কবিতা

বাল্যসখী ও কংক্রিটের গল্প

হাসনাত কাদীর

মানবকণ্ঠ
বাল্যসখী ও কংক্রিটের গল্প - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৩:১০,  আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৩:৪১

(রানা প্লাজার কথা মনে পড়ে? যে ভবনে চাপা পড়ে খুন হন ১ হাজার ১৩৪ জন দরিদ্র পোশাককর্মী। পৃথিবীর ভয়ঙ্করতম সেই ধস চোখে দেখা যায়। থেঁতলানো লাশ গুনে গুনে শূন্য চোখে তাকিয়ে থাকা যায়। কিন্তু এমনও ভয়াবহ ধস আছে, যা চোখে দেখা যায় না। অদৃশ্য করোনার মতো প্রাণঘাতী সেই ধসে বিপর্যস্ত আমাদের নৈতিকতা, সততা ও মনুষ্যত্ব। তাই এখানে শ্রমিকেরা আজও মানুষের সম্মান পান না। আজ শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ডের সাত বছর পূর্ণ হলো। নির্মম ও স্বাভাবিক সত্য হলো- হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনে দুই মামলায় এখনও সাক্ষ্যগ্রহণই সম্ভব হয়নি কোনো। তাতে কী? চলুন ধসেপড়া সময়ে কিছু বিকলাঙ্গ শোকালাপ শোনা যাক।)


বাল্যসখী ও কংক্রিটের গল্প

লক্ষ্মীতারা, প্রিয় বাল্যসখী আমার!
তোর মৃত্যুতে আমি এতটাই স্বাভাবিক যে আমাকে দেখেই
প্রবল অভিমানে তোর বুক চিরে বেরুচ্ছে বেদনার ধারা
ঠিক যেমন করে রানা প্লাজার দামি কংক্রিটের চাপে
রক্তের বন্যায় ভেসে গেছে তোর শ্যামা শরীর!


তুই হাসছিস?!
তোর তো হাসারই সময়- খুব একহাত
শোধ নেয়া গেছে অপারেটর আলমের পর! পিছে ঘুরে ঘুরে
তোর কত জোড়া স্যান্ডেল গেছে ক্ষয়ে, তবু ব্যাটার কী দেমাগ! চোখ
তুলেই দেখে না তোকে! সেই বেদনায় চাকরি বদলে এলি রানা প্লাজায়,
নতুন করে বেদনার সুতায় সেলাই করে গেলি সভ্যতার নোংরামি ঢাকতে।
মানুষের লোভী মনের পর্দা বানাতে সেলাই করে গেলি বুকের গহিনে
ক্ষোভ শোক অভিমান হতাশা ও নিরাশার কবর পওর দিতে দিতে!
এখন শেষ রাতের ঘোর আঁধারে আলম তোরে ভাবছে!!


মুখ ঘুরালি কেন লক্ষ্মীতারা?
মা’র কথা মনে পড়ে?
বিধবা মায়ের কাপড় গেছে ফেঁসে, আগামী বিলেই কিনে দেয়ার কথা।
ছোট বোনের নিশিজ্বর বেড়েছে
জানি ওষুধ দরকার।
খুব চিন্তিত তাই বুঝি তুই?
আহা, সতেরো বসন্ত চলে গেলো তবু চালাক হলি না!


লক্ষ্মীতারা, জরুরী ভিত্তিতে তোর বিধবা মা পাবেন
বকনা বাছুর, সেলাই মেশিন ও ছাগল ছানা! ফটাফট ছবি তোলা হবে
ছাগলমন্ত্রীর সাথে মিডিয়ায় ছবি যাবে তোর আলাভোলা মা’র!
এতো বড় সৌভাগ্য কভু ভাবতে পেরেছি রে বোকা?
জয় লক্ষ্মীতারার জয়!!
তুই এখন ঘুমাতে পারিস নিশ্চিন্তে।


মুখ তবু কেন এমন আঁধার?!
না না বোকা, মা’র শাড়ি নিয়ে ভাবনার কিছু নাই।
গাধী, ভোট আসছে! মাঝরাতে সারি সারি শাড়ির ট্রাক
পৌঁছে যাবে ছোট্ট উঠোনে!
পার্কিং নিয়ে হবে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া!
রানা প্লাজার খাম্বা নাড়িয়ে যারা
তোর হৃৎপিণ্ডে গেঁথে দিছে ভারী কংক্রিট
আর কংক্রিট-হৃদয়ে যারা শোকের ব্যবসায়
কালো ব্যাচ পরে ভাষণ মারায়
সবাই খুব নতজানু হয়ে
পা’ চেটে ধুলো তুলে দেবে তোর আলাভোলা মা’র।
ভাবিস না পাগলী, তোর জ্বরে ভোগা বোনের বিয়ে
দেবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী- চার আনা যৌতুক লাগবে না
গ্যারান্টি, কোনো দিন গায়ে ফুলের টোকাটা পড়বে না!
ঘুমা লক্ষ্মীতারা তুই নিশ্চিন্তে ঘুমা......।


এ কী! তোর চোখ দু’টি এমন জ্বলছে কেন?
মরে তুই পেত্নী হলি তারা!! ছিঃ ছিঃ,
বাল্যবন্ধুকে ভয় দিতে নেই সোনা।
বিদায় হ, প্লিজ বিদায় হ!
মাঝরাতে এমন থেতলানো শরীরে
এ-ঘরে আর পায়চারি করিস না।
তারা! তারা! আমার লক্ষ্মীতারা, প্লিজ.........!
প্রতিবাদের কিছু নেই, ভূতেদের প্রতিবাদ সাজে না সোনা।


আমরা ?
কংক্রিটের চাপে তোর মাথাখারাপ হয়ে গেছে তারা!
প্রতিবাদে কী হয়?
জলে বাস করে হাঙরের সাথে লড়াই!
তুই পাগল হয়ে গেছিস, স্রেফ পাগল!!
খুনি?
কারা?!
চুপ! একদম চুপ!!
আর একটা কথা না। স্রেফ ঘর থেকে বের হ।
আই ছে গেট আউট!
খুব বিপ্লবী সাজা হচ্ছে, খুব? শালা মিথ্যাবাদী!
তোর মাথায় কেউ শাবল মেরেছে
নাকি কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি?
কিচ্ছু না।
স্রেফ হৃৎপিণ্ডে মূল্যবান কংক্রিটের একটুখানি খোঁচা।
দোষ যদি দিবি তো আজ্রাইলকে দে।
কই আর-লোক বাঁচে নাই?
আসলে একসাথে তোরা এতজন এক্সপায়ার ডেট হলি
আজ্রাইলের স্রেফ ভবন ধসানো ছাড়া উপায় ছিল না রে...
মাঝ থেকে রানা ভায়ের বিরাট ক্ষতি- চু চু চু!
সো, নো মোর টক......
চুপ যা পাগলী ঘুম যা!


লক্ষ্মীতারা, প্রিয় পাগলী আমার!
তোর মৃত্যুতে আমি এতটাই স্বাভাবিক যে আমাকে দেখেই
প্রবল অভিমানে তোর বুক চিরে বেরুচ্ছে বেদনার ধারা
ঠিক যেমন করে রানা প্লাজার ভারী কংক্রিটের চাপে
রক্তের বন্যায় ভেসে গেছে তোর শ্যামা শরীর!
তবু আমি টলছি না
জ্বলছি না
বলছি না
তোর মৃত্যুতে আমি স্তব্ধ, বিমূঢ়, বাক্যহারা।
কেননা, আমি তো জানি তোদের জীবন এমনই
যুগ থেকে যুগ পরম্পরা!!


সো, নো মোর টক...... আমি আর পারছি না!
বিদায় হ গাধী, চুপ যা প্লিজ ঘুম যা।
রাত ফুরিয়ে আসছে
ফাঁসির দড়ি পাকাতে হচ্ছে আমাকেই
ভোর হয়ে যাবে দড়ি বানাতেই!!!


এপ্রিল ২০১৩, ঢাকা

হাসনাত কাদীর : লেখক, চলচ্চিত্রকার ও সংবাদকর্মী।




Loading...
ads






Loading...