গল্প

সেলফ কোয়ারেন্টাইন

জোবায়ের মিলন

মানবকণ্ঠ
সেলফ কোয়ারেন্টাইন

poisha bazar

  • ২১ মার্চ ২০২০, ১১:২৪

বাসা বদল করার সময় চিঠিগুলো প্রথম হাতে পড়েছিল রাইসুলের। উর্দুতে লেখা। রাইসুলের কাছে হিন্দি, উর্দু লেখ্যভাষাটা বিশেষ আলাদা মনে হয় না বলে সে মাথা ঘামায়নি।
পিকআপ ভ্যানে মালপত্র উঠাতে যেয়ে পাকিস্তান আমলের ছোট্ট ব্রিফকেসটা হাত থেকে ফসকে নিচে পড়ে লক ভেঙ্গে ভেতর থেকে চিঠিগুলো পাখির পালকের মতো ছিটকে পড়েছিল মাটিতে। আরো কিছুর সঙ্গে চিঠিগুলোও তার বাবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভেবে দ্রুত ব্রিফকেসে ঢুকিয়ে পিকআপরের ব্যকডালা লক করে দিয়েছিল। বেশ কয়েক বছর আছে। আজ এই চিঠিগুলোই রাইসুলের কাছে প্রধান প্রমাণ। একমাত্র সত্য। এ প্রমাণের কাছে আর কিছু মিথ্যা হতে পারে না।

...রাইসুলের শরীর ঘামতে থাকে। সমস্ত পৃথিবী রাইসুলের কাছে একটা সমপাপড়ির মতো মনে হয় কিন্তু একদিকে চরম সত্যের উদ্ভাবন, নিষ্ঠুর বাস্তবতার পোড়া সাক্ষী অন্য দিকে রক্তের সম্পর্ক! কোন দিকে যাবে রাইসুল? ঘাম তার কপাল বেয়ে গলা হয়ে নাভির নিচ ধরে হাঁটু ছোঁয়। ডানের টেবিলে একটা আপেল কাটার ছুরি। ছুরিটা তার দিকে চেয়ে হাসছে। রাইসুল একবার চিঠিগুলোর দিকে তাকায়। একবার ছুরিটার দিকে তাকায়।

মহামারি করোনা ভাইরাসের আঁচ এসে লেগেছে বাংলাদেশের সবুজ শ্যামল ছায়াও। বাঙালির সবকিছুতেই যেন একটু বেশি বেশি। একরাতে দশ টাকার মাস্কের দাম একশ’ টাকা। পঞ্চাশ টাকার হ্যান্ডওয়াশ আড়াইশ’ টাকা। এসব বিশৃঙ্খল নানান কায়দা-কানুনের মধ্যে রাইসুলের দম বন্ধ হয়ে আসে। সব কিছুকেই দ্বিধাদন্দ্বিত। দেশপ্রেম, ন্যায়, নীতি, আদর্শ ইত্যাদির জায়গায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন দেশটার মানুষের প্রতি তার নানা প্রশ্ন জাগে। ভেতরে একটা ঘোড়া সব সময় দৌঁড়ায় একশ’ হাজার জিজ্ঞাসা নিয়ে। রাইসুল সব প্রশ্নের, সব জিজ্ঞাসার উত্তর পায় না। মিল খুঁজে পায় না কর্ম আর কার্যের।

মায়ের ইজ্জত, বোনের সম্ভ্রম, পিতার রক্ত, ভাইয়ের ত্যাগের বিনিময়ে যে দেশ সে দেশের প্রতি কারো যেন কোনো দায় নেই, বোধ নেই, যোগ নেই, বিয়োগ নেই, দায়িত্ব-কর্তব্য নেই। ছেলের হাতের মোয়ার মতো যার যখন যা ইচ্ছা তাই করছে কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে। দেখেও না দেখার ভান কারো কারো চোখে। যদিও রাইসুল মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। বই পড়ে, চলচ্চিত্র দেখে, ইতিহাস থেকে রাইসুল জেনেছে এই দেশটা ভূমিষ্ঠের সব ত্যাগ-তিতিক্ষার কথা। দেশ বলতে রাইসুল বুঝে মা। মায়ের জন্য সে সব কিছু করতে পারে, দেশের জন্যও পারে খুন করতে।

রোগটা যেহেতু ছোঁয়াচে সেহেতু প্রবাসীরা কিছুদিন ঘরে থাকলে দোষ কোথায়! কী এমন ক্ষতি হয়ে যাবে এতে! তার রাগ চড়ে যায়। এসব ভাবতে ভাবতে রাইসুল বাসার কাছে চায়ের দোকানে এসে একটু একা বসে। নিজের সঙ্গে আনা মগে এক মগ চা বানিয়ে দিতে বলে নূরুকে। দুজন মুরুব্বিও এসে বেি তে বসে। তাদের মুখেও করোনা ভাইরাস ও দেশে ফেরৎ প্রবাসীদের নিয়ম না মানার আলাপ। সে চায়ের মগে খেয়াল দেয়।

বেঞ্চিতে বসা অপেক্ষাকৃত কমবয়সী বয়স্ক লোকটি কিছুটা রাগের স্বরেই বলে, ‘বিদেশ ফেরতদের আসলে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজাকারদের মতো সেলফ কোয়ারেন্টাইনে যাওয়া দরকার। পৃথিবীর কেউ যেন খোঁজ না পায়। দরজার নিচে দিয়ে, ভ্যান্টিলেটর দিয়ে তাদের বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেয়া হবে।’

অন্য খেয়ালে থাকলেও ‘রাজকারদের সেলফ কোয়ারেন্টাইন’ বাক্যটিতে রাইসুলের কান আটকে যায়। কোয়ারেন্টাইন শব্দটির সঙ্গে রাইসুল পরিচিত। এর মধ্যে ইন্টারনেটে সার্চ করে এর অর্থ, উৎপত্তি, ব্যবহার, ইতিহাস জানলেও মহান মুক্তিযুদ্ধ আর রাজাকারের সঙ্গে শব্দটি কিভাবে যায় তা তাকে তাড়িত করে। রাইসুল বাসায় ফিরে কম্পিউটার অন করে আবার সার্চ করতে থাকে। আশানুরূপ কিছুই পায় না।

রাইসুল তার মেঝো চাচার বাসায়। ‘কিরে এতো দিন পর চাচার কথা মনে হলো?’ রাইসুলের মেঝো চাচা প্রশ্নটি করলেন।

‘মনে পড়ে সব সময়ই। আসা হয় না মাত্র। তুমি কেমন আছো?’
‘ভালো’
‘একটা বিশেষ কাজে এসেছি চাচা।’
‘ভালো তো, বল কি কাজ?’
‘বসো এখানে, বলছি, তুমি তো মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ গবেষকও, তুমিই তো প্রথম রাজাকারদের নাম প্রকাশ করলে। বইয়ে লিখলে কোন রাজাকার কোথায় লুকিয়ে আছে। আচ্ছা বলো তো চাচা, সেলফ-কোয়ারেন্টাইন শব্দটির সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বা রাজাকারদের কি সম্পর্ক!’

‘ও আচ্ছা শোন, সেলফ কোয়ারেন্টাইনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের কোনো সম্পর্ক নেই। সম্পর্ক আছে রাজাকারদের। লাখ লাখ লাশ আর রক্তের উপর দিয়ে ঊনিশ একাত্তর সালের ডিসেম্বরে যখন দেশ স্বাধীন হলো, মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলো, বাংলাদেশের জন্ম হলো তখন ওই পাকিস্তানিদের দোষর, রাজাকার-আলবদর-আল শামসরা কেউ এলাকা ছাড়ে, কেউ দেশ ছাড়ে, কেউ ভিন্ন শহরে ঘরের ভেতর একঘরে হয়ে যায় অর্থাৎ সেলফ-কোয়ারেন্টাইন চলে যায়; কেউ যেন তাদের কোনো খোঁজ না পায়। আলো-বাতাসও যেন জানতে না পারে তারা কোথায় আছে। অনেকে পরবর্তী সময়ে লুকিয়ে পাকিস্তানও চলে যায়, অনেকের পট পরিবর্তন হলেও অনেকে ওইভাবেই জীবনটা কাটিয়ে দেয়।’

রাইসুলের মাথাটা টং করে ওঠে। চাচার কথাগুলোর সঙ্গে মিলে যায় তার বাবার চরিত্র। রাইসুল বুঝের হবার পর থেকে তার বাবা হারিস মোল্লাকে সে কখনো দেখেনি তাদের বাড়ির একটি ঘর ছেড়ে কখনো বাহির হতে। নাওয়া-খাওয়া ওই একটা ঘরের ভেতরই। পারিবারিক সামাজিক রাষ্ট্রীয় কোনো কাজে কখনো তাকে হাজির থাকতে দেখা যায় না। মায়ের কাছে জানতে চাইলেও সঠিক উত্তর পাওয়া যায়নি কখনো। রাইসুলের অনেক আগে থেকেই বিষয়টি সন্দেহের মনে হয়েছে। উপযুক্ত কারণ পাওয়া যায়নি কখনো।

‘আচ্ছা চাচা, একটা সত্য কথা বলবে; তুমি তো মুক্তিযোদ্ধা, তুমি তো মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, তুমি তো সত্যের জন্য লড়াই করেছ, বাবা কি রাজাকার?’
‘আমি জানি না।’
‘তবে বাবাও তো আজীবন সেলফ-কোয়ারেন্টাইনে! কেন?
রাজাকার না হলে ঘর থেকে বের হন না কেনো? মুক্তিযুদ্ধের সময় তুমি মুক্তিযুদ্ধে গেলে, বাবা কোথায় ছিল?’
‘আমি জানি না।’
রাইসুল একঝটকায় ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা তার মায়ের কাছে এসে দাঁড়ায়।
‘মা, বাবা কি রাজাকার ছিল?’
‘আমি জানি না।’
মিলে যায় উত্তর। রাইসুল এবার দাঁড়ায় তার বাবা হারিস মোল্লার মুখোমুখী।
‘বাবা, তুমি কি রাজাকার ছিলা?’
হারিস মোল্লার বয়স্ক মুখটা মাঘের বিকালে ঝরা কাঁঠাল পাতার মতো রেখাময় হয়ে ওঠে। চোখজোড়া পাকা ডালিমের মোত টকটকে লাল হয়ে ওঠে আচমকা। ঠোঁটজোড়া কাঁপতে থাকে। যে প্রশ্ন এত এত বছর কেউ করেনি। সে প্রশ্ন নিজ সন্তানের মুখে! হারিস মোল্লা নিশ্চুপ।
রাইসুল ক্রোধে আবার প্রশ্ন করে, ‘সত্যি তুমি রাজাকার ছিলা।’
‘জানি না।’

রাইসুল এক বান্ডিল চিঠি হারিস মোল্লার মুখের উপর ছুঁড়ে মারে। চিঠির ভাষা উর্দু। সঙ্গে বঙ্গানুবাদ। সে এরমধ্যেই একজন মাদরাসার শিক্ষককে দিয়ে এর অনুবাদ করে এনেছে। সবগুলো চিঠির নিচে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন ক্যাম্পের মেজরের নাম, দস্তখত! কোনো কোনোটার নিচে সিল। চিঠির ভাষায় লেখা- কখন কোন গ্রাম পুড়িয়ে দিতে হবে। কখন কাকে ক্যাম্পে তুলে আনতে হবে। কোন রাতে কতজন তরুণী মেজরদের কাছে নিয়ে আসতে হবে। খুনের, ধর্ষণের, বর্বরতার সুনীল বর্ণনাও আছে কোনো চিঠিতে। হরিস মোল্লা থ’খেয়ে যায়।
কোথায় পেলো রাইসুল এ চিঠিগুলো!

তবে কি মনের ভুলেই সত্য রয়ে গেলো সত্যের কাছাকাছি! রাইসুল একবার চিঠিগুলোর দিকে তাকায়। একবার তার বাবার দিকে তাকায়। একবার টেবিলে রাখা ছুরিটার দিকে তাকায়। রাইসুলের চোখে ভাসতে থাকে সিনেমার দৃশ্যের মতো ইতিহাসের কথাগুলো। খুনের, ধর্ষণের, লুটের, বীভৎসতার কুৎসিত ছবিগুলো। রাইসুলের পেটটা গুরগুর করে ডাকতে থাকে। নাড়িভূড়ি এক হয়ে আসার মতো তার বমি আসে। রাইসুল বমিটা আটকে রাখতে চায়। বমিটা বুক পর্যন্ত উঠে আসে। রাইসুল আরো চেপে রাখতে চায়।

বমিটা গলা ছাড়িয়ে জিহ্বা পর্যন্ত চলে আসে। রাইসুল ওয়াৎ করে তার বাবার উপর বমি করে দেয়। হারিস মোল্লা মাগো করে কয়েক পা পিছিয়ে হেলে পড়ে সেলফ কোয়ারেন্টাইনের আলমিরাটার উপর। রাইসুল ওয়াক থু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মেঝেতে পড়ে থাকে ছুরিটা। সাদা ছুরিটার রং এখন লাল।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads






Loading...