গল্প

ব্লু হোয়েল

আশরাফ পিন্টু

মানবকণ্ঠ
ব্লু হোয়েল - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • ১৩ মার্চ ২০২০, ১২:১১

‘ব্লু হোয়েল গেম’ খেলে শিহাবের ছোটভাই শিপন মারা যাওয়ার পর শিহাবের হঠাৎ গেম খেলার প্রতি আগ্রহ বেড়ে যায়। বাড়ির সবাই ওর কাণ্ড-কারখানা দেখে তো অবাক! যে শিহাব বই থেকে সহজে মুখ তুলত না সে কিনা গেম খেলবে; তাও আবার যে সে গেম নয়- একেবারে ‘ব্লু হোয়েল’!

শিহাব দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। সামনে এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। ছোটভাই শিপন দশম শ্রেণিতে পড়ত। সিক্সে পড়ার সময় থেকে ওর কম্পিউটারে গেম খেলার নেশা হয়। ধীরে ধীরে সে বিভিন্ন ধরনের গেম খেলায় পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। হঠাৎ একদিন সকালে দেখা যায়- শিপনের লাশ রাস্তায় পড়ে রয়েছে। ছাদ থেকে পড়ে মারা গিয়েছেও। প্রথমে কেউ মৃত্যুর কারণ ধরতে পারে না। পাশের বাসার এক বুয়েট পড়ুয়া ছেলে সিজান ওর চেহারার হাল দেখে বলে, ওর মৃত্যুর কারণ হলো- ব্লু হোয়েল গেম।

শিহাব বলে, ব্লু হোয়েল গেম কী?
সিজান জবাব দেয়, ব্লু হোয়েল গেম হলো একটি সফটওয়্যার অ্যাপ্লিকেশন, নিছক গেম নয়। যে সব কিশোর-কিশোরীরা সাধারণত হতাশায় ভোগে- তারাই আক্রান্ত হয়ে পড়ে এ গেমে। এ গেমের ভেতরে একবার ঢুকলে বের হওয়া কঠিন। মূলত এটি একটি ডার্ক ওয়েভের গেম- যা ইন্টারনেটের একটি অন্ধকারের জগৎ। এর প্রথম দশটি লেভেল খুবই আকর্ষণীয়। ইউজারকে এডমিন কিছু মজার মজার নির্দেশনা দেয়; যেমন- রাত তিনটায় ঘুম থেকে উঠে হরর ছবি দেখা, চিল্লাচিল্লি করা, উঁচু ছাদের কার্নিশে হাঁটাহাঁটি করা; ইত্যাদির নির্দেশ দিয়ে এডমিন হাতিয়ে নেয় উঠতি বয়সী রোমাঞ্চপ্রিয় কিশোর-কিশোরীদের পার্সোনাল ইনফরমেশন। প্রথম দশটি লেভেল অত্যন্ত কৌতুহলের সঙ্গে পার করার পর পরবর্তী দশটি লেভেলে আসক্ত হয়ে পড়ে ইউজার। পনেরো লেভেল পার হওয়ার পর কঠিন মিশন দেয়া শুরু হয়। যেমন এডমিন তাকে বলতে পারে তোমার হাতে ব্লেড দিয়ে ব্লু হোয়েল বা নীল তিমির ছবি আঁকো।
এটুকু বলার পর সিজান থেমে পড়ে। কিন্তু শিহাবের কৌতুহল আরো বেড়ে যায়। বলে, থামলেন কেন ভাইয়া? সম্পূর্ণ খেলাটি বলুন।
-সম্পূর্ণ জেনে কি হবে?
-আমি খেলাটি খেলতে চাই।
-এ খেলায় একবার ঢুকলে তুমি আর বেরুতে পারবে না। তোমার ভাইয়ের মতোই পরিণতি হতে পারে।
-হোক।
-তুমি তো খুব ভালো ছাত্র; বোকার মতো কথা বলছো কেন?
-আপনিও তো খুব ভালো ছাত্র- বুয়েটে পড়েন, খেলাটি জানার পরেও কী খেলেছেন?
-না, আমি পড়ে জেনেছি এসব, খেলে দেখেনি।
-আমিও খেলাটি জেনে রাখতে চাই।

শিহাবের পীড়াপীড়িতে সিজান খেলাটির বাকি অংশের নিয়ম বলে বিদায় নেয়।
শিহাব পরদিন গভীর রাত্রিতে কম্পিউটারে ব্লু হোয়েল গেম খেলতে বসে। প্রথম কয়েক দিনে সে বিশটা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে। পঁচিশ লেভেলে এসে এডমিন হঠাৎ বলে বসে, তুমি কি ড্রাগ নাও?

শিহাব বলে, না।

-ড্রাগ না নিলে এ খেলায় মজা পাওয়া যাবে না।

-ঠিক আছে। শিহাব সেদিনের মতো খেলা বিরত রাখে।

তার পরদিন কিছুটা নেশাগ্রস্থের মতো ব্লু হোয়েলের শেষ লেভেলের খেলাগুলো খেলতে থাকে শিহাব।

চারিদিকে সুনশান নীরবতা। বাড়ির সবাই ঘুমে বিভোর। প্রতিবেশীরাও কেউ জেগে নেই। শিহাব মোহগ্রস্থের মতো খেলছে এই মরণ খেলা।
হঠাৎ স্কিনে ভেসে ওঠে একটি বিশাল নীল তিমির ছবি। ও বলতে থাকে, ইউজার! এবার তুমি ছাদে গিয়ে কার্নিশের পর দাঁড়িয়ে একটি সেলফি তুলে এনে আপলোড করো; তাহলেই খেলা শেষ হবে এবং তুমি এই খেলার বিজয়ী শীর্ষ দশের মধ্যে থাকবে।

শিহাব খুশিতে নেচে ওঠে। সে হ্যাঁ-বোধক কমেন্ট জানিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। এমন সময় ‘উহ’ ধরনের কেমন যেন একটা শব্দ ওর কানে আসে। শিহাব স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করে নীল তিমিটি মেঝেতে লুটিয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর দেখা যায়- ব্লু হোয়েলটি যেখানে পড়ে ছিল সেখানে একটি যুবকের রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে। আস্তে আস্তে ওই মৃতদেহের পাশে এসে দাঁড়ায় এক কিশোর। কিশোরকে দেখেই শিহাব ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে- শিপন তুই! তুই গেমের ভিতরে গেলি কি করে?

শিপন বলে, ভাইয়া! আমি মারা যাওয়ার পর ব্লু হোয়েলের সফটওয়ারে ঢুকে পড়েছি। বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছি কিন্তু গেমটি ধ্বংস করার কোনো উপায় আমি কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষমেশ এর আবিষ্কারককে খুঁজে পেলাম। কিন্তু ও গেমটি ধ্বংস করার উপায় বলছিল না। কি আর করা- ওকে শেষ করতেই গেমটিও চিরতরে শেষ হয়ে গেল। এখন আর কোনো ভয় নেই ভাইয়া। এখন থেকে আমার মতো আর কারো পরিণতি হবে না।

শিপনের কথাগুলো অবাক হয়ে শুনছিল শিহাব। কি উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছিল না। একটু ইতস্তত স্বরে বলে, আমি কিন্তু সত্যি সত্যি ড্রাগ নেইনি বা নেশাও করিনি। বিশ্বাস কর... কিন্তু তুই...

হঠাৎ স্ক্রিন থেকে সবকিছু উধাও হয়ে যায়। আকাশের মতো নীল পর্দা ভেসে ওঠে স্ক্রিনে। শিহাব হতভম্বের মতো ধপাস করে চেয়ারের পর বসে পড়ে।




Loading...
ads






Loading...