ব্যঙ্গরচনা

চরিত্রগুলো কাল্পনিক

এম এল গনি

মানবকণ্ঠ
চরিত্রগুলো কাল্পনিক - এম এল গনি

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১০ মে ২০২০, ২১:১৯

দলের মহিলা নেত্রীরাও হেভি মেক-আপ পরে গ্রামগঞ্জের কৃষকদের ধান কাটায় সহায়তা দিতে মাঠে নেমে পড়েছেন, তা দেখে এমপি সদরুদ্দিন সাহেব কিছুকাল ধরেই চরম অস্বস্তিতে ভুগছেন। দলে তাঁর অনুসারীদের অনেকেও তাঁকে ধান কাটার ফটোসেশন করার তাগাদা দিয়ে চলেছেন ঘনঘন।

ওদিকে আবার করোনা ভাইরাসের ভয়ও মাথায় আছে। ঢাকা হতে লোক মারফত খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারেন, তার এলাকায় এখনো করোনা হানা দেয়নি। তবে পরিস্থিতি যেদিকে গড়াচ্ছে করোনা হয়তো খুব শিগগিরই হানা দেবে। তাই ধানকাটা নিয়ে ফটোসেশনের মতো কিছু করলে তা এখনই করা দরকার। অবশেষে শুক্রবার ভোরে তিন বিশ্বস্ত বডিগার্ড আর ফটোগ্রাফার নিয়ে সরকারি গাড়িতে চড়ে ছুটে চললেন তাঁর নির্বাচনী এলাকায়।

তাঁর বাড়ির কাছে পাকা রাস্তা হতে পশ্চিম দিকে চলে যাওয়া ইট বিছানো সরু রাস্তার একপাশে দেখা গেলো এক বৃদ্ধ তাঁর কিশোর ছেলেকে সাথে করে ধানের জমির আশপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে; কোমরে কাঁচি দুজনেরই। এমপি সাহেব ভাবলেন, তারা হয়তো ধান কাটার জন্যই জমিতে পায়চারি করছে। বাহ্, খুব সহজেই সুযোগ হয়ে গেলো অপেক্ষার সে ফটোসেশনের। খুশিতে টগবগ তিনি। দেরি না করে ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বলে বডিগার্ডদের একজনকে পাঠিয়ে বৃদ্ধকে তাঁর গাড়ির কাছে ডেকে আনলেন।

সদরুদ্দিন সাহেব বৃদ্ধকে উদ্দেশ্য করে বললেন: সালাম মুরুব্বি, আপনি একা কিভাবে এত বড়ো জমির ধান কাটবেন? আমরা আপনাকে সাহায্য করতে এসেছি। আমরাই কাটবো, আপনি শুধু বসে বসে দেখবেন।

সদরুদ্দিন সাহেবের কথা শেষ হতে না হতেই তাঁর ফটোগ্রাফার আর বডিগার্ডরা গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন।

ঘটনার আকস্মিকতায় বৃদ্ধ হতবাক! এমপি সাহেব নিজ হাতে ধান কেটে দেবেন, তাও আবার কাঁচাপাকা ধান! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো বৃদ্ধের। যাই হউক, এলাকার এমপি বলে কথা, হাজারো হলেও জনগণের মুরুব্বি। তাঁর সাথে কি আর তর্ক চলে?

বৃদ্ধ এর আগে এমপি সাহেবকে দেখেছিলেন বছর দশেক আগে। তখন তিনি ভিন্ন দলের রাজনীতি করতেন। পাশাপাশি উপজেলা লেবেলে ঠিকাদারির ব্যবসাও ছিল তাঁর। সরকার বদলের পর আগের ঠিকাদারিতে বেশ কিছু গোলমাল ধরা পড়ায় তিনি ব্যবসা পরিবর্তন করে ঢাকা শহরের এক হোটেলে ম্যানেজারের চাকুরী করতেন বলে বৃদ্ধ শুনেছেন। তারপর কিভাবে কি হলো তিনি আর জানেন না। এরই মাঝে ভোটারবিহীন রাজনীতির খেলায় সদরুদ্দিন বনে গেলেন হাল আমলের প্রভাবশালী এমপিদের একজন। অথচ ভোট চাইতে এলাকায়ও আসতে হয়নি তাঁকে।

যাক, এমপির নিরাপত্তায় ধানকাটা কাঁচির মতো ছোটোখাটো কিছু অস্ত্র তাঁর গাড়িতে সবসময়ই থাকে। তা নিয়ে এমপি নিজেসহ তিন বডিগার্ড কৃষকের ধান কাটতে শুরু করলেন। ওদিকে ফটোগ্রাফার স্বপন ধানকাটার দৃশ্য ভিডিও করে যাচ্ছে নানা এঙ্গেলে; ভিডিও ধারণের সময় এমপির মুখ যাতে পরিষ্কার বুঝা যায় তা নিশ্চিত করতে বডি গার্ডদের এমপির সামনে থেকে সরে যেতে বলছে বারবার স্বপন। এই ছবি সরকারের সর্বোচ্চ মহল হতে বিভিন্ন পর্যায়ে যাবে; কোয়ালিটি ভালো হওয়া চাই অবশ্যই। স্বপনের মাথায় এ চিন্তা বেশ জোরালোভাবেই ঘুরপাক খাচ্ছে।

এরই মাঝে ওই এলাকার কিছু বাসিন্দাও আগ্রহভরে এমপির ধান কাটার ছবি তুলতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই এক যুবক ছবি ফেইসবুকে শেয়ার করে লিখলো: 'কৃষকের 'সহায়তায়' এমপি সদরুদ্দিন নিজেই কাটছেন কাঁচাপাকা ধান।'

এমপির অনুসারী স্থানীয় নেতারা যুবক কালামের ফেইসবুক পোস্ট এমপি সাহেবের নজরে আনলে তিনি প্রথমত খুব খুশি হলেন; কিন্তু, সমস্যা হয়ে দাঁড়ালেন ধূর্ত ওসি সাহেব। তিনি মাননীয় এমপির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেন, 'স্যার, বেয়াদ্দপটা 'কাঁচাপাকা' শব্দটা না লিখলেও পারতো। 'কাঁচাপাকা' লেখার পেছনে আপনার, মানে স্বাধীনতার পক্ষশক্তির সরকারের মানহানির কোন উদ্দেশ্য আছে কি না আপনি হুকুম দিলে তদন্ত করে দেখতে পারি। যতটা জানি, ছেলেটার অতীত ইতিহাসও তেমন সুবিধার না।'

ওসি সাহেবের শেষ কথাটা শুনে এমপি সদরুদ্দিন আঁতকে উঠে জানতে চাইলেন, 'কেন কি হয়েছে, ও কি করেছে আগে?'

- স্যার, ওই যে বুয়েটের ছাত্র আবরার মারা গিয়েছিলো, তখন এ এলাকায় মানববন্ধনের নামে লোক জড়ো করে সে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্টের চেষ্টা করেছিল, আপনার বিরুদ্ধে শ্লোগানও দিতে চেয়েছিলো, আমি যা হতে দেইনি। ব্যাটা ভালোই পাঁজি আছে।

কথাগুলো শুনে মিনিটখানেক চিন্তা করে এমপি সাহেব ওসিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, 'তুমি ঠিক বলেছো। ওই ছোকরার ধমনীতে রাজাকারের রক্ত বইছে কি না তাও খতিয়ে দেখা দরকার; নইলে, সরকারের বিরুদ্ধে এভাবে প্রকাশ্যে অবস্থান নেবে কেন? থানায় নিয়ে তাকে সাইজ করে দাও। তারপর জেলে ঢুকাও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। বুঝুক ব্যাটা, স্বাধীনতার স্বপক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে গেলে কি পরিণতি হয়!'

খানিক থেমে সদরুদ্দিন বলে চললেন, 'আর হ্যাঁ, ওদিকে বলে দাও, চোরের উপদ্রপে অতিষ্ঠ হয়ে ওই বৃদ্ধ কাঁচাপাকা ধান কেটে দিতে আমার কাছে আর্জি দিয়েছিলো; তাই আমরা সাহায্য করেছি। সরকারি কাজের কোঅর্ডিনেশনে যেন ভুল না হয়, খেয়াল রেখো। কেউ যেন ধানকাটা নিয়ে ষড়যন্ত্র করার সুযোগ না পায়। বৃদ্ধকেও ম্যানেজ করে নিও, ঠিক আছে?'

'জি স্যার, জি স্যার' বলে ওসি নিজেই মাঠে নেমে পড়লেন। স্থানীয় কিছু নেতা-পাতিনেতার সহায়তায় যুবক কালাম গ্রেফতার হলো সেদিনই। ফেইসবুকে সরকারের ভাবমূর্তি হানিকর পোস্ট দেয়ায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হতেও দেরি হলো না। হত্যা মামলার দুর্ধর্ষ আসামিদের আদলে দুহাত পিছমোড়া করে বেঁধে টেনে হেঁচড়ে তাকে নিয়ে আসা হলো ওসি সাহেবের খাস কামরায়। পুরোদমে শুরু হলো জিজ্ঞাসাবাদ। ...

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বলে কথা! স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তি, মানে সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় এর চেয়ে বড়ো অস্ত্র আর কী হতে পারে? দেশপ্রেমীদের সুরক্ষায় এমন মজবুত আইনই তো আমাদের দরকার! সাবাস, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন! সাবাস!

(একটি ব্যঙ্গরচনা। চরিত্রগুলো কাল্পনিক।)

লেখক- এম এল গনি : কানাডা প্রবাসী লেখক, ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ও প্রকৌশলী।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads