবির লেখা বর্ষণ মুখর দিনে বিরহের সুর নিহিত আরেকটি কবিতা-
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।/ এ ভরা বাদর মাহ বাদর/ শূন্য মন্দির মোর
(বিদ্যাপতি)

দুই প্রাচীন কবির কবিতা পড়ে বর্ষা নিয়ে পাঠকের মনে নব চেতনার অনুরণন ঘটে। মহাকাব্যের যুগের মহাকবি থেকে শুরু করে মধ্যযুগের কালিদাস পুরো কাব্য আখ্যানের মধ্যে ঋতুকেন্দ্রিক ভালোবাসার যে আকিঞ্চন পাঠকের জন্য রেখে গেছেন, তাতে তো এই বর্ষায় মন ঘরে থাকার কথা নয়। ‘মেঘদূত’-এর কথাই যদি বলি, কী এমন ঘটনা অথচ বর্ণনা ও উপস্থাপনার ঘনঘটায় সেখানে বিরহ কতটা প্রবল, কতটা প্রকট তা পাঠক মাত্রই জানেন। যক্ষকে নির্বাসন দেয়া হলে উজ্জয়িনী নগরীতে বসবাসরত স্ত্রী’র জন্য তার সোমত্ত বিরহ জাগ্রত হয়ে ওঠে। যে করেই হোক, প্রিয়তমা স্ত্রী’র সঙ্গে তার তখন যোগাযোগ করা চাই-ই চাই। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? দূর তো আর কম নয়! তাছাড়া নির্বাসিত জীবনে সে কীভাবে স্ত্রী’র সঙ্গে যোগাযোগ করবে? এই মনোযাতনার ভেতরে আষাঢ়ের প্রথম দিনে তিনি দেখলেন একখানা মেঘ। মেঘকে জানালেন দুঃখের কথা, বিরহের কথা, পীড়িত হৃদয়ের কথা। মেঘ যক্ষের কথা শুনে দয়াবান হলো। যক্ষ মেঘের মাধ্যমে প্রিয়তমা স্ত্রী’র উদ্দেশ্যে একখানা চিঠি লিখলেন। মেঘকে দূত করে এই যে বার্তা প্রেরণ, এ ঘটনার মধ্যে দিয়ে সংস্কৃত সাহিত্যে ‘মেঘদূত’ কাব্যটি শুধু শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারই হয়ে ওঠেনি, বরং বিশ্বের তাবৎ ভালোবাসার মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে প্রেমের মূর্ত প্রকাশ। আষাঢ় এলেই গ্রামবাংলার শাশ্বত চিত্র চোখের চতুষ্কোণে বিম্বিত হয়ে ওঠে। টিনের চালের উপরে আকাশ থেকে নেমে আসা জলধারার টপটপ শব্দ, সারাদিন ধরে একটানা বৃষ্টিতে গাছের ডালে ভেজা কাকের অসহায় বসে থাকা, অথবা কিশোরীর চুল থেকে ঝড়া মুক্তদানার মতো বৃষ্টির জল পড়ার শব্দ একটু কান পাতলেই কিন্তু শোনা যায়। কচুর পাতার ভেতর বৃষ্টির জল নিয়ে খেলা করা দূরন্ত শৈশব সে তো এই বর্ষাকালের জন্যই। অথচ আজ তাকে খুঁজে পাওয়া ভার! এসব কিছুর পরেও বর্ষাকাল মানেই বিরহ, বর্ষাকাল মানেই কবিতার অনন্ত প্রহর।

মধুসূদন তার কবিতায় বর্ষা এনেছেন প্রকৃতির অরূপ শক্তি হিসেবে। বর্ষার প্রকৃতি আর মানব প্রকৃতি এখানে একাকার। যার সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন দেবতাগণও। ‘বর্ষাকাল’ কবিতায় তিনি বিম্বিত করেছেন যক্ষের বিরহী অন্তরের বারতা। যার মধ্য থেকে উত্থিত হয়েছে গভীর গর্জন, নদীর উত্তাল ঢেউয়ের আছড়ে পরা কল্লোল। তিনি লিখেছেন-

গভীর গর্জ্জন সদা করে জলধর,/ উথলিল নদ-নদী ধরণী উপর।
রমণী রমণ লয়ে, সুখে কেলি করে,/ দানবাদি, দেব, যক্ষ সুখিত অন্তরে।
(বিবিধ কাব্য)

এক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বর্ষাবন্দনা’ আপনাকে মনে করিয়ে দেবে বর্ষা বুঝি শেষ হওয়ার নয়। চির যৌবনা বর্ষা অনন্তকাল ধরে কাব্যের ভেতরে-বাইরে যে ভূমিকা রেখেছে, সবগুলো ঋতু মিলেও তা বোধহয় সম্ভব হচ্ছে না। প্রাচীন কবিদের মতো এ কালের কবি রবীন্দ্রনাথ অপার বিস্ময় ও অতল রহস্যময় বলে মনে করেছেন বিশ্ব প্রকৃতিকে। তিনি ঋতুচক্রের মধ্যেও খুঁজে পেয়েছেন নির্বাধ গতিশীলতা। তার বর্ষার গানেও এই ঋতু চেতনার পরিচয় মেলে।

আপন ভাবকল্পনা ও মনের রঙে তিনি বর্ষাকে দেখতে চেয়েছেন, অনুভব করেছেন বর্ষার সঙ্গে অন্তর্লীন সম্পর্ক। ‘জীবন স্মৃতিতে’ কবি তার কাব্যে বর্ষা এবং যৌবনে শরতের ভাবনার প্রভেদ দেখাতে গিয়ে বলেছেন, ‘সেই বাল্যকালের বর্ষা ও এই যৌবনকালের শরতের মধ্যে প্রভেদ এই দেখিতেছি যে, সেই বর্ষার দিনে বাহিরের প্রকৃতিই অত্যন্ত নিবিড় হইয়া আমাকে ফিরিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার সমস্ত দলবল সাজসজ্জা এবং বাজনা-বাদ্য লইয়া মহাসমারোহে আমাকে সঙ্গদান করিয়াছে। আর, এই শরৎকালের মধুর উজ্জ্বল আলোকটির মধ্যে যে উৎসব তাহা মানুষের। মেঘ রৌদ্রের লীলাকে পশ্চাতে রাখিয়া সুখ-দুঃখের আন্দোলন মর্মরিত হইয়া উঠিতেছে, নীল আকাশের উপরে মানুষের অনিমেষ দৃষ্টির আবেশটুকু একটা রঙ মাখাইয়াছে এবং বাতাসের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের আকাক্সক্ষাবেগ বহিতেছে।’ কবি যদিও শৈশবের বর্ষার বাইরের রূপ এবং যৌবনে শরতের অন্তরঙ্গ রূপটি দেখেছেন তা সত্ত্বেও দুটো ঋতুর সঙ্গে তিনি এক ধরনের আত্মীয়তার সম্পর্ক অনুভব না করে পারেননি। বর্ষার বন্দনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘এমন দিনে তারে বলা যায়।’

এমন দিনে কাকে বলা যায়? সে কে? কোথায় তার বাস? তা রবীন্দ্রনাথ যেমন জানতেন, বাঙালি মানস তেমনই জানেন। এমন দিনে যারে বলা যায়, সে কী ঈশ্বর না প্রেম? প্রেমের নামই ঈশ্বর? রবীন্দ্রনাথ বর্ষাবন্দনা কতভাবে যে করেছেন, তার শেষ নেই।

‘বসন্ত আমাদের মনকে চারদিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়, বর্ষা তাহাকে এক স্থানে ঘনীভূত করিয়া রাখে। বর্ষায় আমাদের মনের চারদিকে বৃষ্টি জলের যবনিকা টানিয়ে দেয়, মাথার উপরে মেঘের চাঁদোয়া খাটাইয়া দেয়। চারদিক হতে ফিরিয়া আসিয়া এই যবনিকার মধ্যে এই চাঁদোয়ার তলে একত্র হয়। পাখির গানে আমাদের মন উড়াইয়া লইয়া যায়, কিন্তু বর্ষার বজ্রসংগীতে আমাদের মনকে মনের মধ্যে স্তম্ভিত করিয়া রাখে। পাখির গানের মতো এ গান লঘু নহে। ইহা স্তব্ধ করিয়া দেয়, উচ্ছ্বসিত করিয়া তুলে না। অতএব দেখা যাইতেছে, বর্ষাকালে আমাদের ‘আমি’ গাঢ়তর হয়, আর বসন্তকালে সে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে।’

‘পরিচয়’ গ্রন্থের ‘আষাঢ়’ গদ্যে রবীন্দ্রনাথ ছয়ঋতুর বর্ণভেদ করতে গিয়ে বর্ষাকে ক্ষত্রিয় বর্ণে ফেলেছেন। বলেছেন, ‘বর্ষাকে ক্ষত্রিয় বলিলে দোষের হয় না। অল্পে তাহার সন্তোষ নাই। লড়াই করিয়া সমস্ত আকাশটা দখল করিয়া সে দিক চক্রবর্তী হইয়া বসে।’

‘ক্ষণিকা’র ‘নববর্ষা’ কবিতায় কবি উচ্ছ্বাস ভরে বলেছেন, ‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচেরে।’ ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে ২ আষাঢ় ১২৯৯ তারিখের চিঠিতে কবি লিখেছেন, ‘হাজার বছর পূর্বে কালিদাস সেই যে আষাঢ়ের প্রথম দিনকে অভ্যর্থনা করেছিলেন এবং প্রকৃতির সেই রাজসভায় বসে অমর ছন্দে মানবের বিরহ সংগীত গেয়েছিলেন আমার জীবনেও প্রতি বৎসরে সেই আষাঢ়ের প্রথম দিন তার সমস্ত আকাশ জোড়া ঐশ্বর্য নিয়ে উদয় হয়।’ কবির জীবনে ৮১টি আষাঢ় এসেছিল। এর মধ্যে কবির জীবনের গোড়ার দিকের ২০ থেকে ২৫টি আষাঢ় বাদ দিলে প্রতিবছর আষাঢ়েই তিনি গান লিখেছেন। বর্ষা ছিল কবির বেশ কিছু মনোজ্ঞ গান সৃষ্টির উৎস।

সাম্য ও প্রেমের কবি কাজী নজরুলের কবিতায় বর্ষা এসেছে ভিন্ন আঙ্গিকে। বিরহের অন্তঃশীলা তার কবিতায় বিন্যস্ত হয়েছে বিম্বিত বিস্তারে। বাদল দিনের মেঘ তাকেও যক্ষের মতো করেছে বিরহ পাগল। বর্ষাধারাকে তিনি বর্ণনা করেছেন প্রিয়তমার আগমনী বারতা হিসেবে। বাদল ধারা প্রিয়ার আগমনী সুরকে বিদায়ী সুরে পরিণত করেছে। কবি লিখেছেন-

বাদল রাতের পাখী।/ উড়ে চল যেথা আজো ঝরে জল, নাহিক ফুলের ফাঁকি।
(চক্রবাক; বাদল রাতের পাখী)

কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বর্ষা তেমন প্রভাব না ফেললেও অমিয় চক্রবর্তী কিংবা বিষ্ণু দে’র কবিতায় বর্ষা এনেছে অন্যমাত্রা। এখানে বর্ষা শুধু প্রেমের প্রতীক নয়। এখানে বৃষ্টি নতুন প্রাণের সঞ্চারক। অমিয় চক্রবর্তীর ‘বৃষ্টি’ কবিতায় বর্ষা বিম্বিত হয়েছে নতুন রূপে, নতুন কাব্য সুষমায়-

‘অন্ধকার মধ্য দিনে বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে/ বৃষ্টি ঝরে রুক্ষ মাঠে, দিগন্তপিয়াসী মাঠে, স্তব্ধ মাঠে,/ মরুময় দীর্ঘ তিয়াষার মাঠে, ঝরে বনতলে,/ ঘনশ্যামরোমাঞ্চিত মাটির গভীর গূঢ় প্রাণে/ শিরায় শিরায় স্নানে, বৃষ্টি ঝরে মনের মাটিতে।’
(একমুঠো)

বাংলা কবিতায় বর্ষা বন্দনা হয়েছে যুগে যুগে। বর্ষা আর বৃষ্টি এখন কবিতার একটি অংশ। বর্ষামঙ্গলের স্তুতি আর রবীন্দ্রনাথের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাংলা সাহিত্যে বর্ষার আকার এখন বিশাল ক্যানভাসজুড়ে। এ কারণেই কিনা জানি না, এই বঙ্গে বর্ষা ঋতু ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময় বৃষ্টি হয়। কিন্তু বিরহের শব্দাবলি এই বর্ষায়ই। এই বর্ষায় তাকেই মনে পড়ে তীব্র বর্ষায় বিম্বিত হয় যার মুখ। তার জন্য হাহাকার এই বৃষ্টিতে ধুয়ে যায়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...