প্রথম বরফ প্রাসাদের গল্প

প্রথম বরফ প্রাসাদের গল্প
বরফ প্রাসাদ - ছবি : সংগৃহীত।

poisha bazar

  • মানবকণ্ঠ ডেস্ক
  • ১১ মার্চ ২০২০, ১৬:৪২

সেন্ট পিটার্সবার্গের বরফ প্রাসাদটি পৃথিবীর প্রথম বরফের তৈরি কোনো ভবন। বরফের তৈরি ভবন এখন পৃথিবীর অনেক দেশেই নির্মাণ করা হয়। বরফের প্রাসাদ নির্মাণ নিয়ে রীতিমতো উৎসবও হয়। ১৭৩৯ থেকে ১৭৪০ সালের কঠিন শীতের সময় রাশিয়ান জারিনা আনা ইভানোভনা সেন্ট পিটার্সবার্গে একটি বরফের প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ দিলেন। স্থপতি পিয়তর ইরোপকিনকে প্রাসাদের নকশা করার কথা বলা হলো।

জারিনার নির্দেশে নির্মাণ করা হলো বরফ প্রাসাদ। প্রাসাদটি ছিল ২৪ মিটার লম্বা এবং ৭ মিটার চওড়া। প্রচুর পরিমাণে বরফের টুকরা ব্যবহার করা হয় প্রাসাদ নির্মাণে। বরফের টুকরাগুলো জোড়া দেয়া হয় পানি দিয়ে। প্রাসাদের বাগানে ছিল বরফের গাছ। সেই গাছে ছিল বরফের পাখি এবং একটি বিশাল বরফের হাতি। প্রাসাদের বাইরের দিকের বরফের দেয়ালে খচিত ছিল বিভিন্ন ছবি। প্রাসাদের ঠিক সামনেই দাঁড়ানো ছিল কয়েকজন গোলন্দাজ। তবে সবাই ছিল বরফের তৈরি। প্রাসাদের ভেতরে যেসব আসবাব ছিল, সেগুলোও ছিল বরফের তৈরি। এমনকি বিছানাও ছিল বরফে তৈরি। বিছানায় যে ম্যাট্রেস এবং বালিশ তাও ছিল বরফের। তবে বরফের প্রাসাদের চারপাশে কাঠের উঁচু বেড়া দেয়া ছিল।

এটা রাজপুত্রের জন্য। রাজপুত্র মিখাইল গলিতসিন বিয়ে করেছিলেন এক ইতালিয়ান নারী। জারিনাকে না জানিয়ে। জারিনা ভাবলেন, এই বিয়ে করা মানে তাকে সরাসরি অপমান করা। পুত্রবধূকে নানাভাবে অপদস্থ করতে লাগলেন জারিনা। যদিও প্রিন্সের বউ বেশিদিন বাঁচেননি। বিয়ের কিছুদিন পরই মারা গেলেন। তবু জারিনা প্রিন্স মিখাইলকে ক্ষমা করতে পারেননি। তিনি প্রিন্সকে দিতে চাইলেন অভাবনীয় এক শাস্তি। তিনি তাকে নিয়ে মজা করতে চাইলেন।

জারিনা রাজপুত্রের জন্য একজন নতুন বউ নিজেই খুঁজে দিলেন। রাজপুত্রের নতুন বউ দেখতে কিন্তু মোটেই সুন্দরী ছিলেন না। তিনি ছিলেন কালমিকের একজন কোর্ট লেডি। নাম অ্যাভডটিয়া ইভানোভনা বাঝেনিনোভা। জারিনা বেশ জোর করেই রাজপুত্রের সঙ্গে বাঝেনিনোভার বিয়ে দিলেন। নব দম্পতিকে পাঠিয়ে দেয়া হলো সেই বরফের প্রাসাদে। ওখানে তাদের বরফের হাতির পিঠে চড়তে হয়েছে, রাত কাটাতে হয়েছে ওই বরফের বিছানায়। ঘুমাতেও হয়েছিল বরফের বালিশে মাথা রেখে। বরফের প্রাসাদে, বরফের বিছানায়, বরফের বালিশে মাথা রেখে বেশ কঠিন রাত পার করেছেন নব দম্পতি। তবে রাজপুত্রের জন্য সুখকর ছিল যে, জারিনাকে আনা পরের বছরই মারা যান এবং তার বরফের প্রাসাদটি আর পরের গরমকালও টিকতে পারেনি। গলে গিয়েছিল।

জারিনার জোর করে দেয়া বিয়ে শেষ পর্যন্ত টিকেছিল। রাজপুত্র আর বাঝেনিনোভ যমজ সন্তানের পিতা-মাতা হয়েছিলেন। সেন্ট পিটার্সবার্গের এই বরফ প্রাসাদটি মানুষের জানা মতে পৃথিবীর প্রথম বরফের তৈরি কোনো ভবন। বরফের তৈরি ভবন এখন পৃথিবীর অনেক দেশেই নির্মাণ করা হয়। বরফের প্রাসাদ নির্মাণ নিয়ে রীতিমতো উৎসবও হয়। উত্তর আমেরিকায় ১৮৮৩ সাল থেকে নিয়মিত বরফের প্রাসাদ নির্মাণ হয়ে আসছে। মিনেসোটার রাজধানী সেন্ট পলে প্রতি বছর শীতকালীন একটি উৎসব হিসেবে বিভিন্ন ধরনের বরফের প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। ১৮৮৬ সাল থেকে এ উৎসব পালন করে আসছে শহরবাসী। কিছু প্রাসাদ নির্মাণ হয় হাজার হাজার বরফের ব্লক দিয়ে। ১৯৯২ সালে এখানে ২৫ হাজার বরফের ব্লক দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ১৫০ ফুট বা ৪৫.৭ মিটার উঁচু একটি স্থাপনা। ১৯৪১ সালে এখানেই ৩০ হাজার বরফের ব্লক দিয়ে প্রাসাদ তৈরি হয়েছিল। সর্বশেষ ২০০৪ সালে সেন্ট পলসে একটি বরফের বিশাল প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়। ১৯৫৪ সাল থেকে প্রতি বছর কুইবেকে পালিত হয় কুইবেক সিটি উইন্টার কার্নিভ্যাল। কুইবেকের এই শীত উৎসবেও নির্মাণ হয় বরফের প্রাসাদ। তবে কোন বছর কেমন আকারের বরফ প্রাসাদ নির্মাণ করা হবে তা নির্ভর করে শহরবাসীর বাজেটের ওপর। সর্ব আমেরিকান শহর হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্কের সারানাক লেকে বার্ষিক উইন্টার কার্নিভ্যালেও বরফের প্রাসাদ নির্মাণ করা হয়।

একসময় একটানা শীতকালের জন্য এ অঞ্চলের মানুষ বেশ বিরক্ত হয়ে পড়ত। তখন তারা ভাবতে লাগল কী করে শীতকালটাকে মজাদার করে তোলা যায়। সেই চিন্তা থেকেই ১৯ শতক থেকে তাদের এই উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরেই তারা নির্মাণ করে বরফের প্রাসাদ। তুর্কমেনিস্তানের শাসক সাপারমুরাট নিয়োজভ রাজধানী আগাবাতের কাছে বেশ কিছু বরফ প্রাসাদ নির্মাণের নির্দেশ দেন ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে। এ ছাড়া প্রতি বছর রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের সেই বরফ প্রাসাদটির অনুকরণে নির্মিত আরেকটি প্রাসাদ পুনর্নিমাণ করা হয়।

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads






Loading...