গল্প

দেখা হবে

অয়েজুল হক

- ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২০ মে ২০২০, ১৪:৩৯

যেদিন থেকে শান্ত আক্রান্ত মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেছে তখনই একটা প্রতিজ্ঞাবাক্য বুকের গভীরে গেঁথে নিয়েছ - অসহায় মানুষ ফেলে যাবে না; জীবন গেলেও না। হাসপাতালকে ঠিকানা বানিয়ে রাতদিন মানুষের সেবা। ফারহানা, শান্তর স্ত্রী। তাকে বলে দিয়েছে ডিউটির সময় যেন ফোন না দেয়। তারপরও সময় অসময়ে ফোন দেয়। কান্না জুড়ে বলে, 'সন্তানের জন্য হলেও বাড়ি আসো।' শান্ত শুধু বলেছে, 'ফারহানা, বিভীষিকাময় চূড়ান্ত কষ্টের ভেতর মানুষ ফেলে যাব? দেখা হবে রৌদ্রজ্বল আলোকিত একদিন। '

ফারহানার সাথে বিয়ে হয়েছিল আচমকা। অধিকাংশ ডাক্তার পাত্রী হিসাবে আরেকজন ডাক্তার চায়। শান্তর ভাবনায় যে এমন ছিল না তা নয়। সেও বুকের ভেতর লালন করতো তার স্ত্রী হবে একজন ডাক্তার। অবশ্য সিদ্ধান্ত পাকা ছিল, লেখাপড়া শেষ হবার আগে কোনভাবেই ভাবনাটা মনপ্রাণ জুড়ে বসতে দেবে না। গেঁথে দেবে না। এমবিবিএস তারপর লন্ডন থেকে পিএইচডি করে সবে বাড়ি ফিরেছে। দেশে ফেরার পর প্রতিটি সূর্যোদয় ছিল মনোমুগ্ধকর, প্রতিটি দিন ছিল স্বপ্নময়। এমনই এক স্বপ্নময় সুন্দর সকালে আম্মু এসে বলে, শান্ত ফারহানা কে চিনিস?

শান্ত কিছুটা অবাক হয়ে বলে, কিসের ফারহানা?
-হারুন সাহেবের মেয়ে ফারহানা।
শান্ত একগাল হেসে বলে, ওহ আচ্ছা। না তো আম্মু চিনি না।
-ভাবছি ফারহানার সাথে তোর বিয়ের কথাটা পাকা করে ফেলি।
-সে কী ডাক্তার?
-ডাক্তার হতে যাবে কেন?
-আম্মু আমি যে ভেবেছি ডাক্তার মেয়ে বিয়ে করবো।
-শান্ত।
-হু।
-আমি ফারহানাকে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছি। আশা দিয়েছি। রহিমা বেগম কিছুটা গম্ভীর। তার কথার ভেতরে কিছু অধিকার, দাবি আর ভালোবাসার সংমিশ্রণ।

ঘটনাটা এমন। এলাকার প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পিতার একমাত্র কন্য ফারহানা। একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে ফারহানার সাথে প্রথম পরিচয়। নিখুঁত গড়নের মেয়েটাকে প্রথম দেখাতেই ছেলের বউ হিসাবে ভাবতে শুরু করেন রহিমা বেগম। কাছে ডেকে বলেন, এই মেয়ে তোমার নাম কী?
ফারহানা মুচকি হেসে বলে, 'আমাকে চেনেন না চাচি আম্মা?'
ফারহানার মা সালেহা বেগম পেছনেই ছিলেন। অল্প বয়স, সুন্দরী মেয়ে। মেয়ের জন্য এখন সালেহা বেগমের অনেকটা থানার ওসি টাইপ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এগিয়ে এসে বলেন, 'আমার মেয়ে, চিনেন না? অবশ্য না চেনারই কথা। ওকে খুব একটা বাইরে যেতে দেই না। কলেজ আর বাড়ি, এই।'
রহিমা বেগম ফারহানার দিকে অনেক সময় তাকিয়ে থেকে শুধু বলেন,'আপনার মেয়ে? দেখতে বেশ সুন্দর হয়েছে।'

তারপর বিয়ের কথাবার্তা অনেকটাই পাকা করে ফেলেন রহিমা বেগম। শুধু ছেলের মতামতের অপেক্ষা। ছেলে যে মায়ের সিদ্ধান্তের বাইরে যাবেনা সেটাও বলে রাখেন।

শান্ত এতদিনে বুঝতে পারে, সে আসার পর কেন ফারহানা শুধু চারপাশে ঘুরছে। শান্ত তাকে জীবন সাথী হিসাবে পছন্দ করছে না সেটা জানার পর ফারহানা কে আর দেখা যায় না। তার বেশ ক'দিন পর বিকালের সূর্যটা যখন মেঘ বৃষ্টির সাথে লুকোচুরি খেলছিল তখন দেখা ফারহানার সাথে। দোকান থেকে ফাস্টফুড জাতীয় কিছু খাবার হাতে বাড়ির পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। শান্ত ডাক দেয়, 'ফারহানা।'

মেয়েটা যেন চমকে ওঠে। স্থির হয়। পেছন ফিরে তাকায় না। শান্তই সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। 'কেমন আছ ফারহানা?'
ফারহানা শুধু বড় চোখে তাকিয়ে ছিল। ঠিক সে সময় বাকরুদ্ধ ফারহানার চোখে ভেসেছিল ঢেউ তোলা ভালোবাসার সব অলিখিত কথা। শান্ত আর পিছু হটেনি। বাড়ি ফিরে মাকে বলে দেয় বিয়ের আয়োজন করতে। শান্তর পিতা ব্যংক কর্মকর্তা। অবসর সময় তিনি শুধু বই পড়েন। নিজের কিংবা ছেলের কারও জীবন সংসার নিয়ে তার কোন মতামত নেই। কোন কিছুতেই আপত্তি অনাপত্তি নেই। অবশ্য এ ব্যপারে তিনি ব্যক্তিগত মতামত পেশ করেন, 'মেয়েটা খুব ভালো।'

শান্তর বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর প্রথম সাক্ষাতে ফারহানার চোখ ভিজে ওঠে।
-কাঁদছ ফারহানা?
-হু।
-কেন?
-এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলাম বহুদিন; স্বপ্নের ডালি সাজিয়ে। ভয় ছিল হারাবার। যদি না পাই। আমি পেয়েছি...

শান্ত কবিতার মতো বলে-
কাদিস না, বৃষ্টিজল ছুঁয়ে যাবার দিন
মুখের কোনে এক টুকরা বাঁকা হাসি, দুঃখ গুলো গড়াবে।
ভাঙিস না খরার পর, ফাটা জমিন ভেজেই তো
বৃষ্টিধারা জমিন ভেজায়, মন ভেজায়।


বিয়ের দুই বছরের মাথায় নতুন অতিথি ফাহিমা আসে। চার বছর পেরোতেই শান্তর বদলি হয় সিলেট। ছোট ছোট টিলা ঘেরা সবুজ শহরে স্বপ্নময় দিনগুলো পার হয়। হঠাত করেই সব ওলট পালট...

ডোরবেল বাজতেই দরজার দিকে ছুটে যায় ফারহানা। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত। তার ভালোবাসার এক মায়াবী মুখ, নিষ্পাপ আদুরে সন্তান যার মুখের মায়াবী হাসি শান্তর দুঃখগুলো ভুলিয়ে দেয়। কী এক অনবদ্য প্রাণের টান। সারারাত ডিউটি করে ডাক্তারদের জন্য বরাদ্দকৃত হোটেলে না ফিরে দুর্নিবার এক ভালোবাসার টানে ছুটে এসেছে। কতোদিন স্ত্রীকে দেখে না। তিন বছরের ছোট্ট শিশু আব্বু আব্বু করে ছুটে যেতেই পেছনে সরে যায় শান্ত। ফারহানা কে বলে ওকে সরিয়ে নিতে।

মেয়েকে বুকে নিয়ে ফারহানা বলে, 'পোশাক খুলে ভেতরে আস।'
-না,ফারহানা। অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হচ্ছে। পোশাকের ভেতরের আমিটা যে ঠিক আছি সে কথা কীভাবে বলি।
শুধু তোমাদের দেখতে এসেছি। দূর থেকে এভাবে দেখতে হবে কে জানত?

শান্ত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায়। ফারহানার চোখ দুটো ভিজে ওঠে। এভাবে অতিবাহিত হয় বিভীষিকাময় দিন-রাত। দক্ষিণের জানালা ধরে ফারহানা যখন জনমানবশূন্য আঁকাবাঁকা পথে এগিয়ে যাওয়া রাস্তার দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে সে সময় তার শান্ত মুমূর্ষু, অসহায় মানুষের জন্য দৌড়ঝাঁপ চালিয়ে যায় অবিরাম। এর ভেতর কবে কখন, অজান্তেই ভাইরাস শরীরে দানা বেঁধেছে টের পায়নি। আকাশে, বাতাসে যেন বাঘ ওড়ে! দেখা যায় না। অদৃশ্য, অদেখা এ ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুজীবে বিশ্বাস, ভয়, আতঙ্ক। একের পর এক মৃত্যু মিছিলে যোগ হচ্ছে জীবন্ত সব মানুষ। ভাবতে পারেনা, শান্তর নিঃশ্বাস যেন চেপে ধরছে কেউ। অসহ্য যন্ত্রনা। ভাইরাস এমন হয়?

মোবাইলটা বেজে ওঠে। একজন নার্স রিসিভ করে কানের কাছে ধরে। ফারহানা কাঁদছে, 'শান্ত আমি এসেছি। তুমি বল ওরা যেন তোমার কাছে যেতে দেয়।'
শান্ত কষ্ট সামলে বলে, 'শক্ত হও ফারহানা। ফিরে যাও। দেখা হবে... আর বলতে পারেনা।

শান্তকে খুব দ্রুত স্ট্রেচারে করে দোতলার আইসিইউতে নিয়ে আসা হয়েছে। খুব বেশি সময় নয়, বড়জোর আধঘন্টা। একজন আদ্যোপান্ত পোশাক জড়ানো ভিনগ্রহের মানুষ রূপী প্রাণী যেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে বলে, ভাবী মনটাকে শক্ত করুন। বাড়ি ফিরে যান।
ফারহানা অনেকটা পাগলের মতো বলে, 'আমার শান্ত...'
-সরি, আমরা চেষ্টা করেছি। পারিনি।
ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে ফারহানা। স্তরে স্তরে সাজানো স্বপ্ন মুহূর্তে ধ্বসে পড়ে। চোখ দুটো ভিজে যায় নোনা জ্বলে। মেয়েটা মায়ের দিকে তাকায়। কচি গলায় বলে, 'আম্মু তুমি কাঁদছ কেন? আব্বু কোথায়?'
-তোমার বাবা আলোকিত জগতে চলে গেছে মা।

তিন বছরের ছোট্ট শিশুর পক্ষে এসব বুঝে ওঠার কথা নয়। তাঁর চোখ দুটো পিতাকে দেখার জন্য ব্যাকুল। সেই কতোদিন হয়ে গেল, আব্বু তাকে বুকে জড়িয়ে আদর করে না। কোথায় তার পিতা? ফারহানা ফিসফিস করে বলে, 'শান্ত চলে গেছ তুমি..। নাহ, আর যে দেখা হলো না! বলেছিলে দেখা হবে আলোকিত দিনে। বিশ্বাস কর, যদি বেঁচে থাকি তোমার ফাহিমাকে নিয়ে অপেক্ষায় ঠিকই পেরিয়ে যাবে আমার দিন। তারপর দেখা হবে কোন এক আলোকিত দিনে।'

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...